চলতি বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেটে যে কয়েকটি হতাশার অধ্যায় যোগ হয়েছে, তার মধ্যে জিম্বাবুয়ে সফর অন্যতম। সেই সফরে একমাত্র টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজ—দুটিতেই হেরেছিল বাংলাদেশ। চোটের কারণে হারাতে হয়েছিল ছন্দে থাকা পেসার নাহিদ রানাকেও। এবার আবুধাবিতে ত্রিদেশীয় সিরিজের উদ্বোধনী ম্যাচে শনিবার আবারও জিম্বাবুয়ের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক সাফল্যের বিচারে সিকান্দার রাজার নেতৃত্বাধীন দলটি এগিয়ে থেকেই মাঠে নামবে।
তবে গত মাসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে কঠিন সময় পার করেছে জিম্বাবুয়ে। তিন ম্যাচের সিরিজে তারা হেরেছে ৩-০ ব্যবধানে। যদিও শেষ ম্যাচে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের প্রায় হারিয়েই দিয়েছিল স্বাগতিকরা। এক উইকেটের ব্যবধানে হারের আগে অস্ট্রেলিয়াকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল তারা। অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পাশাপাশি জিম্বাবুয়ের দলে উঠে আসছেন বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান তরুণও।
চোটের কারণে রিচার্ড নাগারাভা না থাকায় দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিকান্দার রাজা। অভিজ্ঞতার জায়গায় তার সঙ্গে রয়েছেন ক্রেইগ আরভিন ও ব্রেন্ডন টেলর। অন্যদিকে ব্রায়ান বেনেট, বেন কারান ও নিউম্যান নিয়ামহুরির মতো তরুণদের ওপরও বড় দায়িত্ব থাকবে। নতুন বলে বাংলাদেশের ব্যাটারদের পরীক্ষায় ফেলতে পারেন ব্র্যাড ইভান্স ও ব্লেসিং মুজারাবানি।
বাংলাদেশ দলে ফিরেছেন একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অধিকাংশ নিয়মিত খেলোয়াড়। তবে নাহিদ রানাকে পাওয়া যাচ্ছে না। চলতি মাসের শেষ দিকে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফেরার লক্ষ্য নিয়ে আরও একবার পরীক্ষা করাতে তাকে পার্থে পাঠানো হয়েছে।
অধিনায়ক লিটন দাসের হাতে বোলিংয়ের বেশ কয়েকটি বিকল্প থাকলেও একাদশ সাজাতে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। বিশেষ করে এশিয়ান গেমসে টানা দুই ম্যাচে ব্যর্থ হওয়া মোস্তাফিজুর রহমানের জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ে সফরে না থাকায় এবার একদিনের আন্তর্জাতিক দলের অধিনায়ক হিসেবে ফিরছেন লিটন। তার জায়গায় দায়িত্ব পালন করা মেহেদী হাসান মিরাজকে সরিয়ে দেওয়া হলেও মাঠের পারফরম্যান্সে তিনি নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। এদিকে গত কয়েক বছরের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে নজর কাড়া পারফরম্যান্স এবং সম্প্রতি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর রহস্য স্পিনার আলিস আল ইসলামের ওপরও ভরসা রাখতে পারেন লিটন।
ব্যাটিংয়েও বাংলাদেশের রয়েছে পর্যাপ্ত বিকল্প। ওপেনিংয়ে তানজিদ হাসান ও সৌম্য সরকারের খেলার সম্ভাবনা বেশি। তিন নম্বরে নাজমুল হোসেন শান্ত, এরপর তাওহীদ হৃদয় ও লিটন দাসকে নিয়ে গড়ে উঠতে পারে মধ্যক্রম। নিচের দিকে ব্যাটিং শক্তি বাড়াবেন মোসাদ্দেক হোসেন ও মেহেদী হাসান মিরাজ। বিকল্প হিসেবে রয়েছেন সাইফ হাসান ও নুরুল হাসান।
লিটনের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ
সপ্তাহের শুরুতে টেস্ট ক্রিকেটে রেকর্ড গড়া পারফরম্যান্সের পর লিটনকে ঘিরে প্রত্যাশা বেড়েছে। এক টেস্টে সেঞ্চুরি, হাফ সেঞ্চুরি ও উইকেটরক্ষক হিসেবে নয়টি ডিসমিসালের কীর্তি গড়েছেন তিনি। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে উইকেটরক্ষক হিসেবে একই ম্যাচে এমন কীর্তি এই প্রথম। এমন সময়েই একদিনের আন্তর্জাতিক দলের অধিনায়কের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন তিনি।
২০২৬ সালে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও ভালো ছন্দে রয়েছেন লিটন। নয় ইনিংসে তার সংগ্রহ ৩০০ রান। অথচ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে চরম ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে গেছেন এই ব্যাটার। ওই দুই বছরে ছয় ম্যাচে তার সংগ্রহ ছিল মাত্র ছয় রান।
