সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান। তার অভিযোগ, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ দূতাবাস ও পরিবারকে না জানানো, মামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করা এবং বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ ঘটনায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা ও প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিজ্ঞাপন
পোস্টে তিনি লেখেন, ‘বাংলাদেশি বলেই কী সৌদি আরব দুজন নাগরিককে এভাবে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারলো? কারণ সৌদি আরব জানে বাংলাদেশ দুর্বল। এই যে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগ তুলে ২৫ বছর বয়সী যে যুবককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো সেই নজরুলকে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও পরিচিতজনেরা চেনেন বিনয়ী ও ভদ্র একজন মানুষ হিসেবে। তাদের দাবি, সৌদি আরবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সঙ্গে নজরুলের পরিচিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মিল নেই।’
তিনি লেখেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে স্থানীয় সাংবাদিকরা আজকে এ নিয়ে বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করেছে। আমি নিজেও আজ সারাদিন খোঁজ খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছি। তাঁর নিয়োগ, সরকারি ছাড়পত্রসহ নানা বিষয় দেখেছি। তাঁর পরিবারের কথা বোঝার চেষ্টা করেছি।’
বিজ্ঞাপন
‘নজরুলের দুই চাচাতো ভাই মোস্তাকিম ভূঁইয়া ও ইমাম হাসান ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেছেন, সৌদি আরবে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করার সময় একজনের সঙ্গে নজরুলের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি তিনি ফোনে তাঁর বাবা-মাকেও জানিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তি পাকিস্তানের নাগরিক বলে নজরুল তাঁদের জানিয়েছিলেন। তাঁর স্বজনদের ধারণা, ওই ব্যক্তির ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েই নজরুলের এমন পরিণতি হয়েছে। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসেনি।’
তিনি লেখেন, ‘নজরুল ২০২০ সালে স্থানীয় একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেন। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার একটি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ঋণদেনা করে তাঁকে সৌদি আরবে পাঠানো হয় ২০২২ সালের শেষ দিকে।’
‘নজরুলের পাসপোর্ট তৈরি হয় ২০২২ সালের ২১ আগস্ট। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য সরকারি ছাড়পত্র বা স্মার্ট কার্ড পান ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর। মুসা ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তিনি সৌদি আরবে যান। সেখানে মজল আল আরবি নামের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৮০০ সৌদি রিয়াল।’
বিজ্ঞাপন
শরিফুল হাসান আরও লেখেন, ‘ঘটনা সম্পর্কে জানা গেছে, এক পাকিস্তানির ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট নজরুল ইসলাম এবং পর দিন ২ আগস্ট সুইটি আক্তারকে আটক করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যায়। গত ১৪ অক্টোবর হঠাৎ করেই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর আসে। দূতাবাস বা পরিবারকে এ বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি।’
‘নজরুলের বন্ধু রাহাত ভূঁইয়া বলেন, সৌদি আরবে তাঁর বন্ধুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নজরুলের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর বিশ্বাসই হচ্ছে না যে নজরুল এ ধরনের কোনো কাজ করতে পারেন। নজরুল যে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠানের সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা নাঈমুর রহমানও তাঁকে ভালো আচরণের ছেলে হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, নজরুলের আচার-আচরণ ও চলাফেরায় কখনো খারাপ কিছু দেখেননি। তাঁর সম্পর্কে এখন যা বলা হচ্ছে, দেশে থাকতে তেমন কোনো আচরণ তাঁর চোখে পড়েনি।’
বিজ্ঞাপন
তিনি লেখেন, ‘সবচেয়ে হৃদয়বিদারক কথাটি বলেছেন নজরুলের মা রহিমা বেগম। তিনি বলেন, “ছেলেই এক মাস পরপর ফোন করত। এক থেকে দুই মিনিট কথা বলত। আমার ছেলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হইছে, তা মিথ্যা। আমি শেষবারের মতো ছেলের লাশ দেখতে চাই।’
‘জানি না একজন মায়ের এই আকুতি আমরা শুনতে পাচ্ছি কী না। একবার ভাবুন, যে ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছে, সেই ছেলেকে ঘিরেই এখন একটি পরিবারের সব স্বপ্ন, অপেক্ষা ও আশার সমাপ্তি ঘটেছে। পরিবারটি আর কখনো ছেলের সঙ্গে কথা বলতে পারবে না। মা আর ছেলের কণ্ঠ শুনতে পাবেন না। তাঁর লাশটুকু শেষবারের মতো দেখতে চাওয়াটাই এখন মায়ের আকুতি।’
তিনি আরও লেখেন, ‘ঘটনার পর এখন বাংলাদেশ দূতাবাস ওই মামলা ও রায়ের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে দূতাবাসকে না জানানোর বিষয়টি কি কেবল তথ্য চাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? যে ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো ওই ঘটনায় কী আদৌ মৃত্যুদণ্ড হয়? আর মিডিয়ায় যে বলছে অনৈতিক কাজ সেটা কে দেখেছে? কীভাবে নিশ্চিত হওয়া গেল যে অনৈতিক কাজ?’
