অনলাইন ডেস্ক
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হওয়ার পর সময়মতো সরকারি হাসপাতালে জলাতঙ্কের টিকা না পেয়ে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। গত আট দিনে সেখানে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালগুলোতে টিকা না থাকায় বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে কিনে টিকা নিতে হয়েছে, তবুও শেষ রক্ষা হয়নি।
সর্বশেষ বুধবার দুপুরে মারা যান ধুবনী বাজার এলাকার সুলতানা বেগম। এর আগে সোমবার রাতে মৃত্যু হয় বজড়া কঞ্চিবাড়ী গ্রামের আফরুজা বেগমের। গত ২২ এপ্রিল কুকুরের কামড়ে আহত হওয়ার পর প্রথমে তাকে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে টিকা পাওয়া যায়নি। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও সরকারি টিকা না পেয়ে বাইরে থেকে কিনে টিকা দেওয়া হয়।
আফরুজা বেগমের ছেলে মোনারুল ইসলাম জানান, টিকা নেওয়ার পরও তার মায়ের মধ্যে জলাতঙ্কের গুরুতর উপসর্গ দেখা দেয়। পানি ও বাতাসের প্রতি ভয়, খিঁচুনি, জ্বর এবং আচরণগত পরিবর্তন দেখা দেয় তার মধ্যে। শেষ পর্যন্ত ১৮ দিন পর তিনি মারা যান।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২২ এপ্রিল সকালে একটি কুকুর প্রথমে বিষ্ণুময়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এক নারীকে কামড়ায়। পরে আরও ১৫ জনকে আক্রমণ করে। শেষ পর্যন্ত এলাকাবাসী কুকুরটিকে পিটিয়ে হত্যা করে।
মৃতদের মধ্যে রয়েছেন নন্দরানী, ফুল মিয়া ও রত্নেশ্বর নামের আরও তিনজন। বর্তমানে অন্তত নয়জন আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসাধীন আছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য তাজরুল ইসলাম জানান, কুকুরটি অনেককে মুখমণ্ডল ও শরীরের ওপরের অংশে কামড় দেয়, যা সংক্রমণকে আরও জটিল করে তোলে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. দিবাকর বসাক বলেন, দেড় বছর ধরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জলাতঙ্কের টিকা নেই। বহুবার চাহিদাপত্র পাঠানো হলেও সরবরাহ মেলেনি। ফলে রোগীদের বাইরে থেকে টিকা কিনতে বলা হচ্ছে।
গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. রফিকুজ্জামানও স্বীকার করেন, টিকার ঘাটতির কারণে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, সময়মতো টিকা দিলে জলাতঙ্ক প্রায় শতভাগ প্রতিরোধ করা যায়।
শুধু গাইবান্ধা নয়, দেশের আরও কয়েকটি জেলায় জলাতঙ্কের টিকার সংকট দেখা দিয়েছে। খুলনা, রাজশাহী, নওগাঁ, বরিশাল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন স্থানে রোগীদের বাইরে থেকে টিকা কিনতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি স্থগিত হওয়া এবং নতুন টিকা ক্রয়ে জটিলতার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে হাম ও জলাতঙ্কসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচিতে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক রোগ নিয়ন্ত্রণ পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে একসময় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। কিন্তু কার্যক্রমে স্থবিরতা আসায় সেই অর্জন এখন ঝুঁকিতে পড়েছে। তিনি জানান, দেশে প্রতিবছর কয়েক লাখ মানুষ কুকুর বা অন্য প্রাণীর কামড়ে আক্রান্ত হন।
অন্যদিকে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. এনামুল হক বলেন, নিয়ম অনুযায়ী পূর্ণ ডোজ নেওয়া হলে সাধারণত জলাতঙ্কে মৃত্যু হয় না। তাই মৃত্যুর ক্ষেত্রে টিকার মান ও ডোজ সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, ইউনিসেফের মাধ্যমে নতুন করে ৯ লাখ ডোজ জলাতঙ্কের টিকা সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছে সরকার।
