
রাজধানীর সড়কের ডিভাইডারে শাক-সবজি চাষ করে নিজেদের চাহিদা মেটাচ্ছেন কয়েকজন
রাজধানীর ব্যস্ত সড়কের পাশে পড়ে থাকা অব্যবহৃত একটি জায়গায় একসময় জমত ময়লা-আবর্জনা। সেই জায়গাতেই শোভা পাচ্ছে নানা জাতের শাক-সবজি, ফল ও ঔষধি গাছের বাগানও। সাধারণ ঢাকার সড়কগুলোর পাশে চোখে পড়ে যানজট, ধুলাবালি আর মানুষের ব্যস্ত ছুটে চলা, তবে তেজগাঁওয়ের পেপসি গলিতে গেলে চোখে পড়বে ভিন্ন এক দৃশ্য, সড়কের ডিভাইডারের মধ্যে শোভা পাচ্ছে নানা জাতের শাক-সবজি, ফল ও ঔষধি গাছ।
সড়কের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য মাঝখানে থাকা অব্যবহিত ডিভাইডারজুড়ে ফলেছে, লালশাক, পুঁইশাক, কলমিশাক, কচুশাক, মরিচ, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, শসা, ঢ্যাঁড়স, শিম, করলা, বেগুন ও ফুলকপি। পাশাপাশি বেড়ে উঠছে আখ, পেঁপে এবং তুলসী, অ্যালোভেরা, পাথরকুচি, কেশরাজ, হলুদ ও নিমসহ নানা ধরনের ঔষধি গাছ। একসময় যেখানে জমত আবর্জনা, সেখানে এখন প্রকৃতির স্নিগ্ধ সবুজে তৈরি হয়েছে এক ব্যতিক্রমী পরিবেশ। ব্যস্ত নগরজীবনের ফাঁকে একটু একটু করে সবুজের এই পরিসর গড়ে তুলেছেন কয়েকজন মানুষ। তাঁদের পরিচর্যায় ডিভাইডারের ছোট্ট জায়গায় উৎপাদিত হচ্ছে নানা ধরনের শাক-সবজি, যা দিয়ে নিজেদের পরিবারের চাহিদার কিছুটা পূরণ হচ্ছে। এতে সাশ্রয় হচ্ছে নিত্যদিনের বাজার খরচও।
তেজগাঁওয়ের পেপসি গলিতে সড়ক বিভাজকের এই বাগান গড়ে তোলার পেছনে রয়েছেন চা বিক্রেতা তাসলিমা বেগম, রিকশাচালক কামাল হোসেন ও নিরাপত্তা তত্ত্বাবধায়ক প্রশান্ত কুমার রায়'সহ আরো বেশ কয়েকজন। পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁরা সময় বের করেন গাছের যত্ন নিতে। দায়িত্ব পালনের ফাঁকে সড়ক বিভাজকের গাছগুলোর পরিচর্যা করেন প্রশান্ত কুমার রায়। অন্যদিকে, চায়ের দোকান সামলে সংসার চালান তাসলিমা বেগম। সীমিত আয়ে সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি অব্যবহৃত জায়গাটিকে সবুজ করে তোলার তাগিদ থেকেই তিনি ও তাঁর সহযোগীরা উদ্যোগী হন।
প্রথমদিকে জায়গাটি পরিষ্কার করে মাটি প্রস্তুত করেন তাঁরা। এরপর সার দিয়ে বিভিন্ন জাতের শাক-সবজি ও ঔষধি গাছ লাগানো হয়। নিয়মিত পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার ও পরিচর্যার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে গাছগুলো। তাঁদের কেউ নতুন চারা লাগান, কেউ মাটি পরিষ্কার করেন, আবার কেউ পানি দিয়ে গাছগুলো সতেজ রাখেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একসময়কার আবর্জনাপূর্ণ জায়গাটি এখন সবুজে ছেয়ে গেছে। কীভাবে এমন উদ্যোগের ভাবনা এল, জানতে চাইলে দীর্ঘদিন ধরে পেপসি গলিতে চায়ের দোকান পরিচালনা করে আসা চা বিক্রেতা তাসলিমা বেগম বলেন, “আমরা তো কোনো রকমে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকি। রাস্তার ফাঁকা জায়গায় ময়লা-আবর্জনা জমে থাকতে দেখে ভাবলাম, জায়গাটা কাজে লাগানো যায় কি না। সেই চিন্তা থেকেই গাছ লাগানো শুরু করি। গাছ লাগাইতে ভালো লাগে। নিজেরাও কিছু সবজি পাই, আশপাশের মানুষও দেখে ভালো লাগে।”
বাগান ঘিরে এমন অভিজ্ঞতার কথাও জানালেন তাসলিমা বেগম। তিনি বলেন, "কিছুদিন আগে এক ব্যক্তি মোটরসাইকেল রেখে বাগানের সবজি চুরি করতে গিয়ে তাঁর হাতে ধরা পড়েন। পরে ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, এমন দৃশ্য সাধারণত গ্রামেই দেখা যায়। সবজি দেখে লোভ সামলাতে না পেরে তিনি তা নিতে গিয়েছিলেন। আশপাশে খুঁজেও কাউকে না পেয়ে নিজেই সবজি নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে জানান ওই ব্যক্তি।"