বিজ্ঞাপন
‘আবার তাঁর অপরাধ বা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে পরিবার বা দূতাবাসকে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়নি সৌদি। অথচ কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন, ১৯৬৩-এর ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আটক বিদেশি নাগরিককে বিলম্ব না করে তাঁর কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার সম্পর্কে জানাতে হয়। জেলখানা থেকে তাকে মাঝে মধ্যে এক মিনিট কথা বলার সুযোগ দিলেও সেটি নিয়ন্ত্রিত ছিলো। কারণ এক মিনিট করেই ফোনটা নিয়ে নেওয়া হতো।’
তিনি লেখেন, ‘আচ্ছা একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবেন তো ঠিক কোন অপরাধে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো? সে কী কাউকে হয়রানি করেছিল? কাউকে নিপীড়ন? তাহলে শুধু প্রেম আর ভালোবাসার জন্য তাকে মরতে হলো? তাও এই যুগে এসে? আচ্ছা ধরলাম তিনি অপরাধ করেছেন তাই বলে মৃত্যুদণ্ড না দিলে হতো না?’
‘আগেই বলেছি, এক পাকিস্তানির ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর দূতাবাসকে দেওয়া এক তালিকায় জেদ্দা সংশোধনাগারে অবস্থানরত নজরুল ইসলামকে সাইবার ক্রাইম বা তথ্য প্রযুক্তি সংক্রান্ত অপরাধে দণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হলেও তাঁকে কখন ও কী দণ্ড দেওয়া হয়েছে তা ওই তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি।’
তিনি লেখেন, ‘তালিকায় সুইটি আক্তারের অবস্থান জেদ্দা মহিলা কারাগারে উল্লেখ আছে। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপরাধের কথা বলা হলেও সাজার বিবরণের কোনো উল্লেখ নেই। শুনলে অবাক হবেন, সাইবার কিংবা ব্যভিচারের অপরাধে এর আগে কোনো বাংলাদেশি নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নজির নেই। তাঁর মানে শুধু বাংলাদেশি বলেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মানবতা কোথায় এখানে?’
‘আপনারা এখন যে যার মতো ভাবতে পারেন। কারণ নজরুল এখন আর বেঁচে নেই। ফলে তাঁর আর স্বাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ নেই। হঠাৎ করেই তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। কাজেই অনেক কিছুই অমিমাংসিত থাকবে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত করে বলতে পারি বাংলাদেশি বলেই এভাবে মৃত্যুদণ্ড দিতে কোন দ্বিধা করেনি সৌদি আরব। মার্কিন, ব্রিটিশ, ইউরোপীয় তো পরের কথা একজন ভারতীয়, পাকিস্তান বা বা শ্রীলঙ্কান হলেও সৌদি আরব এই সিদ্ধান্ত নিতো না। কাজেই এই ব্যর্থতা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। এই ব্যর্থতা আমাদের সবার।’
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও লেখেন, ‘একবার ভাবুন তো, বাংলাদেশ যদি সৌদি আরবকে না জানিয়ে দুই সৌদি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করত, তাহলে প্রতিক্রিয়া কী হতো? আমি সবসময় বলি সৌদি আরব, কাতার, মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়া বাংলাদেশের একজন নাগরিককে কতোটা সম্মান ও অধিকার দেবে সেটা নির্ভর করে আমরা আমাদের নাগরিকদের কতোটা সম্মান ও অধিকার দিই। চলুন আমরা আমাদের নাগরিক ও প্রবাসীদের যথাযত সম্মান দিই।’
‘কথাগুলো লিখছি কারণ এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের শোকের গল্প নয়। এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের অধিকার, বিদেশে আইনি সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। একজন মানুষ তিন বছর ধরে জেলে আমাদের দূতাবাস এই রাষ্ট্র কেন ব্যবস্থা নিতে পারলো না? প্রতিবছর শুধু সৌদি আরবের জেল থেকে ৪০-৫০ হাজার লোক কেন ফেরে? তাদের বেশিরভাগই তো কোন অপরাধী নন।’
পোস্টে শরিফুল হাসান লেখেন, ‘আবারো বলছি, সৌদি আরব, কাতার, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা মালয়েশিয়ায় একজন বাংলাদেশি নাগরিক কতটা সম্মান ও অধিকার পাবেন, তা নির্ভর করে আমরা নিজের দেশে আমাদের নাগরিকদের কতটা সম্মান ও অধিকার দিই, পাশাপাশি বিদেশে তাঁদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে তার ওপরও।’
বিজ্ঞাপন
‘কাজেই চলুন, আমরা দেশের প্রতিটি নাগরিককে যথাযথ সম্মান দিই। প্রবাসীদের শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মানুষ হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে দেখি। আর বিদেশের মাটিতে তাঁদের জীবন, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করি। আবার নাগরিক হিসেবে আমরাও সরব হই।’
তিনি লেখেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্যি, সাধারণ শ্রমিক বা গৃহকর্মী বলে অধিকাংশ সময় আমরা তাদের ভুলে যাই। আমাদের মধ্যবিত্ত আবেগ তাদের বিষয়ে কাজ করে না। কাজেই চলুন কথা বলি, আওয়াজ তুলি যেন আর কোন নজরুলকে এভাবে মরতে না হয়! ভালো থাকুন সব প্রবাসীরা! ভালো থাকুক বাংলাদেশ!’
এমআরএম
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
