কার্যকর হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানি বাণিজ্যের ওপর প্রস্তাবিত নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত মাসে অনুমোদিত একটি আইনের আওতায় এসব কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা থাকলেও শুক্রবার জারি করা এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের বাড়তে থাকা টানাপোড়েন এবং দীর্ঘ চার বছরের রুশ আগ্রাসনে কিয়েভের প্রতি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতির শৈথিল্যের মধ্যেই এই পদক্ষেপ এলো, যা ইউরোপীয় মিত্রদের নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার আওতায় মস্কোর অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা দেশের পণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ শতভাগ শুল্ক বসানোর বিধান রাখা হয়েছিল, যাতে রাশিয়ার যুদ্ধ তহবিলের অন্যতম বড় উৎস বাধাগ্রস্ত হয়।
হোয়াইট হাউস থেকে জারি করা নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প উল্লেখ করেন, “এ মুহূর্তে এ ধরনের অব্যাহতি দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থে- এ মর্মে আমি কংগ্রেসকে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছি।” তবে এই অব্যাহতি কীভাবে ওয়াশিংটনের স্বার্থরক্ষা করবে, সে ব্যাপারে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। প্রশাসনের পরবর্তী কোনো নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।
প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামানুসারে প্রণীত ‘গ্রাহাম অ্যাক্ট’-এর অধীনে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন একে নেতৃত্বের ‘চরম ও অনুমেয় ব্যর্থতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, কংগ্রেসের অভিপ্রায় অগ্রাহ্য করে ট্রাম্প মূলত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকেই সংঘাত জিইয়ে রাখার সুযোগ করে দিলেন। আইনটির অন্যতম প্রণেতা সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথালও মন্তব্য করেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে জাতীয় নিরাপত্তা নয়, বরং পুতিনকে তোষণ করার মনোভাব কাজ করেছে।
এদিকে কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্ক ক্রমেই শীতল হচ্ছে। সম্প্রতি রাশিয়ার ডিজেল রফতানি নিয়ে ট্রাম্পের এক সমঝোতায় ইউরোপীয় নেতারা যেমন বিস্মিত হয়েছেন, তেমনি জেলেনস্কিও নিজেকে প্রতারিত বলে দাবি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে জ্বালানির দাম স্বাভাবিক রাখতে ইউক্রেনকে রুশ তেল স্থাপনায় হামলা চালানো থেকে বিরত থাকার তাগিদ দিচ্ছে হোয়াইট হাউস। ইউক্রেন কিছুদিন হামলা স্থগিত রেখে পুনরায় তা শুরু করে, বিপরীতে রাশিয়াও ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় জোরালো আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার জন্য ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধকে কাঠগড়ায় তুললেও, ইরানে মার্কিন সামরিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে নিজ দেশেই তিনি সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছেন।
পাশাপাশি ইউক্রেনের সঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা সহযোগিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যদিও ট্রাম্প তা অস্বীকার করেছেন। এছাড়া ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইটের সামরিক সংস্করণে কড়াকড়ির ফলে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা, আগাম সতর্কতা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা এখনো পুরোপুরি গতিশীল হয়নি বলে জানিয়েছেন জেলেনস্কি। নিউজম্যাক্স-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট জানান, পুতিনের চেয়ে জেলেনস্কির সাথে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো তাঁর কাছে অনেক বেশি কঠিন।
অন্যান্য সামরিক জটিলতার মধ্যে সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রাশিয়ার অব্যাহত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে ইউক্রেনের হাতে থাকা প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র কার্যত শেষ হয়ে গেছে।
তবে ওয়াশিংটনের এমন অবস্থানের বিপরীতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিয়েভের পাশে থাকার বার্তা জোরালো করেছে। বেলজিয়ামে আয়োজিত এক সম্মেলনে জেলেনস্কি ইউরোপের ‘প্রকৃত নেতাদের’ ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সাথে মস্কো যুদ্ধ বন্ধ না করলে চাপ আরও বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ২২তম নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সূত্র: সিএনএন
