
মানুষের জীবনের সার্থকতা কেবল অর্জিত পদমর্যাদা, খ্যাতি কিংবা কর্মজীবনের সাফল্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। জীবনের প্রকৃত মহিমা প্রকাশ পায় তিনি কত মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পেরেছেন, কত মানুষের জীবন আলোকিত করেছেন এবং তাঁর অনুপস্থিতিতেও কতটা গভীরভাবে স্মরণীয় হয়ে থেকেছেন, তার মধ্য দিয়ে। একজন গুণী শিক্ষকের বিদায় তাই নিছক একজন মানুষের চলে যাওয়া নয়; তা প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও স্নেহের আশ্রয় হারানোর বেদনাও। ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগং (ইউএসটিসি)-এর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মানের প্রয়াণ আমাদের সামনে সেই চিরন্তন সত্যটিকেই নতুন করে তুলে ধরেছে।
কিছু মানুষ পদ–পদবি দিয়ে পরিচিতি অর্জন করেন, আবার কেউ কেউ ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও আচরণ দিয়ে মানুষের অন্তরে স্থায়ী আসন গড়ে নেন। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মান ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তাঁর জীবন ও কর্মের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল শিক্ষকতা, উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার অভিজ্ঞতা। তাঁর প্রয়াণে ইউএসটিসি পরিবার হারিয়েছে একজন অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও শ্রদ্ধাভাজন অভিভাবককে। যাঁরা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছেন কিংবা তাঁর নেতৃত্বে পথ চলেছেন, তাঁদের কাছে এই শূন্যতা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক নয়, গভীরভাবে ব্যক্তিগতও।
অধ্যাপক ড. সোলায়মান স্যারের শিক্ষকতা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গড়ে উঠেছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে শিক্ষকতা এবং অবসর–পরবর্তী সময়ে সুপার নিউমেরারি অধ্যাপক হিসেবে স্বীকৃতি তাঁর দীর্ঘ একাডেমিক যাত্রার উল্লেখযোগ্য অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ কেবল বক্তৃতা দেওয়ার স্থান নয়; সেখানে তৈরি হয় নতুন চিন্তা, বিকশিত হয় যুক্তিবোধ, জন্ম নেয় ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বীজ। একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষকের প্রভাব তাই শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে আবদ্ধ থাকে না। শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে প্রবেশ করার বহু বছর পরও তাঁর পরামর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুপ্রেরণা তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে।
শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণা একটি প্রাণবন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। শিক্ষকতা বিদ্যমান জ্ঞানকে ছড়িয়ে দেয়, আর গবেষণা সেই জ্ঞানের সীমানা প্রসারিত করে, পুরোনো ধারণাকে প্রশ্ন করে এবং নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে শুধু সনদ প্রদান নয়, মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও জাতীয় উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখার প্রত্যাশাও বাড়ছে। এই পরিবর্তনের যুগে অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা তরুণ শিক্ষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাঁদের কর্মজীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জ্ঞানচর্চার কোনো অবসর নেই; শেখা ও শেখানোর দায়িত্ব আজীবনের।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তারের ফলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার পরিসর অনেক প্রসারিত হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের অংশগ্রহণ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আদান–প্রদানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অধ্যাপক সোলায়মানের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পেশাগত সম্পৃক্ততা তাঁর একাডেমিক জীবনের আরেকটি দিক। একজন শিক্ষাবিদের অবদানকে তিনি সর্বশেষ যে প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায় না। তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন অধ্যায়, শিক্ষাদানের অভিজ্ঞতা এবং উচ্চশিক্ষার প্রতি অঙ্গীকার মিলিয়েই গড়ে ওঠে তাঁর সামগ্রিক পরিচয়।
একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব বহুমাত্রিক। তাঁকে একদিকে শিক্ষার মান, গবেষণা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হয়; অন্যদিকে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, সমস্যা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতিও সংবেদনশীল থাকতে হয়। দক্ষ নেতৃত্বের পরিচয় শুধু সিদ্ধান্ত গ্রহণে নয়, বরং মানুষের কথা শোনা, মতপার্থক্য মোকাবিলা করা এবং সম্মিলিতভাবে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার সামর্থ্যের মধ্যেও প্রকাশিত হয়।
ইউএসটিসির উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মান স্যার এই বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর প্রয়াণে বিশ্ববিদ্যালয় একজন অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদকে হারিয়েছে, যাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের অভিজ্ঞতা তাঁর নেতৃত্বকে সমৃদ্ধ করেছিল। তবে তাঁর প্রতি আমাদের ব্যক্তিগত শ্রদ্ধার সবচেয়ে আবেগময় দিকটি হলো তাঁর অভিভাবকতুল্য পরিচয়। একজন প্রশাসনিক প্রধানের সঙ্গে সহকর্মীদের সম্পর্ক সাধারণত দায়িত্ব ও নিয়মের কাঠামোর মধ্যে আবর্তিত হয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যখন সেই কাঠামোর মধ্যেও মানবিকতা, সহমর্মিতা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পারেন, তখন তাঁর নেতৃত্ব মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী স্থান করে নেয়।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা শুধু নিয়মনীতি বাস্তবায়ন কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আশা–আকাঙ্ক্ষা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সম্মিলিত অগ্রযাত্রা। এই দায়িত্ব পালনে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন ধৈর্য, ন্যায়বোধ, প্রজ্ঞা ও মানবিক সংবেদনশীলতা। ইউএসটিসির উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মানকে এসব দায়িত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হয়েছে।
তবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের বাইরেও একজন মানুষের যে পরিচয় মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে থাকে, তা হলো তাঁর মানবিক উপস্থিতি। একটি বিশাল বটবৃক্ষ যেমন প্রখর রৌদ্রতপ্ত পথিককে ছায়া দেয়, ক্লান্ত মানুষকে আশ্রয় দেয়, তেমনি একজন অভিভাবকতুল্য মানুষ তাঁর আশপাশের মানুষকে সাহস, আস্থা ও নির্ভরতার অনুভূতি দেন। অধ্যাপক সোলায়মানকে যাঁরা স্নেহ ও শ্রদ্ধার চোখে দেখেছেন, তাঁদের স্মৃতিতে তাঁর এই অভিভাবকসুলভ উপস্থিতি বিশেষভাবে বেঁচে থাকবে। তাঁর অনুপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত করিডর, শ্রেণিকক্ষ ও প্রশাসনিক কার্যালয় হয়তো আগের মতোই থাকবে, কিন্তু সেসব জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো বহন করবে এক ভিন্ন আবেগ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রাঙ্গণ, প্রশাসনিক ভবন, পরিচিত করিডর কিংবা শ্রেণিকক্ষ সবকিছুই থাকবে। কর্মব্যস্ততা আবারও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসবে। কিন্তু দীর্ঘদিনের কর্মসম্পর্কে গড়ে ওঠা স্মৃতি, পরিচিত কণ্ঠস্বর, পরামর্শ এবং অভিভাবকসুলভ উপস্থিতির অভাব সহজে পূরণ হওয়ার নয়। অধ্যাপক সোলায়মানের প্রয়াণে ইউএসটিসি পরিবারের শোকের গভীরতা বুঝতে হলে এই মানবিক সম্পর্কের গুরুত্ব উপলব্ধি করা প্রয়োজন। তাঁর অনুপস্থিতি শুধু একটি প্রশাসনিক পদে শূন্যতা সৃষ্টি করেনি; বরং পরিচিত এক ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য হারানোর বেদনাও রেখে গেছে।
মানুষ চলে যান, প্রতিষ্ঠান চলতে থাকে এটাই জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস কেবল ভবন, নথিপত্র, বিধিবিধান কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে তৈরি হয় না। সেই ইতিহাসের প্রাণ সঞ্চার করেন মানুষ; তাঁদের শ্রম, নিষ্ঠা, সম্পর্ক, স্বপ্ন ও অবদান। তাই একজন শিক্ষাবিদের প্রয়াণে শোক প্রকাশের পাশাপাশি তাঁর রেখে যাওয়া মূল্যবোধকে ধারণ করাও জরুরি।
মৃত্যু জীবনের অনিবার্য পরিণতি ও পাঠ, কিন্তু অর্থবহ জীবনের প্রভাব মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। মানুষের দেওয়া জ্ঞান, সৃষ্ট সম্পর্ক, পালন করা দায়িত্ব এবং অন্যের জীবনে রেখে যাওয়া ইতিবাচক প্রভাবই তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মানের প্রয়াণে ইউএসটিসি পরিবার যে শূন্যতার মুখোমুখি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবু তাঁর জীবন ও কর্মের স্মৃতি আমাদের শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা, সততা এবং মানবিক মর্যাদার আদর্শে অবিচল থাকার প্রেরণা জোগাক। আজ গভীর শ্রদ্ধা ও বেদনায় তাঁকে স্মরণ করছি।
লেখক: কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।
