হরমুজ প্রণালির কাছে দুটি কনটেইনারবাহী জাহাজ ডুবে গেছে। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে জাহাজ দুটি ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে ইরানের হামলা বৃদ্ধির মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা এখন সবচেয়ে বেশি। হামলার এই তীব্রতা বৃদ্ধিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বুধবার যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, আগের ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালি এলাকায় ট্যাংকারসহ বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে অন্তত পাঁচটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ড্রোন হামলাও রয়েছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা–সংশ্লিষ্ট এক সূত্র বলেছে, হামলার গতি বেড়েছে এবং তা পরিকল্পিত বলে মনে হচ্ছে।
সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী কনটেইনারবাহী জাহাজ জিএফএস প্রাইড বুধবার ডুবে যায়। এর আগের দিন জাহাজটিতে হামলা হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পর অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী কেপ ডাও নামের আরেকটি জাহাজ হরমুজ প্রণালির কাছে ডুবে যায়।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাহাজটিতে একটি বস্তু আঘাত হেনেছিল।
জিএফএস প্রাইডের কথা উল্লেখ করে ইরান দাবি করেছে, অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সময় একটি পণ্যবাহী জাহাজ নৌমাইনে আঘাত লেগে ডুবে গেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বিবৃতিতে বলা হয়, জাহাজটি ‘অবৈধ ও বিপজ্জনক পথে’ চলাচলের সময় মাইনটিতে আঘাত হানে। সম্প্রচারে জাহাজটিকে পানিতে একদিকে কাত হয়ে থাকতে দেখা যায়। সেটি থেকে ঘন ধোঁয়া বের হচ্ছিল। জাহাজটিতে ২ হাজার ৫০০টি কনটেইনার ছিল বলেও জানানো হয়।
তবে ইউকেএমটিও জানিয়েছে, দুটি জাহাজেই অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হেনেছিল। ফলে জিএফএস প্রাইড ডুবে যাওয়ার বিষয়ে ইরানের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে ইরান বারবার জাহাজগুলোকে দেশটির অনুমতি নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জাহাজগুলোকে ওমানের উপকূলের কাছাকাছি একটি পথ দিয়ে প্রণালি পার হতে সহায়তা করছে।
ইউকেএমটিওর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ওই এলাকায় জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়েছে। শুধু রোববারই ছয়টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর পর্যন্ত দুই সপ্তাহে ২৪টি জাহাজে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে পরিশোধিত জ্বালানি বহনকারী তিনটি ট্যাংকার এবং অপরিশোধিত তেলবাহী দুটি ট্যাংকার ছিল।
হামলা বৃদ্ধির ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জাহাজে হামলা চালিয়ে নিজেদের আঘাত হানার সক্ষমতা দেখাতে চাইছে তেহরান। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে।
নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমাতে চাপে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। এ কারণে নির্বাচনে রিপাবলিকান দলকে ভোটারদের শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে বলে দলটির মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে মানুষের মনোযোগ সরাতে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলাকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তুলে ধরছে।
ইরানের দুই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটির বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করছে বলে মনে করা জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে সম্প্রতি নতুন কৌশলে হামলা শুরু করেছে তেহরান। হামলার ধরন ও গতি—দুই ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলা।
ওই দুই কর্মকর্তার একজন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বৈশ্বিক তেলের দাম কমানোর প্রচেষ্টা ব্যাহত করাই এর লক্ষ্য।’
তাদের দাবি, নতুন কৌশল গ্রহণের সিদ্ধান্ত ইরানের নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে। দেশটির শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমেই এটি কার্যকর করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের এক সামরিক কর্মকর্তা জানান, মার্কিন বাহিনী ইরানের অধিকাংশ রাডার সক্ষমতা ধ্বংস করার পর আইআরজিসি ছোট নৌকায় নিরস্ত্র পর্যবেক্ষক মোতায়েন শুরু করেছে। এসব পর্যবেক্ষক সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করেন। এর মধ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজও রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরো জানান, গত সপ্তাহে আগে প্রকাশ না পাওয়া একটি ঘটনায় মার্কিন সামরিক বাহিনী জানতে পারে, একটি ধৌ নামের ঐতিহ্যবাহী নৌযান থেকে ইরানের পর্যবেক্ষকেরা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান আইআরজিসিকে জানাচ্ছিলেন। পরে মার্কিন বাহিনী নৌযানটির মুখোমুখি হয়। নৌযানটিতে থাকা ব্যক্তিদের সেটি ছেড়ে যেতে বলা হয়। এরপর নৌযানটি ধ্বংস করা হয়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি বলে জানিয়েছেন ওই মার্কিন কর্মকর্তা।
এএম
