প্রত্যেক মানুষের জীবনে স্বপ্ন থাকে, আর স্বপ্ন পূরণের পথে থাকে নানা রকম অনিশ্চয়তা, ভয় ও বাধা। এ রকম পরিস্থিতিতে অনেকেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, কারণ ফলাফল কী হবে তা আগে থেকে জানা যায় না।
ইসলাম এই অনিশ্চয়তায় মানুষকে দুটি জিনিস শেখায় : আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ভরসা (তাওয়াক্কুল) করা এবং নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা (আমল) করা। এ দুটি একে অপরের বিপরীত নয়, বরং একটি অন্যটিকে পূর্ণতা দেয়।
তাওয়াক্কুলের প্রকৃত অর্থ : তাওয়াক্কুল মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়। এর অর্থ হলো উপায়-উপকরণ যথাসাধ্য গ্রহণ করার পর ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেনই। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।’ (সুরা তালাক, আয়াত ৩)
এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, মানুষ কোনো বিষয়ে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে চেষ্টায় নেমে পড়লে মহান আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন। তবে প্রতিটি বিষয়ের একটি নির্ধারিত সময়সীমা আছে। তাই মানুষের কাজ চেষ্টা করা, আর ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়া। অনেকে কাজের ফলাফল নিয়ে ভয়ে থাকার কারণে কখনো কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারে না। এ রকম অতি ভয় মুসলমানের জন্য সমীচীন নয়। মুসলমানকে প্রতিটি কাজে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে এবং সাহসিকতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর যখন সংকল্প করবে তখন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর মানুষ তা-ই পায়, যা সে চেষ্টা করে।’ (সুরা নাজম, আয়াত ৩৯)
এই আয়াত মানুষের চেষ্টার গুরুত্ব বোঝায়। তবে এখানে ফলাফলের নিশ্চয়তা নয়, বরং হালালভাবে চেষ্টার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সফলতা কখন ও কিভাবে আসবে তা আল্লাহর ইচ্ছা।
অতএব, কোনো কল্যাণকর হালাল কাজের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা যাবে না, বরং আল্লাহর ওপর ভরসা করে কাজ শুরু করতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তুমি তোমার জন্য উপকারী জিনিসের আকাঙ্ক্ষা করো, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং কখনো অক্ষমতা প্রকাশ কোরো না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৭৯)
নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলা: কোনো স্বপ্ন পূরণ করতে হলে আগে নিজেকে (দোয়া ও চেষ্টার মাধ্যমে) সে বিষয় পাওয়ার যোগ্য করে তুলতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো কওমের অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ১১)
ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়া: সফলতা অর্জনের জন্য চেষ্টা অবশ্যই করতে হবে পাশাপাশি চেষ্টার ফলাফল মহান আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিতে হবে। কারণ জানে না যে কিসে কল্যাণ আছে। অনেক সময় মানুষ যা অপছন্দ করে তাতেই কল্যাণ থাকে, আবার যা পছন্দ করে তাতে ক্ষতি থাকে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের ওপর লড়াইয়ের বিধান দেওয়া হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয় এবং হতে পারে কোনো বিষয় তোমরা অপছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হতে পারে কোনো বিষয় তোমরা পছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত ২১৬)
তাই চেষ্টার পর তাৎক্ষণিক ফল না পেলে হতাশ হওয়ার বদলে ধৈর্য ধরতে হবে। দোয়া করতে হবে। মানুষের দায়িত্ব হলো আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে চেষ্টা করা, আর ফলাফল নির্ভর করবে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর। তবে মনে রাখতে হবে, মুমিনের কোনো চেষ্টাই বিফলে যায় না। ফল যদি দুনিয়ায় না আসে, তবে তা আখিরাতে কল্যাণ হতে পারে বা আরো বড় কোনো পথ খুলে যেতে পারে।
তাই মুমিনের দায়িত্ব হলো দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার জন্য তাওয়াক্কুলের সঙ্গে পরিশ্রম করা। আল্লাহর ওপর ভরসা মানুষকে ভয় থেকে মুক্ত করে, আর পরিশ্রম তাকে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নেয়। ফলাফল আল্লাহর হাতে রেখে বান্দা যখন নিজের দায়িত্ব পালন করে, তখন সে মানসিক শান্তি ও প্রকৃত সফলতা দুটিই পেতে পারে।
আল্লাহ আমাদের সব ভালো উদ্যোগ কবুল করুন এবং আমাদের জন্য যা কল্যাণকর তা-ই দান করুন। আমিন।
