আধুনিক বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেকুলারিজম একটি বহুল আলোচিত রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ধারণা। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার প্রশ্নে এ ধারণার গুরুত্ব অপরিসীম।
মাহবুবুল হক
আধুনিক বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেকুলারিজম একটি বহুল আলোচিত রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ধারণা। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার প্রশ্নে এ ধারণার গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ পৃথিবীর বহু মুসলিম- সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশকে সাধারণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের তালিকায় রাখা হয় না। কেন এ পার্থক্য? এর কারণ কি ইসলাম ধর্মের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে নিহিত, নাকি ইতিহাস, রাজনীতি, ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্র গঠনের বিশেষ পরিস্থিতি এর জন্য দায়ী? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই একটি প্রচলিত ধারণা সংশোধন করা প্রয়োজন। সব মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ধর্মনিরপেক্ষতাবিরোধী নয়। আবার যেসব দেশে খ্রিস্টান, হিন্দু কিংবা অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেসব দেশের সবকটিও প্রকৃত অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ নয়। রাষ্ট্রের ধর্মীয় পরিচয়, সংবিধান, আইন প্রণয়নের ভিত্তি এবং নাগরিক অধিকারের বাস্তব চর্চা— এসব বিবেচনা করেই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃতি নির্ধারণ করতে হয়।
ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে সাধারণভাবে বোঝায়, রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব না করে সব নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করবে। একজন নাগরিক মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, ইহুদি কিংবা কোনো ধর্মে বিশ্বাসী না হলেও রাষ্ট্রের কাছে তাঁর মর্যাদা সমান থাকবে। তাঁর নাগরিক অধিকার নির্ধারিত হবে নাগরিকত্বের ভিত্তিতে, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। তবে ধর্মনিরপেক্ষতারও একাধিক মডেল রয়েছে। কোথাও রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন রয়েছে; কোথাও রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েও অন্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকার রক্ষা করে। সুতরাং রাষ্ট্রের সরকারি ধর্ম থাকা আর রাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা না থাকা এক বিষয় নয়। একইভাবে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার ঘোষণা থাকলেই যে বাস্তবে সকল নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবেন, তারও নিশ্চয়তা নেই। অতএব, ধর্মনিরপেক্ষতা বিচার করতে হলে শুধু সংবিধানের একটি শব্দের দিকে তাকালে চলবে না; রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, আইন ও বাস্তব আচরণও বিবেচনা করতে হবে।
প্রথম কারণ: সংবিধানে ধর্মের বিশেষ অবস্থান : মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বহু দেশে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃত। কোনো কোনো দেশের সংবিধানে ইসলামী শরিয়াহকে আইন প্রণয়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস বা প্রধান উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রের আইন, বিচারব্যবস্থা, পারিবারিক বিধান কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কিছু কার্যক্রমে ধর্মীয় নীতির বিশেষ প্রভাব দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের (USCIRF) একটি তুলনামূলক তথ্যে ৪৬টি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মধ্যে ২৩টি দেশে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে উল্লেখ করার কথা বলা হয়েছে। এই হিসাবটি সংশ্লিষ্ট প্রকাশনার সময়কার তথ্যের ভিত্তিতে; একে বর্তমান বিশ্বের সব দেশের অপরিবর্তনীয় চিত্র হিসেবে দেখা উচিত নয়। রাষ্ট্রধর্মের সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকলে ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পৃথকীকরণের ধারণার সঙ্গে একটি মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়। এ কারণেই এসব দেশকে অনেক সময় ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পরিবর্তে ধর্মীয় পরিচয়সম্পন্ন রাষ্ট্র হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার: রাষ্ট্রধর্ম থাকা মানেই একটি দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বৈরতান্ত্রিক বা অসহিষ্ণু হয়ে যায় না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের ধর্মীয় পরিচয় অন্য ধর্মাবলম্বী ও ধর্মহীন নাগরিকদের সমান অধিকারকে কতটা প্রভাবিত করছে।
দ্বিতীয় কারণ: ইসলাম ও রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক সম্পর্ক : ইসলামের ইতিহাসে ধর্মীয় জীবন ও রাজনৈতিক শাসনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। সপ্তম শতকে মদিনায় প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সমাজে ধর্মীয় নৈতিকতা, সামাজিক বিধান, বিচার এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। পরবর্তী মুসলিম সাম্রাজ্যগুলোতেও শাসনব্যবস্থা, বিচার ও সামাজিক জীবনে ইসলামী চিন্তাধারার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তবে ঐতিহাসিকভাবে সব মুসলিম শাসনব্যবস্থা এক রকম ছিল না। বিভিন্ন যুগে মুসলিম শাসকেরা স্থানীয় রীতি, প্রশাসনিক প্রয়োজন, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা অনুসরণ করেছেন। ধর্মীয় আইন ও রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের মধ্যেও বহু ক্ষেত্রে পার্থক্য ছিল।
আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের ধারণা বিকশিত হওয়ার পর এই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। রাষ্ট্র কি ধর্মীয় বিধান অনুসারে পরিচালিত হবে, নাকি সব নাগরিকের সম্মতিতে প্রণীত সাধারণ আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে? ধর্মীয় মূল্যবোধ কি আইন প্রণয়নে প্রভাব ফেলবে, নাকি রাষ্ট্র ধর্মীয় বিষয় থেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে?
মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর এক রকম হয় নি। কোথাও ধর্মীয় পরিচয় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে; কোথাও রাষ্ট্র ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
তৃতীয় কারণ: ঔপনিবেশিক শাসন ও আধুনিক রাষ্ট্রের উত্থান : মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ বহু দেশ দীর্ঘদিন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। এ সময়ে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা ও অর্থনীতির কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। কোথাও ইউরোপীয় আইন ও প্রশাসনিক মডেল গ্রহণ করা হয়, আবার কোথাও ধর্মীয় আইন ও প্রচলিত ব্যবস্থার কিছু অংশ বজায় থাকে। স্বাধীনতার পর এসব দেশকে নতুন করে রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ধারণ করতে হয়। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার থেকে মুক্তি এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক রাজনৈতিক আন্দোলনে ইসলাম কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় ছিল না; এটি সামাজিক সংহতি, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল। ফলে কোনো কোনো দেশে রাষ্ট্রের ইসলামী পরিচয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। অন্যদিকে কিছু দেশে আধুনিক জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, প্রজাতন্ত্রবাদ কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, মুসলিম দেশগুলোর ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে সম্পর্ক বুঝতে হলে কেবল ধর্মতত্ত্ব নয়, ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতিকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
চতুর্থ কারণ: রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার : ধর্ম মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত জীবনের গভীর অংশ। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক তৈরি হলে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
কোনো কোনো দেশে রাজনৈতিক দল বা শাসকগোষ্ঠী নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়। ধর্মীয় প্রতীক, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের মাধ্যমে জনসমর্থন অর্জনের চেষ্টা করা হয়। কখনো ধর্মীয় অনুভূতি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে, আবার কখনো তা রাজনৈতিক বিরোধ, সামাজিক বিভাজন কিংবা সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে বিতর্কের কারণ হয়।
তবে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার শুধু মুসলিম দেশগুলোর বৈশিষ্ট্য নয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মীয় পরিচয়ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাই ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ককে কেবল ইসলামকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করলে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না।
একটি রাষ্ট্র কতটা ধর্মনিরপেক্ষ, তা নির্ভর করে রাজনৈতিক ক্ষমতা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বণ্টিত হচ্ছে কি না, আইন প্রণয়নে সব নাগরিকের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত হচ্ছে কি না এবং রাষ্ট্র কোনো ধর্মীয় মতকে নাগরিকদের ওপর অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দিচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের ওপর।
পঞ্চম কারণ: শরিয়াহ, আইন ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন : মুসলিম দেশগুলোর ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনায় শরিয়াহর বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শরিয়াহ বলতে ইসলামী নৈতিক ও ধর্মীয় নির্দেশনার একটি বিস্তৃত ধারণাকে বোঝায়। অন্যদিকে ফিকহ হলো ধর্মীয় সূত্রের ব্যাখ্যা ও মানবীয় বিচার-বিবেচনার মাধ্যমে বিকশিত ইসলামী আইনশাস্ত্র। এ দুই ধারণাকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
বিভিন্ন মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে শরিয়াহর প্রয়োগের ক্ষেত্র ও মাত্রা ভিন্ন। কোথাও পারিবারিক আইন ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত বিষয়ে ধর্মীয় বিধানের প্রভাব রয়েছে; কোথাও আইনব্যবস্থার বৃহত্তর ক্ষেত্রেও ধর্মীয় নীতির ভূমিকা রয়েছে। আবার কিছু দেশে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের প্রধান ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষ আইন। এখানে বিতর্কের মূল বিষয় শুধু ধর্মীয় আইন আছে কি না, তা নয়। বরং সেই আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে নাগরিকদের সমান মর্যাদা, নারীর অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা কতটা রয়েছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসরণ করার স্বাধীনতা যেমন মৌলিক অধিকার, তেমনি কোনো ব্যক্তির ওপর অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাস জোর করে চাপিয়ে না দেয়ার নীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ দু’য়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
ষষ্ঠ কারণ: মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বৈচিত্র্য : সব মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশকে একই রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে ফেলা বাস্তবসম্মত নয়। তুরস্কে বিংশ শতকের প্রথমার্ধে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যাপক সংস্কার করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে দেশটি রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ককে পৃথকভাবে সংগঠিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তবে সময়ের সঙ্গে সেখানে ধর্মের জনপরিসরে ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও চলেছে।
