জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে কাজী কাইয়ুম শিশিরের বিরুদ্ধে জমি দখল, জাল দলিল তৈরি, ভুয়া নামজারি ও জমা খারিজ এবং হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের অভিযোগ তুলেছেন সাইদুর রহমানসহ কয়েকজন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দা। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, জমির প্রকৃত মালিকানা যাচাই এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন তাঁরা।
রোববার (১৮ অক্টোবর ২০২৬) দেওয়ানগঞ্জ প্রেসক্লাবে স্থানীয় ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাইদুর রহমানের পক্ষে আব্দুর রাজ্জাক লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বক্তব্যে বিভিন্ন জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি, মামলা ও আদালতের আদেশসংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তদন্তের দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, জমির প্রকৃত মালিকানা ও দলিলের বিবরণের সঙ্গে অসংগতি থাকা সত্ত্বেও কিছু জমির নামজারি ও জমা খারিজ করা হয়েছে। পাশাপাশি জমি দখল, মিথ্যা মামলা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভুক্তভোগীদের হয়রানি করার অভিযোগও তোলা হয়।
দলিলের জমির পরিমাণ নিয়ে অসংগতির অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ১২ জানুয়ারি ১৪৩ নম্বর দলিলের মাধ্যমে লিয়াকতের কাছ থেকে আব্দুস সামাদ জমি ক্রয় করেন। দলিলের বিবরণে ৮৪৯ নম্বর খতিয়ানের ২৪৩ নম্বর হাল দাগে ২০ শতাংশের মধ্যে ১০ শতাংশ এবং ২৪৭ নম্বর হাল দাগে ১৯ শতাংশের মধ্যে ৮ শতাংশ জমির উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, দলিল অনুযায়ী তাঁর ক্রয়কৃত জমির পরিমাণ ১৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ৩৮৫৪ নম্বর দলিলের মাধ্যমে আব্দুস সামাদের কাছ থেকে কাজী কাইয়ুম শিশির ৩৮ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, আব্দুস সামাদের ক্রয়কৃত জমির পরিমাণ ১৮ শতাংশ হলেও পরবর্তী সময়ে ৩৮ শতাংশ জমি নামজারি ও জমা খারিজ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দলিলের বৈধতা ও জমির পরিমাণের অসংগতি যাচাইয়ের দাবি জানান তাঁরা।
২৬৩০ নম্বর দলিল নিয়ে মালিকানা ও জমা খারিজের প্রশ্ন, সংবাদ সম্মেলনে ২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বরের ২৬৩০ নম্বর দলিল নিয়ে পৃথক অভিযোগ তোলা হয়। অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বি.আর.এস. ৬৯০ নম্বর খতিয়ানের রেকর্ডীয় মালিক দেওয়ান শাহ আনোয়ারুল হক। তাঁদের দাবি, দলিলে উল্লেখিত দাতা শামীম মিয়া ওই মালিকের ওয়ারিশ নন।
বক্তব্যে আরও বলা হয়, ২০১২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ২৮৩৮ নম্বর হেবা ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ২৫১ শতাংশ জমি পাওয়ার পর ২০১২-২০১৩ সালে ২৬৮ শতাংশ জমা খারিজ করা হয় বলে তাঁদের অভিযোগ। এতে ১৭ শতাংশ অতিরিক্ত জমা খারিজের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানানো হয়। পরে নাজমা জেসমিন ২০১৫-২০১৬ সালে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে জমি বিক্রি করেন বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে ওই জমিতে কয়েকটি পরিবারের বসতবাড়ি রয়েছে বলেও দাবি করেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের আরও অভিযোগ, ২৬৩০ নম্বর দলিলের মাধ্যমে ১৮ শতাংশ জমি কেনার পর ২০২২ সালে জমি দখলের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ ও থানায় আলোচনা করেও স্থায়ী সমাধান না পাওয়ায় তাঁরা আদালতের শরণাপন্ন হন। এ প্রসঙ্গে ২৮/২০২২ নম্বর মামলার উল্লেখ করা হয়।
১৭/২০২৬ নম্বর মামলা নিয়ে হয়রানির অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলনে ১৭/২০২৬ নম্বর মামলা নিয়েও বক্তব্য দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলায় কাজী কাইয়ুম শিশিরের পক্ষে মো. আলতাফুর রহমান বাদী এবং আব্দুর রাজ্জাক, মো. আসাদ ও মো. সাইদুর রহমান বিবাদী হিসেবে রয়েছেন।
বক্তব্যে বলা হয়, মামলায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সাত শতাংশ জমি দখলের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব ভূমি সহকারী কর্মকর্তাকে দেওয়া হলে তিনি সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরে ওই প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি ওঠায় পুনরায় তদন্তের জন্য দেওয়ানগঞ্জ ভূমি অফিসে পাঠানো হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
