মহাকাশে প্রথমবারের মতো সবুজ আভাযুক্ত একটি তারার সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। তবে এটি সাধারণ কোনো তারা নয়, বরং সূর্যের মতো নক্ষত্রের জীবনাবসানের পর তৈরি হওয়া এক ধরনের ঘন ও উত্তপ্ত অবশিষ্ট বস্তু, যার নাম শ্বেত বামন। ‘ডব্লিউডি জে১৩৩০+৬৪৩৫’ নামের এই শ্বেত বামনটির আলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এর বর্ণ ও দৃশ্যমান রং প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মার্ক হল্যান্ডসের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, তারার রং নির্ধারণে শুধু তাপমাত্রাই নয়, এর বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক গঠন ও ঘনত্বও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষণাপত্রটি ১৫ অক্টোবর ২০২৬ বিজ্ঞান সাময়িকী ‘রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি টেকনিকস অ্যান্ড ইনস্ট্রুমেন্টস’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, সবুজ আভাযুক্ত শ্বেত বামনটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২৮০ আলোকবর্ষ দূরে ড্রাকো নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত। এর বায়ুমণ্ডলে সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম ও লিথিয়ামের মতো উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তারাটির নিজস্ব গ্রহমণ্ডলের পাথুরে বস্তু এর মধ্যে প্রবেশ করায় এসব উপাদান বায়ুমণ্ডলে জমা হয়েছে। চরম ঘনত্বের পরিবেশে এসব উপাদানের কারণে আলোর শোষণ ও বিকিরণের ধরন বদলে গিয়ে তারাটিকে সবুজাভ দেখায়।
গবেষণাটির গুরুত্ব শুধু একটি সবুজ তারার সন্ধান পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, শ্বেত বামনদের রং সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা অসম্পূর্ণ। একই ধরনের নক্ষত্রের অবশিষ্টাংশ রাসায়নিক গঠন ও তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে গোলাপি, বেগুনি, হলুদ, হালকা নীলাভ-সবুজ কিংবা সবুজ আভাও ধারণ করতে পারে।
তারার রং কেন বদলে যায়: সাধারণভাবে তারার রং তার পৃষ্ঠের তাপমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। তুলনামূলক শীতল তারা কমলা বা লালচে দেখায়, সূর্যের মতো তারার আলো সাদা মনে হয়, আর অধিক উত্তপ্ত তারা নীলাভ হতে পারে। এ ধারণার ভিত্তি হলো, তারার আলো কীভাবে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিকিরিত হয় এবং সেই আলো মানুষের চোখে কীভাবে ধরা পড়ে।
কিন্তু শ্বেত বামনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো জটিল। সূর্যের মতো কোনো নক্ষত্রের জীবনচক্রের শেষ পর্যায়ে বাইরের স্তরগুলো ছড়িয়ে পড়ে এবং কেন্দ্রে থেকে যাওয়া অবশিষ্ট অংশটি শ্বেত বামনে পরিণত হয়। আকারে ছোট হলেও এসব বস্তু অত্যন্ত ঘন। এদের বায়ুমণ্ডলে পদার্থের ঘনত্ব অনেক ক্ষেত্রে এত বেশি হয় যে, সেখানে পরমাণু ও অণুর আলোর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া সাধারণ তারার তুলনায় ভিন্নভাবে ঘটে।
গবেষক মার্ক হল্যান্ডস বলেন, অধিকাংশ শ্বেত বামনসহ সাধারণ তারাকে প্রায় আদর্শ বিকিরণকারী হিসেবে বিবেচনা করা যায়। সে ক্ষেত্রে তাপমাত্রাই তাদের রং নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা রাখে। কিন্তু শ্বেত বামনের বিশেষ রাসায়নিক গঠন বিবেচনায় নিলে অপ্রত্যাশিত সব রং দেখা যেতে পারে। এসব তারার কয়েকটির সম্ভাব্য রং তাঁকেও বিস্মিত করেছে বলে জানান তিনি।
সবুজ আভার পেছনে সোডিয়ামের ভূমিকা: গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ‘ডব্লিউডি জে১৩৩০+৬৪৩৫’ শ্বেত বামনটির বায়ুমণ্ডলে থাকা সোডিয়াম আলোর কমলা অংশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শোষণ করে। চরম ঘনত্বের কারণে সোডিয়ামের শোষণ বৈশিষ্ট্য বিস্তৃত তরঙ্গদৈর্ঘ্যজুড়ে প্রভাব ফেলে। এর ফলে তারাটি থেকে আসা আলোর বর্ণালি বদলে যায় এবং মানুষের চোখে তারাটিকে সবুজাভ মনে হওয়ার মতো রং তৈরি হয়।
হল্যান্ডসের ভাষায়, কোনো গ্রহের পৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটি সবুজ তারা জ্বলতে দেখার কল্পনা কল্পকাহিনির মতো মনে হতে পারে। অথচ বর্ণালি বিশ্লেষণ ও রঙের বৈজ্ঞানিক হিসাব বলছে, এমন দৃশ্য প্রকৃতিতে সম্ভব।