ইন্দোনেশিয়ায় মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও দেশটির রাষ্ট্রদর্শন ও সাংবিধানিক কাঠামো তুরস্ক বা সৌদি আরবের থেকে আলাদা। সেখানে রাষ্ট্রের ভিত্তিতে একদিকে ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বীকৃতি, অন্যদিকে জাতীয় ঐক্য ও বহুত্ববাদ—দু’য়েরই গুরুত্ব রয়েছে।
কাজাখস্তান ও আজারবাইজানের মতো মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার সাংবিধানিক ঐতিহ্য রয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও ইরানে রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের কাঠামোয় পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধানে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃত; একই সঙ্গে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা একটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার বিধানও রয়েছে। এ সহাবস্থান দেখায় যে রাষ্ট্রের ধর্মীয় পরিচয় ও ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক নীতি একই ব্যবস্থায় উপস্থিত থাকতে পারে, যদিও তাদের মধ্যে বাস্তব ও ব্যাখ্যাগত টানাপোড়েন থাকতে পারে।
Pew Research Center-এর ২০২৫ সালের প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তিউনিসিয়া ও তুরস্কের অধিকাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, একটি দেশ একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও মুসলিম-পরিচয়সম্পন্ন হতে পারে। এ তথ্য প্রমাণ করে যে মুসলিম সমাজের মধ্যেও ধর্ম, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।
সপ্তম কারণ: ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে ভুল ধারণা : অনেকের ধারণা, ধর্মনিরপেক্ষতা মানেই ধর্মবিরোধিতা। বাস্তবে এ ধারণা সঠিক নয়। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ধর্মীয় বিশ্বাসকে অস্বীকার করতেই হবে, এমন কোনো শর্ত নেই। বরং এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাসকে সবার ওপর চাপিয়ে দেয়া থেকে বিরত থাকা এবং সব নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা।
একইভাবে ধর্মীয় রাষ্ট্র মানেই সেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে না—এমন সিদ্ধান্তও সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। একটি রাষ্ট্রে সরকারি ধর্ম থাকলেও তার আইন ও প্রতিষ্ঠান অন্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকার সুরক্ষিত করতে পারে। আবার আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ কোনো রাষ্ট্রও বাস্তবে ধর্মীয় বা আদর্শগত সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য করতে পারে। সুতরাং রাষ্ট্রের নাম, সরকারি ধর্ম কিংবা সংবিধানের ঘোষণার পাশাপাশি বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। মোদ্দা কথা হলো, রাষ্ট্রের পরিচয়ের চেয়ে নাগরিকের মর্যাদা গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলিম দেশগুলোকে সাধারণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য না করার পেছনে প্রধান কারণ হলো, বহু দেশের সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং আইন প্রণয়ন বা রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসলামী বিধানকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইতিহাস, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, জাতীয় পরিচয় নির্মাণ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার বাস্তবতা।
কিন্তু এ ব্যাখ্যা থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয় যে, ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতা সর্বাবস্থায় পরস্পরবিরোধী, কিংবা সব মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ একই ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা অনুসরণ করে। মুসলিম বিশ্বের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বহুমাত্রিক; সেখানে ধর্মীয় রাষ্ট্র, ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র এবং মধ্যবর্তী বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা বিদ্যমান।
শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু তার ধর্মীয় পরিচয় কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার ঘোষণার ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা, নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত করার ওপর।
ধর্ম মানুষের নৈতিক শক্তির উৎস হতে পারে, আর ধর্মনিরপেক্ষতা হতে পারে বহুত্ববাদী সমাজে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা রক্ষার সাংবিধানিক নীতি। এ দু’য়ের সম্পর্ক নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু একটি আধুনিক রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত— তার নাগরিকেরা কতটা স্বাধীন, কতটা নিরাপদ এবং আইনের চোখে কতটা সমান।
রাষ্ট্রের প্রকৃত মূল্যায়ন তাই শুধু এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না যে দেশটি ধর্মীয়, না ধর্মনিরপেক্ষ; বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, রাষ্ট্রটি তার প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার কতটা নিশ্চিত করতে পারছে।
লেখক : সিনিয়র কলামিস্ট।
