চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর। বরেন্দ্রভূমির এই জনপদের ইতিহাস বহু পুরোনো। মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর কাছাকাছি এ অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন সময়ের প্রত্ননিদর্শন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার নওদা এলাকায় অবস্থিত রহনপুরের অষ্টভুজী সমাধিসৌধ। অষ্টভুজ পরিকল্পনা ও মিহরাবের উপস্থিতির কারণে স্থাপনাটি বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
শফিকুল ইসলাম, গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ)
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর। বরেন্দ্রভূমির এই জনপদের ইতিহাস বহু পুরোনো। মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর কাছাকাছি এ অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন সময়ের প্রত্ননিদর্শন। এসবের মধ্যে নওদা এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি অষ্টভুজাকৃতির ইমারত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্থানীয়ভাবে এটি ‘অষ্টভুজী গম্বুজ’ নামে পরিচিত। প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্থাপত্যবিষয়ক সূত্রে এটি ‘রোহনপুর অষ্টভুজী সমাধিসৌধ’ নামে পরিচিত।
রহনপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে নওদা গ্রামে স্থাপনাটির অবস্থান। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, রহনপুর-নওদা এলাকায় টিকে থাকা মধ্যযুগীয় ভবনগুলোর মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। স্থাপনাটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণ ও সংস্কারের আওতায় এসেছে।
অষ্টভুজ পরিকল্পনার ব্যতিক্রমী স্থাপনা
ইটের তৈরি ভবনটির বাইরের পরিমাপ প্রায় ২৬ দশমিক ৫২ মিটার। এর আটটি দেয়ালের প্রতিটির পুরুত্ব প্রায় ১ দশমিক ৩৭ মিটার এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ দশমিক ৩৪ মিটার। ভবনে প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি প্রবেশপথ। প্রবেশপথগুলোর সম্মুখভাগে অলংকরণ, খিলান মোটিফ ও ছোট মিনারসদৃশ স্থাপত্য উপাদান রয়েছে। প্যারাপেটেও অলংকরণের ব্যবহার দেখা যায়।
ভবনটির ওপর রয়েছে একটি বড় গম্বুজ। অষ্টভুজাকার ড্রামের ওপর গম্বুজটি স্থাপিত এবং আটটি দেয়ালই এর ভার বহন করছে। গম্বুজের শীর্ষে পদ্ম ও কলসচূড়ার অলংকরণের উল্লেখ পাওয়া যায়। অভ্যন্তরের নিচের অংশেও পত্রনকশার অলংকরণ রয়েছে।
স্থাপনাটির উত্তর দেয়ালের ভেতরে রয়েছে অর্ধ-অষ্টভুজাকার একটি মিহরাব কুলুঙ্গি। ভবনটির স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এই মিহরাব এবং অষ্টভুজ পরিকল্পনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সমাধিসৌধ—তবে নিশ্চিত নয়
স্থাপনাটির পরিচয় নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এর নির্মাণ-উদ্দেশ্য। স্থানীয়ভাবে এটি সমাধিসৌধ হিসেবে পরিচিত। মিহরাবের উপস্থিতিও একে সমাধিসৌধ হিসেবে বিবেচনার একটি স্থাপত্যগত ইঙ্গিত দেয়। তবে বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভবনটির ভেতরে কোনো কবর বা শবাধার পাওয়া যায় না। ফলে এটি কার সমাধি এবং মূলত কোন উদ্দেশ্যে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
শৈলীগত বিচারে ভবনটি সপ্তদশ শতকের শেষভাগে নির্মিত বলে অনুমান করা হয়েছে। অর্থাৎ নির্মাণকাল সম্পর্কেও এখানে ‘অনুমান’ শব্দটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এটিকে মুঘল আমলের নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিজয়স্মারক বা নির্দিষ্ট কোনো প্রশাসনিক স্থাপনা হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
একই কারণে নদীপথ পর্যবেক্ষণ বা নিরাপত্তার কাজে এটি ব্যবহৃত হয়েছিল—এমন ধারণাকেও প্রমাণিত ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। এ ধরনের কোনো ব্যবহার হয়ে থাকলে তা নির্ধারণে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা প্রয়োজন।
বাংলার মুসলিম স্থাপত্যে কেন গুরুত্বপূর্ণ
অষ্টভুজ পরিকল্পনার কারণে স্থাপনাটি বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, সময়ের বিচারে এটি সম্ভবত বাংলার মুসলিম স্থাপত্যে অষ্টভুজ পরিকল্পনার সবচেয়ে প্রাচীন উদাহরণ। তবে ‘প্রথম’ শব্দটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন, কারণ এটি বর্তমান পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া নিদর্শনের ভিত্তিতে করা একটি স্থাপত্য-ঐতিহাসিক মূল্যায়ন।
