১৯৭২ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন বাংলাদেশের এক তরুণ। পড়াশোনার খরচ জোগাতে নানা কাজ করেছেন। ডিগ্রি নিয়ে চাকরিতে ঢুকেছেন, পরে নিজের ব্যবসা গড়েছেন। সেই মানুষটিই একদিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হয়ে পাড়ি জমালেন প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র ফিজিতে। তাঁর নাম এম. ওসমান সিদ্দিক। তাঁর এই পথচলা প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামনে সম্ভাবনার একটি নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষ যুক্ত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিতে। তাঁদের প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব পথচলার গল্প। সেই গল্পগুলো তুলে ধরার শুরুতেই থাকছেন এম. ওসমান সিদ্দিক।
ওসমান সিদ্দিকের জন্ম ঢাকায়। তাঁর বাবা ড. মুহাম্মদ ওসমান গনি ছিলেন একজন খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বাংলাদেশের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক তাঁর ভাই। শিক্ষা ও জনজীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একটি পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন ওসমান সিদ্দিক। তবে যুক্তরাষ্ট্রে নিজের অবস্থান গড়ে তুলতে তাঁকে নিজের পথেই হাঁটতে হয়েছে।
ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় তাঁর উচ্চশিক্ষার অধ্যায়। ১৯৭৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেলি স্কুল অব বিজনেস থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। এরপর বড় বীমা প্রতিষ্ঠান MetLife-এ চাকরি দিয়ে তাঁর পেশাজীবন শুরু হয়। কিন্তু উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ তাঁকে নিজের ব্যবসা গড়ার দিকে নিয়ে যায়।
১৯৭৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ITI/Travelogue, Inc.। বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাপ্তরিক সফরের ব্যবস্থা করত প্রতিষ্ঠানটি। বিমানযাত্রা, হোটেলে থাকা এবং সফরের নানা প্রয়োজন মেটানো ছিল এর কাজ। তাঁর নেতৃত্বে ব্যবসাটি ধীরে ধীরে বড় হয়। ওয়াশিংটন অঞ্চলের সংখ্যালঘু মালিকানাধীন উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্থান করে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের বড় ট্রাভেল ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোর একটিতেও পরিণত হয়।
১৯৮৫ সালের ১৭ অক্টোবর মার্কিন নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন ওসমান সিদ্দিক। যুক্তরাষ্ট্র তখন তাঁর বসতি, কর্মক্ষেত্র ও পরিবারের ভবিষ্যতের দেশ। ব্যবসার পাশাপাশি সেই দেশের রাজনীতি ও জনজীবনের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। ডেমোক্রেটিক পার্টির কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন। প্রভাবশালী সিনেটর টেড কেনেডির সান্নিধ্য তাঁর রাজনৈতিক পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৯৫ সালে হোয়াইট হাউসের পর্যটনবিষয়ক সম্মেলন এবং বাণিজ্যবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের আয়োজনে প্রেসিডেনশিয়াল প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে অংশ নেন তিনি। ব্যবসা, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তাঁর সামনে তখন খুলতে থাকে নতুন দায়িত্বের পথ।
১৯৯৯ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাঁকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনয়ন দেন। আগস্টে সিনেটের অনুমোদনের পর ১৭ আগস্ট তিনি শপথ নেন। দায়িত্ব পান ফিজিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে। পাশাপাশি টোঙ্গা, টুভালু ও নাউরুতেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বের ভার দেওয়া হয় তাঁকে। প্রথম মুসলিম আমেরিকান হিসেবে রাষ্ট্রদূত ও বিদেশে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনের প্রধান হওয়ার মাধ্যমে ইতিহাসে জায়গা করে নেন বাংলাদেশের এই সন্তান।
