Ei Samay
Published on
:
3 min read
কুদ্দুস আফ্রাদ, ঢাকা
দুর্গাপুজো উপলক্ষে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে জমে উঠেছে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে হাট প্রাঙ্গণ। ঢাক-ঢোল, সানাই, করতাল ও বাঁশির সম্মিলিত সুরে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবের পরিবেশ। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরছেন শিল্পীরা। তাঁদের পরিবেশনা শুনে পছন্দ হলে পুজো উদ্যোক্তারা বাজনদারদের সঙ্গে চুক্তি করছেন। ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে লক্ষাধিক টাকার পারিশ্রমিকের বিনিময়ে চলছে চুক্তি।
প্রতি বছরের মতো এ বারও কটিয়াদী সদরের পুরোনো বাজার এলাকায় বসেছে এই হাট। বুধবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই হাট চলেছে শুক্রবার ষষ্ঠীর গভীর রাত পর্যন্ত। বাজার কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, এ বার দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ২০০-র বেশি বাদকদল এই হাটে এসেছেন।
ইতিহাস বলছে, প্রায় ৫০০ বছর আগে ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের আমলে কটিয়াদীর ঢাকের হাটের সূচনা হয়। রাজা কটিয়াদীর চারিপাড়ায় তার রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করতেন। পূজায় ঢাক, ঢোল ও বাঁশি বাজানোর জন্য সেরা শিল্পীদের খুঁজতে বিক্রমপুর পরগনায় বার্তা পাঠানো হয়। সেই আহ্বানে বহু বাদ্যযন্ত্রশিল্পী নৌপথে কটিয়াদীতে আসেন। রাজা নিজে তাদের বাজনা শুনে সেরা দল বেছে নেন। সেই থেকেই দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কটিয়াদী পুরোনো বাজারে এই হাট বসার প্রচলন শুরু হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শ্রীমা সঙ্ঘ হাটটির তত্ত্বাবধান করে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জীবনকুমার সাহা বলেন, ‘রাজা নবরঙ্গ রায়ের আমল থেকেই এই হাটের শুরু। হাটে আসা বাদকদের থাকা-খাওয়া, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে সংগঠন। কোনও বাদকদল বাড়ি ফিরতে না পারলে সংগঠনের তরফে তাদের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থাও করা হয়।’
শিল্পীদের পরিবেশনা শুনতে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। ঢাক-ঢোলের সম্মিলিত বাদ্য আর শিল্পীদের পরিবেশনায় এই হাট যেন পরিণত হয় এক উৎসবের প্রাঙ্গণে। কটিয়াদী পুর এলাকার বাসিন্দা রতনকুমার সাহা বলেন, ‘এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মিলন ঘটে। এখানকার সম্প্রীতির ঐতিহ্য অনেক পুরোনো।’
বিক্রমপুর থেকে ১০ সদস্যের দল নিয়ে হাটে এসেছেন রণজিৎ মণি দাস। তার দলের সঙ্গে রয়েছে ঢাক-সহ আধুনিক বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। তিনি বলেন ‘এই হাটে এলে সারা দেশের অনেক বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়।’ ঢাকার নবাবপুর থেকে ঢাক নিয়ে এসেছেন নিবাস চন্দ্র মণিদাস। কয়েক প্রজন্ম ধরে তাঁদের পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কটিয়াদীর ঢাকের হাট। তিনি জানান, আগে দল বেঁধে হাটে আসতেন। তবে, গত দু’বছর ধরে একাই আসছেন। গত বছর ১৬ হাজার টাকায় একটি চুক্তি হয়েছিল। এ বার তাঁর প্রত্যাশা ২০ হাজার টাকা।
Ei Samay
নারায়ণগঞ্জ থেকে ছয় সদস্যের দল নিয়ে এসেছেন পঙ্কজ সাহা। তিনি বলেন, ‘গত ২৫ বছর ধরে এই হাটে আসি। এখানে যারা আসেন, তারা কেউ খালি হাতে ফিরে যান না। কোথাও না কোথাও একটা ব্যবস্থা হয়েই যায়।’ বিক্রমপুর থেকে আসা ঢাকি হরলাল দাস বলেন, ‘ফোনে অনেকে যোগাযোগ করেছিলেন, কিন্তু কোথাও যাইনি। এই হাটে না এলে মন মানে না। এখানে এলে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। এই আনন্দটাই আলাদা।
হবিগঞ্জ সদর থেকে আসা ঢাকি বলরাম পণ্ডিতের অবশ্য দাবি আগের থেকে ঢাকির সংখ্যা কমেছে হাটে। তাঁর ব্যাখ্যা, ‘এখন তো মানুষ মোবাইল ফোনেই অনেক প্রয়োজন মিটিয়ে ফেলে। ফলে আগের মতো ঢাকিদের খোঁজে হাটে আসার প্রবণতাও তুলনামূলকভাবে কমেছে।’
নরসিংদীর শিবপুর থেকে হাটে এসেছেন পুজোর আয়োজক শুভাশিস সূত্রধর। তিনি জানান, ‘প্রতি বছর দুর্গাপূজার জন্য বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের দল নিতে ঐতিহ্যবাহী কটিয়াদীরের হাটে আসি। সকাল থেকে অনেকের বাজনা শুনেছি। ৯০ হাজার টাকায় একটি দলের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।’ ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থেকে আসা তাপস বিশ্বাস বলেন, ‘এ বারই প্রথম এই হাটে এসেছি। এসে মুগ্ধ হয়েছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে বাদকদল এসেছে। তাদের মধ্যে বিক্রমপুরের পাঁচ সদস্যের একটি দলের বাজনা পছন্দ হয়েছে। ৮৫ হাজার টাকায় তাঁদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।’
কটিয়াদী উপজেলার কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, ‘বিক্রমপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদী, হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাদকদল হাটে এসেছেন। ঢাক-ঢোলের পাশাপাশি বাঁশি, সানাই, করতাল, খঞ্জনি, মন্দিরা, ঝনঝনি-সহ বিভিন্ন আধুনিক বাদ্যযন্ত্রও নিয়ে এসেছেন তারা। তিনি বলেন, ‘হাটের নাম ঢাকের হাট হলেও এখানে কোনও বাদ্যযন্ত্র বিক্রি হয় না। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তি করে বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা পুজোর মণ্ডপে বাজাতে যান।’