শুরুটা হয়েছিল শখ থেকে। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে লাগানো হয় লালশাক। ফলন ভালো হওয়ায় উৎসাহ বাড়ে। পরে একে একে বাগানে যুক্ত হয় পুঁইশাক, লাউশাক, করলা, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি। পাশাপাশি রয়েছে ড্রাগন ফল ও কাঁঠালের মতো ফলের গাছ। অল্প জায়গায় নিজেদের শ্রম কাজে লাগিয়ে তাঁরা গড়ে তুলেছেন এই বাগান।
রিকশাচালক কামাল হোসেনও অবসর পেলেই সময় দেন গাছের পরিচর্যায়। সারাদিন রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় তাঁকে। ক্লান্তির পরও গাছের প্রতি ভালোবাসা থেকে নিয়মিত বাগানে আসেন। তাঁর কাছে এই উদ্যোগের আনন্দ যেমন রয়েছে, তেমনি আছে নিজেদের প্রয়োজনের কিছু সবজি পাওয়ার স্বস্তি।
কামাল হোসেন বলেন, ‘ডিভাইডারের জায়গাটা খালি ছিল। আমরা কয়েকজন মিলে গাছ লাগানো শুরু করি। এখানে ড্রাগন, কাঁঠাল, করলা, লাউশাক, পুঁইশাকসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ আছে। নিজেদের খাওয়ার জন্যই মূলত লাগানো। এতে জায়গাটাও সুন্দর হয়েছে।’
সবজির পাশাপাশি সড়ক বিভাজকের একটি অংশে লাগানো হয়েছে বিভিন্ন ঔষধি গাছ। তুলসী, অ্যালোভেরা, পাথরকুচি, কেশরাজ, হলুদ ও নিমসহ নানা ধরনের গাছ রয়েছে সেখানে। এসব গাছের পরিচর্যা করেন প্রশান্ত কুমার রায়। তেজগাঁওয়ের পেপসি গলিতে বার্জার পেইন্টের কার্যালয়ে নিরাপত্তা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন তিনি। দায়িত্ব পালনের ফাঁকে অবসর সময়ে বাগানের দেখভাল করেন। তার উদ্যোগে বাগানটিতে যুক্ত হয়েছে গাছের বৈচিত্র্য। তাঁর কাছে গাছ লাগানো শুধু নিজেদের চাহিদা পূরণের বিষয় নয়, নগরীর পরিবেশে সবুজের পরিসর বাড়ানোরও একটি চেষ্টা। শহরের ব্যস্ততার মধ্যে অব্যবহৃত জায়গা পরিচ্ছন্ন রেখে সেখানে গাছ লাগানো গেলে পরিবেশ ও মানুষ এ দুইয়েরই উপকার হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
সড়ক বিভাজকের এই বাগান এখন পথচারীদেরও নজর কাড়ছে। ব্যস্ত সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় অনেকে গাছগুলো দেখে থামেন, কেউ প্রশংসা করেন উদ্যোগটির। যানবাহনের ভিড় আর ধুলাবালির পরিচিত দৃশ্যের মধ্যে সবুজে ঘেরা জায়গাটি তাঁদের চোখে পড়ে আলাদাভাবে। তবে বাগানটি গড়ে তোলার উদ্দেশ্য বাণিজ্যিকভাবে সবজি উৎপাদন নয়। নিজেদের খাবারের চাহিদা মেটানো, অব্যবহৃত জায়গা পরিষ্কার রাখা এবং চারপাশে সবুজের পরিবেশ তৈরি করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। নিজেদের উৎপাদিত সবজি তাঁরা নিজেরা খান, প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচিতদেরও দেন।
সচেতন মহলদের মতে, উপযুক্ত অব্যবহৃত জায়গাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে সবজি ও ফলের গাছ লাগানো গেলে পরিবারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ব্যয় কমানো সম্ভব। তবে সড়ক বিভাজকে এ ধরনের চাষাবাদের ক্ষেত্রে পথচারী ও যানবাহন চলাচলের নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। তেজগাঁওয়ের পেপসি গলির এই উদ্যোগের পরিসর ছোট, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে সম্মিলিত শ্রমের গল্প। জীবিকার ব্যস্ততার মধ্যেও কয়েকজন মানুষ দেখিয়েছেন, সামান্য জায়গা ও নিয়মিত পরিচর্যা কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা যায় সবুজের পরিসর। তাঁদের হাতে সড়ক বিভাজকের ফাঁকা জায়গাটি এখন শুধু সবজি উৎপাদনের স্থান নয়, হয়ে উঠেছে ব্যস্ত নগরীতে সবুজের প্রয়োজনীয়তারও এক ছোট্ট উদাহরণ।
