রাতের আকাশে নেমেছে অন্ধকার। চারপাশে মানুষের কোলাহল, কোথাও সাধু-বাউলদের আনাগোনা, কোথাও আবার একতারা, দোতারা আর ডুগডুগির পরিচিত সুর। সেই সুরের মায়ায় যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করেছেন মানুষ। কারও চোখে গভীর মনোযোগ, কেউ আবার গানের কথার সঙ্গে সঙ্গে ডুবে যাচ্ছেন আত্মঅনুসন্ধানের ভাবনায়।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়াবাড়িতে এমনই এক আবহে শুরু হয় লালনসংগীতের আসর। ভেকধারী শিল্পীদের দলীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে সূচনা হয় গানের পর্ব। তাঁদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় মানবপ্রেম, আত্মোপলব্ধি আর মনের মানুষের সন্ধানে লেখা ফকির লালন সাঁইয়ের কালজয়ী গান।
‘তোমার মতো দয়াল বন্ধু আর পাবো না’ গানের কথায় যেন মিশে থাকে এক গভীর আকুতি। প্রিয় সত্তার প্রতি নিবেদন, মনের মানুষের সন্ধান আর আত্মার সঙ্গে আত্মার সম্পর্কের অনুভূতি। লালনের গানে এমন কথামালা শ্রোতাকে শুধু আনন্দ দেয় না, ভাবনার জগতেও নিয়ে যায়।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামতেই লালন আখড়াবাড়ির গানের আসর জমে ওঠে। একের পর এক লালনসংগীতে মুখর হয়ে ওঠে আখড়ার পরিবেশ। রাতভর চলে সুরের এই আয়োজন। গানের টানে এক জায়গায় মিলিত হন সাধু, বাউল, লালনভক্ত ও নানা বয়সী শ্রোতা।
গানের সুরে মানবতার বার্তা
লালন সাঁইয়ের গান কেবল সংগীত নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবনদর্শন। জাতপাত, ধর্মীয় বিভেদ, বাহ্যিক পরিচয় আর মানুষের মধ্যে কৃত্রিম ব্যবধানের বিপরীতে লালনের গানে বারবার উঠে এসেছে মানবতার কথা। নিজের ভেতরের মানুষকে চেনা, আত্মার অনুসন্ধান এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসাই তাঁর দর্শনের অন্যতম অনুষঙ্গ।
তাই লালনের গান শুনতে এসে মানুষ শুধু সুরের মুগ্ধতায় আটকে থাকেন না। গানের প্রতিটি পঙ্ক্তি তাঁদের ভাবায়, নিজের জীবন ও সমাজকে নতুন করে দেখার সুযোগ করে দেয়।
ভেকধারী শিল্পীদের দলীয় পরিবেশনায় লালনসংগীতের সূচনা যেন সেই দর্শনেরই এক সম্মিলিত প্রকাশ। একজনের কণ্ঠে শুরু হওয়া সুর যখন অনেকের কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা হয়ে ওঠে মিলন ও সম্প্রীতির প্রতীক।
রাত জেগে গানের অপেক্ষা
লালন আখড়াবাড়ির রাতের আসরের বিশেষত্বই হলো এর নিজস্ব আবহ। এখানে গানের সঙ্গে মিশে থাকে সাধু-বাউলদের জীবনযাপন, ভাবের আদান-প্রদান এবং লালনের দর্শন নিয়ে অনুসন্ধান। কেউ গান শুনতে আসেন, কেউ আসেন সাধুদের সান্নিধ্যে সময় কাটাতে, আবার কেউ খুঁজে ফেরেন লালনের গানের অন্তর্নিহিত অর্থ। পরে লালন একাডেমির নারী ও পুরুষ শিল্পীদের আলাদা দলীয় সঙ্গীত গাওয়ার পর মঞ্চে আসেন এক এক করে লালন ঘরানোর শিল্পীরা। মাঝে লালন কন্যা খ্যাত নাসরিন আক্তার বিউটি গেয়ে শোনান পাঁচটি গান।
রাত যত গভীর হয়, গানের আসর ততই আবেশময় হয়ে ওঠে। একতারা আর দোতারার সুরে ভেসে আসে লালনের গান। শ্রোতারা কখনো নীরবে শোনেন, কখনো গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান। এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকে বাংলার লোকজ সংগীতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য।
লালনের গানের এই আসর কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে থাকা আয়োজন নয়। এর আবেদন ছড়িয়ে পড়ে মানুষের অনুভূতিতে, স্মৃতিতে এবং জীবনবোধে।
ছেঁউড়িয়ায় লালন, লালনের গানে মানুষ
ফকির লালন সাঁইয়ের স্মৃতিবিজড়িত ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি দীর্ঘদিন ধরেই লালনভক্তদের কাছে এক বিশেষ তীর্থস্থান। তাঁর গান ও দর্শনকে ঘিরে এখানে মানুষের সমাগম ঘটে। তিরোধান দিবসের আয়োজন সেই স্মৃতিকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
কনক রেজা নামে এক দর্শক বলেন, গান শুনতেই আমার এই লালনের আখড়াই আসা।সন্ধ্যা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত মঞ্চের বসে তান উপভোগ করলাম। লালনের অমীয় বাণী যেন এক একটা গানের কথামালা বাস্তবের রূপরেখা।
ঠাকুরগাঁও থেকে কয়েকজন বন্ধু নিয়ে লালনে এসেছেন লিমন সরকার। তিনি বলেন, লালনের গানে আমি বিমোহিত। গত বছর প্রথমবারের মতো এই লালনে এসেছিলাম। খুব ভালো লেগেছিলো বলে এবারও আমরা কয়েকজন মিলে এসেছি। লালনের আখড়াই বসে টুংটাং আওয়াজে গান শুনতে ভালো লাগে। তারপর আজকে ক্লোজআপ তারকা বিটির গান খুব কাচ থেকে উপভোগ করতে পেরে আরও ভালো লাগলো।
লালন শিল্পী শিরীন জানান, লালনকে জানতে হলে শুধু তাঁর গান শুনলেই হয় না, গানের ভেতরে থাকা মানুষকে খুঁজে নিতে হয়। তাঁর দর্শনের মর্মবাণী বুঝতে হয়। কারণ লালন মানুষের পরিচয়ের দেয়াল ভেঙে মানুষকেই বড় করে দেখার কথা বলেছেন। তাঁর গান তাই কোনো একটি সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয়, তা মানবতার এক মূল্যবান সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
ছেঁউড়িয়ার রাতভর গানের আসর সেই উত্তরাধিকারকে ধারণ করে। সুরে সুরে ফিরে আসে লালনের বাণী, আর মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর দর্শন।।
ছেঁউড়িয়ার আকাশে রাতভর ভেসে চলা লালনসংগীত তাই কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনের বর্ণনা নয়। এটি বাংলার মাটিতে গড়ে ওঠা এক মানবিক দর্শনের ধারাবাহিকতা, যেখানে গানের সুরে মানুষ খোঁজে মানুষকে, আর মনের গভীরে প্রশ্ন জাগে নিজেরই অচেনা সত্তাকে চেনার।
