মিশেল ফুকো, নামটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় কোনো বইয়ের মলাট থেকে নয়, বরং একধরনের কৌতূহল থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার আগেও মিশেল ফুকো নামে যে এমন একজন মানুষ আছেন, সেটাই অজানা ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দিকে যখন ফুকো নামের সঙ্গে পরিচয় ঘটে, তখন আমার কাছে ফুকো ছিলেন অনেকটা দুর্বোধ্য এক অরণ্যের মতো। পাতা উল্টাতাম, বাক্য পড়তাম, কিন্তু অর্থ যেন কোথাও গিয়ে ধরা দিত না। ‘ক্ষমতা’, ‘শৃঙ্খলা’, ‘জ্ঞান’, ‘নজরদারি’ শব্দগুলো পরিচিত, অথচ ফুকোর কাছে গিয়ে তাদের অর্থ যেন হঠাৎই বদলে যেতে শুরু করে।
শুরুটা হয়েছিল পাঠচক্র দিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে যোগাযোগ বাড়তে থাকে এই মানুষটার সঙ্গে, অবশ্য বইয়ের পৃষ্ঠা পেরিয়েই। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার দুজন শিক্ষক ছিলেন, যাদের কাছ থেকেই ফুকো, ফ্রয়েড, কার্ল মার্ক্সের মতো নামগুলোর সঙ্গে পরিচয়ের শুরু। তারা হয়তো আমাকে কোনো নির্দিষ্ট উত্তর দেননি; বরং প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হয়ে যে খুব আনন্দিত হয়েছিলাম, তা নয়। বরং সময়ের সঙ্গে জায়গাটির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছি। ভালো লাগাও তৈরি হয়েছে। কিন্তু, আজ পেছনে ফিরে মনে হয়, আমি হয়তো জায়গাটাকে খুব বেশি ভালোবাসিনি; ভালোবেসেছি সেই মানুষগুলোকে, যাদের কাছ থেকে শিখেছি, যাদের দেখে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছি, বড় হয়েছি, বদলেছি।
এই সময়ে এসে মনে হয়, ফুকোকে বোঝা মানে শুধু একজন দার্শনিককে বোঝা নয়; বরং আমরা যে পৃথিবীর ভেতরে বাস করি, তার অদৃশ্য কাঠামোগুলোকে একটু অন্যভাবে দেখতে শেখা। ১৯২৬ সালের ১৫ অক্টোবর, ফ্রান্সের পোয়েটিতে জন্ম নেওয়া ফুকো পরবর্তীতে দর্শন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞানসহ মানববিদ্যার বহু শাখায় গভীর প্রভাব ফেলেন। ১৯৬৯ সালে তিনি কোলেজ দ্য ফ্রান্সে ‘ইতিহাস অব সিস্টেমস অব থট’-এর অধ্যাপক হন।
তার ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ’ পড়তে গিয়ে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল একটি প্রশ্ন—আমাদের কে নিয়ন্ত্রণ করে? প্রথমে উত্তরটি খুব সহজ মনে হয়। রাষ্ট্র, আইন, পুলিশ, প্রশাসন; ক্ষমতার দৃশ্যমান কেন্দ্রগুলোকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি। কিন্তু, ফুকো সেই সহজ উত্তরটিকে ‘ঘেঁটে ঘ’ করে দিলেন। দেখালেন ক্ষমতা কেবল ওপর থেকে নিচে নেমে আসা কোনো আদেশ নয়; ক্ষমতা ছড়িয়ে থাকে প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সম্পর্ক, দৈনন্দিন আচরণ, ভাষা এবং জ্ঞান উৎপাদনের ভেতরেও।
এই জায়গাটিই আমার কাছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর এবং একইসঙ্গে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কে কখন ক্লাসে ঢুকবে, কতক্ষণ থাকবে, উপস্থিতির হিসাব কীভাবে হবে, পরীক্ষায় কে ‘ভালো’ আর কে ‘খারাপ’, কে ‘মেধাবী’ আর কে ‘দুর্বল’; এসব কি নিছক প্রশাসনিক ব্যবস্থা? ফুকোকে পড়লে প্রশ্নটি আর এত সরল থাকে না। কারণ ‘পরীক্ষা’ শুধু একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞান যাচাই করে না; একইসঙ্গে তাকে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভেতরে স্থাপন করে। ফুকোর বিশ্লেষণে পরীক্ষা জ্ঞান ও ক্ষমতার এমন এক সংযোগস্থল, যেখানে মানুষ একইসঙ্গে ‘জানা’ এবং ‘পর্যবেক্ষিত’ হওয়ার বস্তুতে পরিণত।