তবে পৃথিবী থেকে তারাটির প্রকৃত রং খালি চোখে দেখা যায় না। এত দূরত্বে থাকা শ্বেত বামনের আলোকবিন্দু থেকে সরাসরি তার পৃষ্ঠের রং নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ কারণে গবেষকেরা তারার আলোকে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিভক্ত করে পাওয়া বর্ণালি বিশ্লেষণ করেছেন। এরপর মানুষের চোখের আলো উপলব্ধির বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ মডেলের সাহায্যে হিসাব করেছেন, কাছ থেকে দেখলে তারাটি কেমন রঙের মনে হতো।
অর্থাৎ, সবুজ তারাটির আবিষ্কার কোনো কাছ থেকে তোলা ছবির ভিত্তিতে নয়; বরং পর্যবেক্ষণ করা আলোর বর্ণালি ও বৈজ্ঞানিক মডেলের মাধ্যমে এর সম্ভাব্য দৃশ্যমান রং নির্ণয় করা হয়েছে।
গোলাপি ও হলুদ তারারও সন্ধান: গবেষণায় সবুজ তারাটির পাশাপাশি অস্বাভাবিক রঙের আরো কয়েকটি শ্বেত বামনের সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে ‘ডব্লিউডি জে১০১১+২৮৪৫’ নামের একটি শ্বেত বামন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪৮ আলোকবর্ষ দূরে থাকা এই তারাটিকে গবেষকেরা এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া সবচেয়ে লালচে তারাগুলোর একটি বলে মনে করছেন। এর সম্ভাব্য রং গাঢ় স্যামন-গোলাপি।
তারাটির বায়ুমণ্ডলে কার্বনের উপস্থিতি এবং কার্বন অণুর কারণে আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষিত হয়। এতে নীল, সবুজ ও হলুদ অংশের আলো তুলনামূলকভাবে কমে গিয়ে লালচে আভা প্রাধান্য পায়। ফলে তারাটিকে সাধারণ সাদা বা নীলাভ শ্বেত বামনের মতো দেখায় না।
গবেষণায় হলুদ আভাযুক্ত শ্বেত বামনেরও সন্ধান পাওয়া গেছে। যেসব শ্বেত বামনের বায়ুমণ্ডলে কার্বন বা অন্যান্য ভারী মৌল থাকে, সেগুলোর আলো শোষণের ধরন বদলে যেতে পারে। আবার হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডলের কিছু শ্বেত বামন হালকা নীলাভ-সবুজ রং ধারণ করতে পারে।
গবেষকেরা পৃথিবীর কাছাকাছি থাকা শ্বেত বামনগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, অধিকাংশই দেখতে সাদার কাছাকাছি। অস্বাভাবিক রঙের শ্বেত বামন তুলনামূলকভাবে বিরল। সূর্য থেকে ২০ পারসেক দূরত্বের মধ্যে থাকা ১৫২টি শ্বেত বামনের নমুনা বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখেছেন, গড় হিসাবে এদের রং সাদার কাছাকাছি। অর্থাৎ, শ্বেত বামনদের নামের সঙ্গে তাদের সাধারণ রংয়ের মিল রয়েছে, যদিও ব্যতিক্রমও আছে।
গ্রহমণ্ডলের অতীত জানতে নতুন সূত্র: শ্বেত বামনের বায়ুমণ্ডলে ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, লিথিয়াম ও কার্বনের মতো উপাদানের উপস্থিতি শুধু রং নির্ধারণেই ভূমিকা রাখে না; এগুলো তারাটির অতীত সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। কোনো শ্বেত বামনের বায়ুমণ্ডলে পাথুরে গ্রহাণু বা গ্রহমণ্ডলের ধ্বংসাবশেষ থেকে আসা উপাদান পাওয়া গেলে, তা তার চারপাশে একসময় গ্রহীয় বস্তু থাকার ইঙ্গিত দিতে পারে।
এ কারণে নতুন গবেষণা মৃত নক্ষত্রের রং নিয়ে কৌতূহল মেটানোর পাশাপাশি গ্রহমণ্ডলের বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। নক্ষত্রের জীবনাবসানের পরও তার বায়ুমণ্ডলে গ্রহীয় বস্তু থেকে যাওয়া রাসায়নিক চিহ্ন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সেই নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা গ্রহমণ্ডলের অতীত সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
গবেষণাটি আরো দেখিয়েছে, মহাকাশের বস্তুর দৃশ্যমান রং নির্ণয়ে শুধু তাপমাত্রার হিসাব যথেষ্ট নয়। বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব, রাসায়নিক উপাদান এবং আলো শোষণের জটিল প্রক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হয়। এই নতুন উপলব্ধি শ্বেত বামনদের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি দূরবর্তী নক্ষত্রের আলো বিশ্লেষণের পদ্ধতিকেও আরো সমৃদ্ধ করবে।
তথ্যসূত্র: গবেষণাপত্র, যেকোনো রঙেই শ্বেত বামন: তাদের বর্ণের বৈচিত্র্য; রয়টার্সের বিজ্ঞানবিষয়ক প্রতিবেদন।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৭/১০/২০২৬
