রাজশাহীর ১৫০ শয্যার বক্ষব্যাধি হাসপাতালটিতে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন ২৫০ থেকে ৩০০ রোগী। রাজশাহী বিভাগ ছাড়াও রংপুর ও খুলনা বিভাগের কিছু এলাকা থেকেও রোগীরা এখানে সেবা নিতে আসেন। বিপুল এই রোগীর চাপের বিপরীতে হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ মাত্র ১০টি। এর মধ্যে একটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। আবার সেবার পরিধি বাড়লেও চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির সংকটে ধুঁকছে হাসপাতালটি।
১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটিতে চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি রয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি, ওষুধ সংকট, টেকনোলজিস্ট স্বল্পতা, জরাজীর্ণ পরিবেশ এবং দেয়ালে পলেস্তারা খসে পড়ার চিত্র। যক্ষ্মার চিকিৎসা দিয়ে যাত্রা শুরু করা হাসপাতালটি সময়ের সঙ্গে বক্ষব্যাধি ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে যক্ষ্মার পাশাপাশি অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস, সিওপিডি ও শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয় এখানে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১০টি। এর মধ্যে সিনিয়র কনসালট্যান্টের একটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। কর্মরত চিকিৎসকদের কয়েকজন প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকায় সরাসরি রোগী দেখা ও জরুরি সেবা পরিচালনায় মেডিক্যাল অফিসারদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. শারিকুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসক সংকটের কারণে হাসপাতালের নিয়মিত সেবা দিতে চিকিৎসকদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। এখানে মোট চিকিৎসকের পদ ১০টি। এর মধ্যে দুজন আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার, একজন তত্ত্বাবধায়ক ও মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট, একজন কনসালট্যান্ট এবং বাকি ছয়জন মেডিক্যাল অফিসার রয়েছেন। মেডিক্যাল অফিসারদের বহির্বিভাগের রোগী দেখা ছাড়াও ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবা চালু রাখতে হয়।
শুরুতে কেবল যক্ষ্মার চিকিৎসার জন্য এটি চালু করা হয়েছিল। পরে নাম পরিবর্তন করে বক্ষব্যাধি হাসপাতাল করা হয় এবং যক্ষ্মার পাশাপাশি অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস, সিওপিডি ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু সেবার পরিধি বাড়লেও আগের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী চিকিৎসকের পদসংখ্যা রয়ে গেছে।
চিকিৎসকের সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি নিয়েও রয়েছে নানা সমস্যা। রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু আধুনিক যন্ত্র না থাকায় এবং কয়েকটি যন্ত্রে ত্রুটি থাকায় সব ধরনের পরীক্ষা হাসপাতালে করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে ল্যাবরেটরির অ্যানালাইজার মেশিনে সমস্যা থাকায় কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছে।
হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স সাবিনা ইয়াসমিন জানান, প্রতিদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগীর পরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় মেশিনের সংখ্যা কম হওয়ায় কোনো একটি মেশিনে সমস্যা দেখা দিলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
হাসপাতালের এক্স-রে বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্রপাতি নিয়ে সমস্যা রয়েছে। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি) মো. সাজ্জাদ আলী জানান, হাসপাতালের ডিআর ডিজিটাল এক্স-রে মেশিনটি দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর একাধিকবার নষ্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, আমার জানামতে, খালেদা জিয়ার আমলে বাংলাদেশে চারটি মেশিন এসেছিল। তার মধ্যে রাজশাহী বিভাগে একটি মেশিন সরকার দিয়েছিল। দীর্ঘদিন কাজ করার পর আমাদের মেশিনটি দুবার হঠাৎ বন্ধ হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। পরে কর্তৃপক্ষ দুবার এটি মেরামত করেছে। কিন্তু মেরামতের পর আবারও নষ্ট হয়েছে।
তবে, হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মো. মজিবুর রহমানের দাবি, বর্তমানে এক্স-রে মেশিনটি সচল রয়েছে। সম্প্রতি ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত অ্যানালাইজার মেশিনে সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং সেটি মেরামতের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালে ইসিজি মেশিনের সংখ্যা মাত্র একটি। ফলে, একমাত্র মেশিনটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিকল্প মেশিন না থাকায় একটি যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালে প্রায় ৪৮ ধরনের ওষুধ সরবরাহের তালিকা থাকলেও রোগীদের নিয়মিতভাবে দেওয়া হচ্ছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ধরনের ওষুধ। প্রয়োজনীয় অন্যান্য ওষুধ কিনতে রোগীদের হাসপাতালের বাইরের ফার্মেসিতে যেতে হচ্ছে। এতে রোগীদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট শীলা রানী দত্ত বলেন, এখান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যানালজেসিক বা ব্যথানাশকসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। অ্যান্টিবায়োটিক জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে এবং অ্যান্টিহিস্টামিন অ্যালার্জিজনিত সমস্যায় ব্যবহৃত হয়। এখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। প্রতিদিন প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ রোগীকে ওষুধ সরবরাহ করা হয়।
এদিকে, হাসপাতালের কারিগরি জনবল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ল্যাবরেটরিতে একজন এবং এক্স-রে বিভাগে একজন টেকনোলজিস্ট রয়েছেন। টেকনোলজিস্টের পদসংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন সুপারিনটেনডেন্ট।
এদিকে, ২৭ একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালের অবকাঠামোতেও রয়েছে নানা সমস্যা। হাসপাতালের পুরনো ভবনটি নির্মিত হয় ১৯৬৬ সালে। পুরনো ভবনের বিভিন্ন দেয়াল ও ছাদে পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনা ঘটছে। কয়েক দফা সংস্কার করা হলেও বিভিন্ন স্থানে আবারও একই সমস্যা দেখা দিয়েছে।
সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মো. মজিবুর রহমান বলেন, হাসপাতাল ভবনটি পুরনো হওয়ায় কিছু কিছু জায়গায়, বিশেষ করে কয়েকটি ওয়ার্ডে পলেস্তারা খসে পড়ার সমস্যা রয়েছে। এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেগুলো সংস্কার করেছি। আবারও গণপূর্ত বিভাগকে জানানো হয়েছে। তারা সংস্কার করে দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
