পহেলা আগস্ট, শনিবার। ফজরের নামাজ শেষ হতেই ভোরের আকাশে আলো ছড়াতে শুরু করেছে। বালুঘাট মোড়ে একে একে জড়ো হতে থাকেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট যুব বিভাগের ২০ জন তরুণ। যাত্রার আগে হাত তুলে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে নিরাপদ সফর, ঈমানি আনন্দ ও কল্যাণের জন্য দোয়া করা হয়। দোয়া শেষে সবার মুখে ভেসে ওঠে নতুন উদ্দীপনা। আজ গন্তব্য পদ্মাপাড়ের মাওয়া।
দুটি প্রাইভেট কার প্রস্তুত। একটি সিনিয়রদের জন্য, অন্যটি জুনিয়রদের। সিনিয়রদের গাড়িতে ছিলেন শাহজালাল, বেলায়েত, সজীব, আরাফাত, রায়হান, মুন্না, রিফাত, আকাশ ও সামাত। জুনিয়রদের গাড়িতে ছিলেন মো. সুমন, তন্ময়, মুশফিক, মমিনুল, মাসুম বিল্লাহ, জিহান, রনি, জহির ও আলামিন। আর হাসান মোটরসাইকেলে আলাদাভাবে রওনা দেন।
বিজ্ঞাপন
ইঞ্জিনের শব্দের সঙ্গে শুরু হয় ইসলামি গজলের সুর। কখনো হামদ, কখনো নাত, কখনো অনুপ্রেরণামূলক গজল—পুরো পথ ইবাদতের অনুভূতি আর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ভরে ওঠে। জানালার বাইরে ছুটে চলা সবুজ মাঠ, গ্রামবাংলার কাঁচা-সবুজ দৃশ্য আর ভোরের নির্মল আলো যাত্রাটিকে আরো মোহনীয় করে তোলে।
সকাল ৮টার দিকে জুনিয়রদের গাড়ি পৌঁছে যায় মাওয়ার পুরোনো ফেরিঘাটে। সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন সুমনের শ্বশুর সম্মানিত সালাম হুজুর। তিনি পুরোনো ফেরিঘাট জামে মসজিদের ইমাম এবং মাওয়া রিসোর্টের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তন্ময় ফোন করে জানতে পারেন, সিনিয়রদের গাড়ি প্রায় এক ঘণ্টা পিছিয়ে আছে। এরই মধ্যে হাসানও মোটরসাইকেলে চলে আসেন।
সিদ্ধান্ত হলো, সবাই একসঙ্গে নাশতা করবেন। তাই অপেক্ষার সময়টুকু নষ্ট না করে দলটি বেরিয়ে পড়ে পদ্মার তীর ঘুরে দেখতে। বিশাল পদ্মা, দূর পর্যন্ত বিস্তৃত জলরাশি, মাঝিদের ব্যস্ত নৌকা, বাতাসে ভেসে আসা নদীর সোঁদা গন্ধ আর বিখ্যাত মাওয়ার ইলিশবাজার—সব মিলিয়ে জীবন্ত এক জলরঙের ছবি। শীতল বাতাস মুখে এসে লাগতেই সবার ক্লান্তি মিলিয়ে যায়।
সিনিয়রদের গাড়ি এসে পৌঁছালে সবাই একসঙ্গে সকালের নাশতা সেরে নেন। সিলেট হোটেলের ধোঁয়া ওঠা ভুনা খিচুড়ি, নরম গরুর মাংস, সুস্বাদু আলুভর্তা আর কোমল পানীয়—ভ্রমণের শুরুতেই যেন উৎসবের আয়োজন। সঙ্গে ছিল বিকালের নাশতার জন্য আপেল, কলা, ক্রিম রুটি, পর্যাপ্ত খাবার পানি এবং সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ৩২ কেজি ওজনের বিশাল এক কাঁঠাল।
নাশতার পর দলটি রওনা হয় মাওয়া রিসোর্টের দিকে। সালাম হুজুরের সহযোগিতায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ খেলাধুলার ব্যবস্থা করে দেয়। রিসোর্টে ঢুকেই সবাই মুগ্ধ হন। চারদিকে আম, জাম, পেয়ারা ও নানা ধরনের ফলজ ও ঔষধি গাছের সারি। ফুলে সাজানো পথ, পানির ওপর কাঠের সাঁকো, সুইমিংপুল এবং একপাশে ছোট্ট চিড়িয়াখানা—মাঠজুড়ে সবুজ ঘাস আর নির্মল পরিবেশ মনকে প্রশান্ত করে দেয়।
