উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া ও জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সে শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের আন্দোলন সহিংস রূপ নিয়েছে। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পাশাপাশি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। পর্তুগালেও আবাসন সংকট ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছে হাজারো মানুষ।
ফ্রান্সে সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের বিক্ষোভ, আটক ১২০০ : জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকটের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ একত্র হয়ে প্রতিবাদ জানায়। ফরাসি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশ নেয় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ। তবে আন্দোলনকারী শ্রমিক সংগঠনের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল আট লাখ। শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও শনিবারের বিক্ষোভ দিনের শেষভাগে বিভিন্ন স্থানে সহিংস রূপ নেয়। মুখোশধারী ব্যক্তিরা যানবাহনে আগুন দেয়, দোকানপাটে ভাঙচুর চালায় ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে মালামাল লুট করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও লাঠিপেটার আশ্রয় নেয়। দেশজুড়ে অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্যারিসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। কয়েকটি শহরে পৌর ভবন, পর্যটন কার্যালয় ও দোকানপাট আক্রান্ত হয়। মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে দেড় শতাব্দীর কাছাকাছি পুরোনো একটি ঐতিহাসিক ভবনে আগুন লাগার ঘটনা বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করে। লিলে একটি বৈদ্যুতিক পণ্য বিক্রির দোকানেও লুটপাট চালানো হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকট থেকে জনঅসন্তোষের বিস্তার : ফ্রান্সে সাম্প্রতিক আন্দোলনের সূত্রপাত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং শিক্ষাব্যবস্থার ব্যয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ থেকে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলনে পরে শ্রমিক সংগঠন, বিভিন্ন পেশার মানুষ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন সাধারণ নাগরিকেরা যোগ দেয়। বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং উন্নত জীবনযাপনের ক্রমবর্ধমান ব্যয় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কৃষক ও পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষে রূপ দিয়েছে।
ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী অতিরিক্ত তিন হাজার শিক্ষক নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ প্রশমনে এ উদ্যোগ যথেষ্ট হয়নি। শিক্ষার সংকটের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় যুক্ত হওয়ায় প্রতিবাদ আরও বিস্তৃত হয়েছে।
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ক্ষতিগ্রস্ত ঐতিহাসিক স্থাপনা : প্যারিসে দিনের প্রথম ভাগে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। একদল মুখোশধারী ব্যক্তি সড়কে থাকা যানবাহন ও বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেয়। কয়েকটি দোকান ও খাবারের প্রতিষ্ঠানেও হামলা হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। লিমোজ শহরে ঐতিহাসিক পৌর ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ভবনটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। মার্সেই ও লিলের কয়েকটি পৌর ভবনেও ভাঙচুর চালানো হয়। লিয়োঁ শহরের একটি পর্যটন কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন স্থানে মুখোশধারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যটকদের ব্যবহৃত একটি ট্রেন পুলিশের দিকে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও দেখা গেছে। এদিকে সাঁ-এতিয়েন শহরে বিস্ফোরকজাতীয় বস্তুর আঘাতে এক তরুণের হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর দিয়েছেন স্থানীয় মেয়র। সহিংসতায় পুলিশ সদস্যরাও আহত হয়েছেন বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে।
ম্যাক্রোঁর কঠোর বার্তা, ট্রাম্পের ব্যঙ্গ : ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিক্ষোভ ও মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি সরকারের সম্মান রয়েছে। তবে সেই অধিকারের সঙ্গে ব্যক্তি ও সম্পত্তির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের দায়িত্বও জড়িত। ম্যাক্রোঁর বক্তব্য, সরকারি কার্যালয়, পৌর ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানানো হলেও দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ফ্রান্সের অস্থিরতা নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা : ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সরকারি ঋণের চাপও অর্থনীতিকে জটিল পরিস্থিতিতে ফেলেছে। বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করা এবং সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দেশটির ঋণসংক্রান্ত ব্যয় বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পর্তুগালে বাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের দামে প্রতিবাদ : ইউরোপের আরেক দেশ পর্তুগালেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আবাসন সংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। রাজধানী লিসবনসহ পোর্তো ও কইমব্রা শহরে সাধারণ নাগরিক, আবাসন অধিকারকর্মী ও শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে মজুরি বৃদ্ধি, উন্নত অবসরভাতা, জনসেবার মানোন্নয়ন এবং সবার জন্য সাধ্যের মধ্যে বাসস্থানের ব্যবস্থা।
ইতালি, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়ায়ও বিক্ষোভ : জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইতালি, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়ায়ও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। ইতালির মিলান শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বিলাসবহুল বিপণিবিতান এলাকার মুখোশধারীদের সরিয়ে দেয়। সংঘর্ষের পর কয়েকজন আহত ও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিরাপত্তার কারণে একটি পাতালরেল স্টেশনও বন্ধ রাখা হয়। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস ও পূর্বাঞ্চলীয় লিয়েজ শহরে কয়েকশ বিক্ষোভকারী সমবেত হয়। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ শক্তি প্রয়োগ করে। অন্যদিকে আলবেনিয়ায় সরকারি দুর্নীতি, বেকারত্ব ও শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে জনসমাবেশ সহিংস রূপ নেয়। সব মিলিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সে এই অসন্তোষ ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নিলেও পর্তুগালসহ অন্যান্য দেশে আবাসন ও অর্থনৈতিক অধিকার ঘিরে প্রতিবাদ জোরালো হচ্ছে। পরিস্থিতির তাৎপর্য হলো, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এখন কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক অসন্তোষ ও রাজনৈতিক চাপেরও বড় উৎস হয়ে উঠেছে। সরকারগুলো দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে এই ক্ষোভ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