নজরে ব্র্যাড ইভান্স
২০২৬ সালে উইকেট শিকারের হিসাবে ইংল্যান্ডের জোফরা আর্চারের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ রয়েছে জিম্বাবুয়ের ব্র্যাড ইভান্সের। বর্তমানে তার শিকার ৪৪ উইকেট, আর্চারের চেয়ে পিছিয়ে নয় উইকেটে।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সর্বশেষ একদিনের আন্তর্জাতিক সিরিজের শেষ ম্যাচে ৪৭ রানে চার উইকেট নিয়েছিলেন ইভান্স। এ বছর এই সংস্করণে জিম্বাবুয়ের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি তিনিই। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিয়েছেন নয় উইকেট। এর আগে জুলাইয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষেও শিকার করেছিলেন পাঁচ উইকেট।
চোট কাটিয়ে এ বছর ক্রিকেটে ফেরার পর টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন এই পেসার।
মোস্তাফিজের জায়গা নিয়ে সংশয়
বাংলাদেশের একাদশে ফিরতে পারেন লিটন দাস। সে ক্ষেত্রে নুরুল হাসানকে জায়গা ছাড়তে হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন মোস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে। এশিয়ান গেমসে সাম্প্রতিক ব্যর্থতার কারণে একাদশ থেকে বাদ পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন তিনি।
মোস্তাফিজকে শেষ পর্যন্ত দলে না রাখা হলে তার আন্তর্জাতিক একদিনের ক্যারিয়ারে এই প্রথম বাদ পড়ার ঘটনা ঘটবে।
সম্ভাব্য একাদশ
বাংলাদেশ: তানজিদ হাসান, সৌম্য সরকার, নাজমুল হোসেন শান্ত, তাওহীদ হৃদয়, লিটন দাস (অধিনায়ক ও উইকেটরক্ষক), মোসাদ্দেক হোসেন, মেহেদী হাসান মিরাজ, তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ, শরিফুল ইসলাম ও তানভীর ইসলাম।
জিম্বাবুয়ে: ব্রায়ান বেনেট, বেন কারান, ইনোসেন্ট কাইয়া, ব্রেন্ডন টেলর (উইকেটরক্ষক), ক্রেইগ আরভিন, সিকান্দার রাজা (অধিনায়ক), রায়ান বার্ল অথবা ওয়েসলি মাধেভেরে, ব্র্যাড ইভান্স, গ্রায়েম ক্রেমার, নিউম্যান নিয়ামহুরি ও ব্লেসিং মুজারাবানি।
জিম্বাবুয়ের হয়ে একাদশে ফিরতে পারেন প্রতিভাবান পেসার নিউম্যান নিয়ামহুরি। অন্যদিকে মধ্যক্রমে রায়ান বার্লকে বিবেচনা করা হতে পারে।
আবুধাবির মন্থর উইকেটে বড় পরীক্ষা
আবুধাবিতে দিবারাত্রির ম্যাচগুলোতে সাধারণত মন্থর উইকেট দেখা যায়। এখানে সর্বশেষ পাঁচটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করা দলগুলোর গড় সংগ্রহ ২৬৬ রান। ওই পাঁচ ম্যাচের চারটিতেই প্রথমে ব্যাট করা দল জয় পেয়েছে। আবুধাবির গরম ও আর্দ্র আবহাওয়াও খেলোয়াড়দের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
দুই দশক পর নিরপেক্ষ ভেন্যুতে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে। সর্বশেষ এমন লড়াই হয়েছিল ২০০৬ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে, ভারতের জয়পুরে।
জিম্বাবুয়ে এবারই প্রথম আবুধাবির জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলবে। অন্যদিকে এই মাঠে ছয় ম্যাচ খেলে দুটিতে জিতেছে বাংলাদেশ।
দুই দলের বর্তমান খেলোয়াড়দের মধ্যে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক ব্রেন্ডন টেলর। ২০২১ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে সর্বশেষ এই সংস্করণে খেলেছিলেন তিনি।
শিরোপা জিততে দুই ম্যাচেই জয় চান মোসাদ্দেক
ত্রিদেশীয় সিরিজের শিরোপা জিততে হলে জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে লিগ পর্বের দুই ম্যাচেই জিততে হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশের ব্যাটার মোসাদ্দেক হোসেন।
তিনি বলেন, 'আমরা অবশ্যই শিরোপা জিততে চাই। তবে সে জন্য জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে লিগ পর্বের দুটি ম্যাচেই জিততে হবে। আমাদের টেস্ট দলের খেলোয়াড়েরা গরমের সঙ্গে বেশ ভালোভাবে মানিয়ে নিয়েছেন। এখানে কয়েক দিন অনুশীলন করেছি। তাই আশা করছি, সন্ধ্যায় কিছুটা বাতাস থাকবে। কারণ, ম্যাচগুলো বিকেলের শেষ ভাগে শুরু হবে।'