বাংলাপিডিয়ায় আরও উল্লেখ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে রাজমহলের বেগমপুরে অষ্টভুজী সমাধিসৌধে এ ধরনের পরিকল্পনার পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। একই সঙ্গে উত্তর ভারতীয় তুঘলক, সৈয়দ ও লোদি আমলের অষ্টভুজী সমাধিসৌধের সঙ্গে এ স্থাপত্যধারার সম্পর্কের কথাও আলোচনায় এসেছে।
এক স্থাপনা নয়, পুরো এলাকাই গুরুত্বপূর্ণ
রহনপুরের গুরুত্ব শুধু এই গম্বুজে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে নওদা এলাকার আশপাশের পীরপুর, ভাগলপুর, প্রসাদপুর ও কসবা গ্রামে প্রত্নতাত্ত্বিক ঢিবি, পুকুর, পুরোনো ইট ও মৃৎপাত্রের নিদর্শনের কথা উল্লেখ রয়েছে। এসব উপাদান থেকে এ অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের বসতি ও কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনার কথা বোঝা যায়।
এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক গবেষণায় রহনপুর অঞ্চলে দুই থেকে আড়াই হাজার বছর আগের একটি প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র ও বসতির সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। গবেষকেরা উপরিভাগের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পর্যবেক্ষণ করে মুদ্রা, পুঁতি, মৃৎপাত্র, মূর্তি ও অন্যান্য নিদর্শনের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, আরও পরিকল্পিত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন হলে এ অঞ্চলের অতীত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
তবে এই প্রাচীন জনপদের তথ্যকে অষ্টভুজী গম্বুজের নির্মাণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার আগে আরও গবেষণা প্রয়োজন। কারণ প্রাচীন বসতির নিদর্শন এবং পরবর্তী মধ্যযুগীয় স্থাপনার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করার জন্য নির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য দরকার।
নওদা বুরুজও গুরুত্বপূর্ণ
অষ্টভুজী গম্বুজের কাছাকাছি নওদা বুরুজ নামে আরেকটি প্রত্নস্থল রয়েছে। অতীতে এ স্থানের সংরক্ষণ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ২০১৬ সালের এক প্রতিবেদনে নওদা বুরুজে অবৈধ বসতি ও মাটি কাটার অভিযোগের পাশাপাশি অষ্টভুজী সমাধিসৌধের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
তবে এক দশক আগের ওই প্রতিবেদনকে বর্তমান পরিস্থিতির সরাসরি বর্ণনা হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না। বর্তমান সংরক্ষণ পরিস্থিতি, জনবল এবং স্থাপনাটির শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে হালনাগাদ মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বর্তমান তথ্যেও ‘রোহনপুর সমাধিসৌধ’ সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় রয়েছে।
আরও গবেষণা জরুরি
রহনপুরের অষ্টভুজী গম্বুজকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো নির্ভরযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা। স্থাপনাটির নির্মাণকাল, নির্মাণকারী, মূল ব্যবহার এবং আশপাশের প্রত্নস্থানের সঙ্গে এর সম্পর্ক—এসব বিষয়ে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
স্থাপনাটির স্থাপত্যের বিস্তারিত নথিভুক্তকরণ, আশপাশের প্রত্নস্তর জরিপ, প্রয়োজন হলে বৈজ্ঞানিক খনন এবং পুরোনো নথিপত্র পর্যালোচনা করা গেলে এর ইতিহাস আরও স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নজরদারিও জরুরি।
রহনপুরের অষ্টভুজী গম্বুজের গুরুত্ব শুধু তার বয়সে নয়; এর গুরুত্ব নিহিত এর অস্বাভাবিক অষ্টভুজ পরিকল্পনা, মিহরাবের উপস্থিতি এবং নির্মাণ-উদ্দেশ্যকে ঘিরে থাকা অনিশ্চয়তায়। ইতিহাসের অনেক প্রশ্নের উত্তর হয়তো এই স্থাপনাটির দেয়ালের মধ্যেই লুকিয়ে আছে—তবে সেই উত্তর বের করতে প্রয়োজন অনুমানের চেয়ে বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান।
বরেন্দ্রভূমির এই নীরব স্থাপনাটি তাই একই সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং গবেষণার ক্ষেত্র। যথাযথ সংরক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান হলে রহনপুরের অতীতের আরও অনেক অজানা অধ্যায় ভবিষ্যতে উন্মোচিত হতে পারে।