আজকের পৃথিবীতে সেই নজরদারির পরিধি আরো বিস্তৃত। ক্যামেরা আছে, ডিজিটাল রেকর্ড আছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আছে, অ্যালগরিদম আছে। আমরা অনেক সময় জানিও না কে আমাদের দেখছে। অথচ আমরা এমন আচরণ করি, যেন কেউ আমাদের দেখছে। ফুকোর আলোচিত ‘প্যানোপটিকন’-এর ধারণাটি এখানেই নতুন তাৎপর্য পায়।
কারাগারের বন্দি সবসময় সত্যিই নজরদারিতে আছে কি না, সে জানে না; কিন্তু নজরদারির সম্ভাবনাই তাকে নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য করে। অর্থাৎ, একসময় যে পাহারাদারকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, আধুনিক শৃঙ্খলা অনেক ক্ষেত্রে সেই পাহারাদারকে আমাদের ভেতরেই বসিয়ে দেয়।
ফুকোর এই পাঠ শুধু কারাগারের পাঠ নয়। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, কারখানা; আধুনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শৃঙ্খলাব্যবস্থার ভেতরেও তিনি একই ধরনের ক্ষমতার কার্যপ্রণালি অনুসন্ধান করেছিলেন। তার যুক্তিতে আধুনিক শাস্তি হয়তো প্রকাশ্য নির্যাতনের জায়গা থেকে সরে এসেছে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ক্ষমতা বিলীন হয়েছে; বরং ক্ষমতা আরো সূক্ষ্ম, নিয়মতান্ত্রিক ও অন্তর্গত হয়ে উঠতে পারে।
তবে ফুকোকে নিয়ে আমার নিজের বোঝাপড়াও সম্পূর্ণ নয়। সত্যি বলতে, এখনো নয়। তার লেখা পড়তে গিয়ে অনেক জায়গায় থমকে যেতে হয়, আবার কখনো মনে হয় বুঝেছি, কিছুদিন পর সেই বোঝাপড়াই ভেঙে যায়। হয়তো এখানেই পাঠের সৌন্দর্য। একজন পাঠক যতবার পড়েন, ততবার তার নিজের বোঝাপড়ার পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুন অর্থ তৈরি হতে পারে। রোলাঁ বার্তের ‘লেখকের মৃত্যু’ ধারণার সঙ্গে এই অভিজ্ঞতার এক ধরনের আত্মীয়তা আছে। পাঠের অর্থ কেবল লেখকের একক কর্তৃত্বে বন্দি থাকে না; পাঠকের অভিজ্ঞতা, অবস্থান ও সময়ও অর্থ নির্মাণের অংশ হয়ে ওঠে।
তাই ফুকোকে পড়ার কোনো শেষ পাঠ নেই; আমার অন্তত নেই। হয়তো ফুকোকে পড়ার সবচেয়ে বড় শিক্ষা তার কোনো একটি তত্ত্ব নয়; বরং যা স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছি, তার ভেতরেও প্রশ্ন করার অভ্যাস। কে নিয়ম বানায়? কে ঠিক করে কোন জ্ঞান সত্য? কাকে স্বাভাবিক বলা হচ্ছে, আর কাকে অস্বাভাবিক? কে কথা বলার অধিকার পায়? কার কণ্ঠ নথিভুক্ত হয়, আর কার কণ্ঠ হারিয়ে যায়?
গণযোগাযোগের শিক্ষার্থী হিসেবে এই প্রশ্নগুলো আরো জরুরি হয়ে ওঠে। কারণ সংবাদ শুধু ঘটনার বিবরণ নয়; কোন ঘটনা সংবাদ হবে, কোন ভাষায় তা বলা হবে, কার বক্তব্য গুরুত্ব পাবে; এসবের মধ্যেও নির্বাচন আছে, ক্ষমতার সম্পর্ক আছে।
আমার কাছে ফুকো কোনো সম্পূর্ণ বোঝা দার্শনিক নন। তিনি বরং একটি অসমাপ্ত প্রশ্ন। এমন এক প্রশ্ন, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে নিজেরই বহু পুরোনো বিশ্বাসকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয়, হচ্ছে এবং আগামীতেও হবে। বোধ করি, ফুকোর সঙ্গে আমার সম্পর্কের সবচেয়ে সত্য সংজ্ঞা এটাই; আমি তাকে পুরোপুরি বুঝিনি। কিন্তু, তাকে পড়ার পর পৃথিবীটাকে আগের মতো সরল মনে করতে পারিনি।
