মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় ধলেশ্বরী ও কালীগঙ্গা নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা ও ফসলি জমি। গত এক দশকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছয় শতাধিক পরিবারের বসতভিটা ও হাজার বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে অসংখ্য বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
সম্প্রতি কালবেলার সরেজমিন অনুসন্ধানে উপজেলার নদীভাঙনকবলিত বিভিন্ন এলাকায় এমন চিত্র দেখা গেছে। নদীর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের ক্ষয়ক্ষতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এ পর্যন্ত ভাঙনে তাদের ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বানিয়াজুরী ইউনিয়নের জাবরা বাজার থেকে ঘিওর সদর ও পয়লা ইউনিয়নের শ্রীধরনগর হয়ে বেগুন নারচী পর্যন্ত ধলেশ্বরী নদীর বিভিন্ন অংশে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে কালীগঙ্গা নদীর তীরবর্তী বানিয়াজুরী ইউনিয়নের কেল্লাচর, পূর্বকুমল্লী ও নকীববাড়ি এলাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১০ বছরে কেল্লাচর ও নকীববাড়ি এলাকায় নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অন্তত দেড় শতাধিক ঘরবাড়ি ও প্রায় আড়াইশ বিঘা ফসলি জমি। এর মধ্যে সাজ্জাদ হোসেন ও সামছু মুন্সির পরিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। কালীগঙ্গার ভাঙনে তাদের প্রায় ৪৫ বিঘা জমি ও বসতভিটা বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া ইসাক, মজনু, রবেল ও আব্দুল মান্নানের বসতবাড়ির একাংশ নদীর দিকে ঝুলে রয়েছে। যেকোনো সময় সেগুলো ধসে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
ক্ষতিগ্রস্ত সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের পরিবারের ৪৫ বিঘা জমি কালীগঙ্গার পেটে চলে গেছে। বাধ্য হয়ে অন্যত্র বসবাস করতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ভাঙন রোধে স্থায়ী কোনো বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। আমরা দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানাই।’
ঘিওর সদরেও নদীভাঙনের চিত্র উদ্বেগজনক। নতুন সেতুর পূর্ব পাশে ও কুস্তা শ্মশানঘাট এলাকায় কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হলেও স্থানীয়দের মতে, তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। কুস্তা উত্তরপাড়ে প্রায় ১০০ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া কুস্তা তিন রাস্তার মোড় থেকে শ্রীধরনগর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে, বাড়ছে ভাঙনের ঝুঁকি। প্রশাসন মাঝেমধ্যে অবৈধ ড্রেজিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও পরে আবার তা শুরু হয়। তাদের দাবি, নদীতীর রক্ষায় জিও ব্যাগ ও কংক্রিটের ব্লক স্থাপনের পাশাপাশি নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বালিয়াখোড়া ইউনিয়নেও ভাঙনে ক্ষয়ক্ষতি কম নয়। গত পাঁচ বছরে ধলেশ্বরী নদীর ভাঙনে কুশুন্ডা দক্ষিণপাড়া ও উত্তরপাড়া এলাকার প্রায় ৫০টি বসতবাড়ি এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ পাকা সড়ক বিলীন হয়েছে। বর্তমানে আরও অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ও কয়েকশ বিঘা জমি ঝুঁকিতে রয়েছে। দুই বছর আগে দেড় বিঘা জমিসহ বসতভিটা হারিয়েছেন তসলিম মিয়া। একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মাসুদ মিয়া, চাঁন মিয়াসহ ওই এলাকার অনেক পরিবার।
বসতভিটা হারানো ফিরোজা খাতুন বলেন, ‘বর্ষা মৌসুম এলেই নদীভাঙন দেখতে অনেকে আসেন, আশ্বাস দেন। কিন্তু বর্ষা শেষে আর কেউ খোঁজ নেন না। নদীর বুকে আমাদের মাথা গোঁজার শেষ ঠাঁইটুকুও চলে গেছে। আমরা ত্রাণ চাই না, স্থায়ী বাঁধ চাই।’
এদিকে নদীভাঙন প্রতিরোধে প্রায় ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ‘মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলাধীন পুরাতন ধলেশ্বরী নদীর ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসমূহে নদীর তীর প্রতিরক্ষামূলক কাজ’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় ছয়টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থানে তিনটি স্থায়ী ও তিনটি অস্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক কাজের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্প এলাকার মধ্যে বসতভিটার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্মিত চারটি সেতু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩০০ হেক্টর ফসলি জমি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও যোগাযোগব্যবস্থা রক্ষা করা সম্ভব হবে।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ঘিওর উপজেলার পুরাতন ধলেশ্বরী নদীর ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে তীর প্রতিরক্ষামূলক কাজের প্রকল্পটি বর্তমানে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন ও বরাদ্দ পেলে ঘিওর উপজেলার বড় একটি অংশ নদীভাঙন থেকে রক্ষা পাবে।
তবে প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা। তাদের দাবি, শুকনো মৌসুমেই দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে। তা না হলে আগামী বর্ষায় আরও বসতভিটা, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