পাঁচ নম্বর খেলার মাঠে শুরু হয় আনন্দের আসর। প্রথমে হাঁড়িভাঙা প্রতিযোগিতা হাসি, উল্লাস আর করতালিতে মুখরিত করে তোলে চারপাশ। এ খেলায় প্রথম হন মমিনুল। এরপর অনুষ্ঠিত হয় ‘নেতা যা বলেন’ খেলা। এখানেও মমিনুল তার বুদ্ধি ও তৎপরতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন।
সবশেষে জমে ওঠে বহুল প্রতীক্ষিত ফুটবল ম্যাচ—সিনিয়র বনাম জুনিয়র। দুই দলের প্রাণপণ লড়াই আর দর্শকদের করতালিতে মাঠ হয়ে ওঠে রোমাঞ্চে ভরা। শেষ পর্যন্ত এক গোলের ব্যবধানে জয় তুলে নেয় সিনিয়রদের দল। হার-জিতের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানান।
এরপর সবাই অটোরিকশায় চড়ে আবার চলে যান পদ্মার তীরে। স্বচ্ছ, শীতল পানির ডাক কেউ উপেক্ষা করতে পারেননি। মুহূর্তেই নদীতে নেমে পড়েন যুবকরা। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তারা সাঁতার কাটেন, পানির মধ্যে ভলিবল খেলেন, দৌড়ান, ছিটিয়ে দেন আনন্দের জলছাপ।
গোসল শেষে সবাই মিলে জোহরের নামাজ আদায় করেন। ইমামতি করেন যুবক সুমন। নদীর পাড়ের শান্ত মসজিদে জামাতে নামাজ আদায়ের সেই মুহূর্ত ভ্রমণের আনন্দকে ইবাদতের প্রশান্তিতে রূপ দেয়।
নামাজ শেষে সবাই নতুন ফেরিঘাটের পদ্মা হোটেলের উদ্দেশে রওনা হন। শুরু হয় দুপুরের ভোজের আয়োজন। গরম ভাত, টাটকা পদ্মার ইলিশ, মাছের ডিম, ইলিশের লেজভর্তা, বেগুন ভাজি, ভুনা ডাল ও তাজা সালাদ—সব মিলিয়ে এক রাজকীয় আপ্যায়ন।
খাওয়া শেষে সবাই আসরের নামাজ আদায় করেন। এরপর শুরু হয় নৌকাভ্রমণ। মাত্র ২ হাজার টাকায় ৪০ মিনিটের জন্য একটি নৌকা ভাড়া করা হয়। যাত্রা শুরু হয় নতুন ফেরিঘাট থেকে, গন্তব্য পুরোনো ফেরিঘাট।
নৌকা যখন পদ্মার বুক চিরে এগিয়ে চলছিল, তখন উত্তাল ঢেউ এসে বারবার নৌকার গায়ে আছড়ে পড়ছিল। মাথার ওপর বিশাল পদ্মা সেতু, দূরে ডুবতে থাকা লাল সূর্য, নদীর বুকজুড়ে সোনালি আলোর ঝিলিক—প্রকৃতি যেন নিজেই এক অনন্য কাব্য রচনা করছিল। কেউ ছবি তুলছিলেন, কেউ ভিডিও করছিলেন, কেউ আবার নিঃশব্দে নদীর সৌন্দর্যে হারিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত ব্যস্ততা পদ্মার ঢেউয়ের সঙ্গে কোথায় যেন ভেসে গেছে।
সন্ধ্যা নামতেই ঢাকার পথে যাত্রা শুরু হয়। মাঝপথে মাগরিবের নামাজের বিরতি। সবাই জামাতে নামাজ আদায় করেন, ইমামতি করেন সুমন। এরপর আবার পথচলা। কিছু দূর গিয়ে শেষবারের মতো নাশতার আয়োজন করা হয়—আপেল, কলা, ক্রিম রুটি আর ঠান্ডা পানি। দীর্ঘ সময়ের ক্লান্তি থাকলেও সবার মুখে তখনো আনন্দের হাসি।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে বহরটি নিরাপদে মানিকদিতে ফিরে আসে। গাড়ি থেকে নামার সময় কারো মুখে ক্লান্তির ছাপ নেই; বরং সবার মনে একটাই অনুভূতি—দিনটি খুব দ্রুত শেষ হয়ে গেল। পদ্মার ঢেউ, ইলিশের স্বাদ, খেলাধুলার হাসি, নদীর শীতল জল, নৌকার দোলা আর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন—সব মিলিয়ে ‘মাওয়ার আনন্দভ্রমণ ২০২৬’ হয়ে রইল জীবনের স্মৃতির পাতায় লেখা এক অনন্য অধ্যায়।
