জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পেরিয়ে গেলেও রাজনৈতিক দলগুলোর সংকীর্ণ স্বার্থ, ক্ষমতার রাজনীতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আটকে রয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পেরিয়ে গেলেও রাজনৈতিক দলগুলোর সংকীর্ণ স্বার্থ, ক্ষমতার রাজনীতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আটকে রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে এই ঐতিহাসিক সনদ স্বাক্ষরিত হয়। গতকাল শনিবার ছিল এর এক বছর পূর্তি।
জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসা বিএনপি সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। তবে বিরোধী দল এই কমিটির উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে।
অভিযোগ উঠেছে সরকারী দল বিএনপি জুলাই সনদের মূল অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নের চেয়ে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার এবং জবাবদিহিহীন পুরোনো শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। তারা সংসদ এবং সংসদের বাইরে রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। একইসাথে জনমত গঠন করতে রাজপথে নানা কর্মসূচী পালন করছে। এদিকে রাষ্ট্রের সংস্কার প্রক্রিয়া মূলত আমলাতান্ত্রিক স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। বলা হচ্ছে, আমলারা নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ে সনদের বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে ২০২৪ইং সালের জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিগুলো সারা বছর ধরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে এসব উপেক্ষা করেই সরকার তাদের মূল এজেন্ডা মতে কাজ করছে। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বিচারক নিয়োগের জন্য "জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫" এবং বিভিন্ন জবাবদিহিমূলক অধ্যাদেশ বর্তমান সরকার বাতিল করেছে। এর ফলে সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীন সচিবালয় গঠন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)-এ দলনিরপেক্ষ নিয়োগের যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা পুনরায় নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বছর পূর্তিতে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, কৌশলগত পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন মূলত বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ক্ষমতাসীন ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষগুলো গণভোটের মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে তা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। সনদে স্বাক্ষর করার এক বছর পূর্তি হলেও এর অধিকাংশ সংস্কার প্রস্তাব ও প্রতিশ্রুতি এখনো কাগজে-কলমে বা ঝুলে রয়েছে, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা ও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। সরকার বলছে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সনদের সব প্রস্তাব অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকার জন-আকাক্সক্ষার বিপরীতে চলছে। এ অবস্থায় রাজপথে আন্দোলন জোরদার করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিরোধীরা।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর, বাস্তবায়ন আদেশ জারি ও গণভোটে জনগণের সম্মতির পর প্রত্যাশা ছিল, এবার সংস্কার কার্যক্রম শুরু হবে। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন নেই। সনদ স্বাক্ষরের পরই যেন থমকে গেছে সংস্কারপ্রক্রিয়া। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, ‘জুলাই সনদের সবটাই আমরা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করব। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, জুলাই যোদ্ধাসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে কথা বলেছি। আরও বলব। সমাজের সব স্তরের মানুষের মতামত নিয়ে একটি প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারে ওই বছরের অক্টোবরে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এসব সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সভাপতি ও অধ্যাপক আলী রীয়াজকে সহসভাপতি করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন প্রথমে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেয়। এরপর মতামতের ভিত্তিতে দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে ৩২টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ৪৯টি বৈঠক হয়। পরে মৌলিক সংস্কারের ১৯টি বিষয় নিয়ে দ্বিতীয় ধাপে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা হয়। ২৩ দিনের আলোচনায় ১৯টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও ৮টিতে সর্বসম্মতি আসে; বাকি বিষয়গুলোতে ভিন্নমত ছিল।
প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের সংলাপের ভিত্তিতে তৈরি হয় জুলাই জাতীয় সনদ। এতে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। বাকি ৩৬টি আইন, অধ্যাদেশ, বিধি বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ভিন্নমতসহ সনদে স্বাক্ষর করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ২৪টি দল। দুই দিন পর ১৯ অক্টোবর গণফোরাম এবং সর্বশেষ চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষর করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে ৫ দফা সংলাপ করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। যার ভিত্তিতে সরকারকে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারির প্রস্তাব করে কমিশন। ১৩ নভেম্বর আদেশ জারি করে সরকার। যার ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছিল গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হলে দ্বিকক্ষের সংসদ, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে ভিন্নমত থাকবে না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবে। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সনদে থাকা সংবিধান-সম্পর্কিত বিষয়গুলো সংবিধানে যুক্ত করা হবে।
এরপর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হয়। কিন্তু সনদের অঙ্গীকার মতে, বিএনপির সংসদ সদস্যরা (এমপি) সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। আদেশটিকে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা বলেও দাবি করে দলটি। অন্যদিকে সংসদ সদস্য ও সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন বিরোধী দলের এমপিরা। এর পর থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করছে বিরোধী দলগুলো।
চলতি সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ রাখা হয়। কিন্তু বিরোধীরা ওই কমিটিতে যায়নি। এর মধ্যেই কমিটি রাজনৈতিক দল, জুলাই যোদ্ধা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন তৈরি করে আগামী বছরের জানুয়ারির অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব উত্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিলটি পাস হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে যত আন্দোলন
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ পুরোপুরি বাস্তবায়ন এবং গণভোটের রায় কার্যকরের দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন রাজপথে এবং সংসদের ভেতর আন্দোলন ও কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি (ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি)সহ সমমনা দলগুলো দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে তারা ঢাকাসহ দেশজুড়ে লংমার্চ, গণসংযোগ, লিফলেট বিতরণ, সেমিনার ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে।
জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং ভোট কারচুপি ও জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচারসহ সনদের বিভিন্ন ধারা (যেমন—স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন ও দুর্নীতিবাজদের দলীয় মনোনয়ন রোধে ৭৫ নম্বর ধারা) দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে নতুন মঞ্চ বা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের তৎপরতা চলছে। জুলাই বিপ্লবের নির্বাচিত সংসদে জামায়াত ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করে সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, সরকার ও শাসক দল প্রচলিত নিয়মে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই সনদের মূল প্রস্তাবগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন বামপন্থী দল ও যুব সংগঠনগুলো সরকারের কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে আলোচনা সভা ও রাজপথে রাজনৈতিক দায় স্মরণ করিয়ে কর্মসূচি পালন করছে। তাদের মতে, নির্বাচিত সংসদকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কার্যকর না করায় সনদ বাস্তবায়নে ধীরগতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপি ও ক্ষমতাসীন জোটের অবস্থান হলো—যেভাবে তারা জুলাই সনদে সই করেছে (ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্টসহ), সে অনুযায়ী প্রচলিত নিয়মিত সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সংবিধান সংশোধন করা হবে। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে আলাদা শপথ নেওয়ার ধারণাকে অবৈধ ও অপ্রয়োজনীয় বলে দাবি করছে।