তাঁর শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানেও ছিল মনে রাখার মতো একটি ঘটনা। তিনি পবিত্র কোরআনে হাত রেখে শপথ নেন। স্ত্রী ক্যাথরিন মেরি সিদ্দিক অনুষ্ঠানের জন্য বাইবেলও নিয়ে এসেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব গ্রহণের সেই মুহূর্তে নিজের ধর্মীয় পরিচয়ও সঙ্গে রেখেছিলেন ওসমান সিদ্দিক। একজন অভিবাসীর জীবনে অর্জিত নতুন নাগরিক পরিচয় এবং তাঁর নিজস্ব বিশ্বাস একই অনুষ্ঠানে জায়গা পেয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করলেও জন্মভূমির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বজায় ছিল। ২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ঐতিহাসিক বাংলাদেশ ও ভারত সফরের প্রতিনিধিদলে যুক্ত হন তিনি। যে দেশ থেকে একদিন উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন, সেই দেশে ফিরে আসেন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পরিচয়ে। তাঁর দীর্ঘ পথচলায় এই ফিরে আসারও একটি আলাদা তাৎপর্য রয়েছে।
১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন ওসমান সিদ্দিক। এরপরও জনসেবামূলক কাজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বজায় থাকে। ২০১১ সালে হাওয়াইয়ের ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারের বোর্ড অব গভর্নরসে ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালের মার্চে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তাঁকে ন্যাশনাল সিকিউরিটি এডুকেশন বোর্ডের সদস্য করার ঘোষণা দেন। বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানোর শিক্ষামূলক কর্মসূচিকে দিকনির্দেশনা দেয় এই বোর্ড। আটলান্টিক কাউন্সিলের সাউথ এশিয়া সেন্টারের ননরেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো হিসেবেও তিনি যুক্ত আছেন।
নিজের জীবন নিয়ে লিখেছেন ‘Leaps of Faith: An Immigrant’s Odyssey of Struggle, Success, and Service to His Country’। বইটিতে অভিবাসন, ব্যবসা, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। স্ত্রী ক্যাথরিন ও চার সন্তানকে নিয়ে তাঁর পরিবার। ভার্জিনিয়ার ম্যাকলিনে তাঁর বসবাস। ওয়াশিংটন এলাকার বিভিন্ন সামাজিক ও দাতব্য কাজেও পরিবারের অংশগ্রহণ রয়েছে।
তরুণদের জন্য তাঁর অভিজ্ঞতার একটি কথা বিশেষভাবে মনে রাখার মতো। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আলোচনায় তিনি বলেছিলেন, প্রয়োজনের মুহূর্তে সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। মানুষের সঙ্গে পরিচয়, আস্থা ও সম্পর্ক আগে থেকেই গড়ে তুলতে হয়।
ওসমান সিদ্দিকের জীবন প্রবাসে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প। পড়াশোনা, কাজ, ব্যবসা ও জনসেবার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের জায়গা গড়ে তুলেছেন। উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাসে তাঁর জীবন একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
তথ্যসূত্র: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়
FAQ — পাঠকের সম্ভাব্য প্রশ্ন
১. এম. ওসমান সিদ্দিক কে?
এম. ওসমান সিদ্দিক বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া একজন মার্কিন ব্যবসায়ী, লেখক ও সাবেক কূটনীতিক। তিনি ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ফিজি, নাউরু, টোঙ্গা ও টুভালুতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মার্কিন সরকারি নথি অনুযায়ী, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত প্রথম মুসলিম ব্যক্তি।
তিনি ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেলি স্কুল অব বিজনেস থেকে ১৯৭৪ সালে ব্যবসা প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
এটি ওসমান সিদ্দিকের প্রতিষ্ঠিত কর্পোরেট ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা সংস্থা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের দাপ্তরিক সফরসংক্রান্ত ব্যবস্থা করত প্রতিষ্ঠানটি।
তাঁর বইয়ের নাম Leaps of Faith: An Immigrant’s Odyssey of Struggle, Success, and Service to His Country। বইটিতে অভিবাসন, ব্যবসা এবং জনসেবার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।
সম্পুর্ন খবরটি পড়ার জন্য এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ::যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিতে গৌরবের নাম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ওসমান সিদ্দিক first appeared on DesheBideshe.