বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি মাখানোর ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল ‘যে কবি জনতার’ নামে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। বিকাল ৫টায় শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতির সামনে এ আয়োজন করা হয়।
উদীচীর সহসভাপতি শিবানী ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় সম্পাদক আজমীর তারেক চৌধুরীর সঞ্চালনায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এর পর বক্তব্য রাখেন উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সঙ্গীতা ইমাম। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একজন কবি নন; তিনি বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, শিল্পবোধ ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার সৃষ্টিকর্ম প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মানবিকতা, মুক্তবুদ্ধি ও সৌন্দর্যবোধে অনুপ্রাণিত করেছে। রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি মাখানোর ঘটনা শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি অসম্মানজনক এবং উদ্বেগজনক।
বক্তারা বলেন, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সৃষ্টিকর্ম বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তার প্রতিকৃতিকে অসম্মান করার মধ্য দিয়ে যে বিদ্বেষ ও সংকীর্ণতার প্রকাশ ঘটেছে, তার জবাব দিতে হবে যুক্তি, মনন, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে।
অনুষ্ঠানে উদীচীর সংগীত বিভাগের শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন। উদীচীর নাটক বিভাগের শিল্পীরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক ‘বিসর্জনে’র একটি অংশ মঞ্চস্থ করেন। কবিতা আবৃত্তি করেন শিখা সেনগুপ্তা, ইসরাত কাকলী, সৈয়দা রত্না ও মনীষা মজুমদার। এ ছাড়া নৃত্য পরিবেশন করেন সুজানা ও সুপা সাদিয়া।
‘যে কবি জনতার’ শীর্ষক এ সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্ম, মানবিক মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনাকে ধারণ করার আহ্বান জানায় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি অবমাননার প্রতিবাদে শিল্প-সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও কবিতাকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে তুলে ধরে সংগঠনটি।
নজরুলের চেতনায় সাম্য, স্বাধীনতা ও মানবতার বার্তা : জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী, সাম্যবাদী ও স্বাধীনতার চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘কাজী নজরুল ইসলাম : স্বাধীনতা ও মানবতার বিশ্বজনীন কণ্ঠস্বর’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির মাল্টিপারপাস হলে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, নজরুল শুধু বিদ্রোহের কবি নন, তিনি স্বাধীনতা, সাম্য, মানবমর্যাদা ও বিশ্বমানবতার অনন্য কণ্ঠস্বর। তার সাহিত্য ও সংগীত অন্যায়, বৈষম্য, নিপীড়ন ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। বর্তমান বিশ্বে সংঘাত ও অসহিষ্ণুতার প্রেক্ষাপটে নজরুলের দর্শন আরও প্রাসঙ্গিক। মন্ত্রী বলেন, নজরুলের জীবন, সাহিত্য ও দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে সরকার ২০২৬ সালকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে পালন করছে। এ উপলক্ষে বছরব্যাপী নানা সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বিশেষ অতিথি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, নজরুলের সাম্য ও মানবতাবাদী দর্শন বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, দেশ-বিদেশে নজরুলের জীবন ও সৃষ্টি তুলে ধরতে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
ফরেন সার্ভিস একাডেমির রেক্টর স্বাগত বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মোশাররফ হোসেন। আলোচনায় অংশ নেন কবি আব্দুল হাই শিকদার। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম।
বক্তারা বলেন, নজরুলের চর্চা কেবল সাহিত্যচর্চা নয়, বরং স্বাধীনতা, সাম্য, ন্যায়, মানবিক মর্যাদা ও সম্প্রীতির মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