অন্যদিকে, সাইদুর রহমানের দাবি, তিনি ৪০৭১ নম্বর দলিলের মাধ্যমে আব্দুল কাদের গংয়ের কাছ থেকে সাবেক ৫০১ নম্বর দাগে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ জমি কিনেছেন। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসতবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন এবং জমিটি সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা রয়েছে। এ জমি নিয়ে তাঁকে হয়রানিমূলক মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আদালতের আদেশ ও অন্যান্য জমিসংক্রান্ত বিরোধ, সংবাদ সম্মেলনে জি.আর. মামলা নম্বর ৪৫/২২-এর একটি আদেশের বিবরণও তুলে ধরা হয়। উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী, ২১ নভেম্বর ২০২৩ তারিখের আদেশে উল্লেখিত তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগকারীরা জানান, একাধিকবার নোটিশ জারি করা হলেও বাদীপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট মামলাটি খারিজ হয়। এ বিষয়ে জামালপুরের জুডিশিয়াল আদালতের ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখের আদেশের কথাও উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া ২৬/২৩ নম্বর মোকদ্দমা নিয়ে বক্তব্যে বলা হয়, বি.আর.এস. ১২৩৭ নম্বর খতিয়ানের ৯৯৭ নম্বর দাগে তিন শতাংশ জমি সাইদুর রহমানের পিতার নামে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে এবং ওই জমি কবরস্থান হিসেবে চূড়ান্ত রেকর্ডে লিপিবদ্ধ। এ মামলায় বিবাদী হিসেবে কাজী কাইয়ুম শিশির, আলতাফুর রহমান ও আব্দুল হাইয়ের নাম উল্লেখ করা হয়। তবে এসব নথির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও বর্তমান আইনগত অবস্থান যাচাই করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে জমির অংশ, রেকর্ড সংশোধন ও মালিকানা নিয়েও বিরোধের কথা তুলে ধরা হয়। অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি জমির পশ্চিমাংশে মো. আসাদ ২৭ শতাংশ এবং পূর্বাংশে কাজী কাইয়ুম শিশির ৩১ শতাংশ জমি কিনেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এ জমির রেকর্ড সংশোধন নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।
এ ছাড়া বি.আর.এস. রেকর্ডীয় মালিক মোকসেদ আলীর ওয়ারিশ মো. পিলিন মিয়া গংয়ের বিরুদ্ধে উভয় পক্ষ রেকর্ড সংশোধনের মামলা করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। জমির প্রকৃত পরিমাণ, দাগ-খতিয়ানের সঙ্গে দলিলের সামঞ্জস্য এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশদের অধিকার যাচাই করে বিরোধ নিষ্পত্তির দাবি জানান তাঁরা।
৩১২/২০২২ ও ৭৯/২০২৪ নম্বর মামলা নিয়েও অভিযোগ সংবাদ সম্মেলনে ২০২২ সালের ৮ মে দায়ের করা ৩১২/২০২২ নম্বর মামলা এবং ৭৯/২০২৪ নম্বর মামলার বিষয়ও তুলে ধরা হয়। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩১২/২০২২ নম্বর মামলায় কাজী কাইয়ুম শিশির বাদী এবং রেখা বেগম গং বিবাদী।
উপস্থাপিত বক্তব্যে ১৩৭৯ নম্বর দলিলের মাধ্যমে সাবেক ৪৮৭ নম্বর দাগের জমি নিয়ে বিরোধের কথা বলা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, মো. ছামাদ ১৯৯৫ সালের ১১ জুন ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। পরবর্তী সময়ে জমির মালিকানা ও বিভিন্ন দলিলের ভিত্তিতে কাজী কাইয়ুম শিশির ওই জমির ওপর দাবি করেন। সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ৩১ মে ২০২২ তারিখে ৩১২/২০২২ নম্বর মামলায় একতরফা ডিক্রি দেওয়া হয়। মামলার আরজিতে নিপা অটো রাইস মিলের উল্লেখ রয়েছে বলেও জানানো হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, ১৩৭৯ নম্বর দলিলে ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ জমির উল্লেখ থাকলেও সংশ্লিষ্ট অন্য দাগে ২৪ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি দাবি করা হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট জমির কিছু অংশে ফলের গাছ, কবরস্থান ও বাঁশবাগান রয়েছে। এ বিষয়ে ৭৯/২০২৪ নম্বর মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি, সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাঁরা জমিসংক্রান্ত বিরোধের যথাযথ প্রতিকার পেতে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ ও থানায় আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে তাঁদের দাবি। পরে তাঁরা আদালতের শরণাপন্ন হন।
এ ছাড়া কাজী কাইয়ুম শিশিরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম এবং তাঁর পেশাগত দায়িত্ব পালনসংক্রান্ত বিতর্কের বিষয়ে কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, জমিসংক্রান্ত বিরোধে রাশেদা ও খাইরুজ্জামানসহ আরও কয়েকটি পরিবার অভিযোগ করেছে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষপর্বে সাইদুর রহমানসহ ভুক্তভোগীরা জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি, জমা খারিজ এবং আদালতের আদেশ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। একই সঙ্গে প্রকৃত জমির মালিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে দেওয়ানগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কাজী কাইয়ুম শিশিরের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য এ প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
The post দেওয়ানগঞ্জে কাজী কাইয়ুম শিশিরের বিরুদ্ধে জমি দখল ও জাল দলিলের অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি appeared first on ভোরের চেতনা.
