১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন এবং ঔপনিবেশিক আমলের বিভিন্ন বিধিবিধান বহাল থাকে। ফলে রাষ্ট্র বদলালেও পুলিশ ও নির্বাহী কর্তৃপক্ষের সম্পর্কের মৌলিক কাঠামো একই রকম থেকে যায়।
দেশের নাগরিকের নিরাপত্তা, অধিকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাংলাদেশ পুলিশ। অথচ বাহিনীটির আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর বড় অংশের শিকড় এখনো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলের। দেড় শতাব্দীরও বেশি পুরনো পুলিশ আইন এবং নির্বাহী কর্তৃত্বনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে পুলিশ ব্যবহারের প্রবণতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ। স্বাধীনতার পর একাধিকবার সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হলেও উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঔপনিবেশিক আমলের মৌলিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসেনি। ফলে জনমুখী, পেশাদার ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ গড়ে তোলার উদ্যোগ বারবারই থমকে গেছে।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে ভারতবর্ষের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের হাতে যায়। রানি ভিক্টোরিয়ার শাসনামলে ঔপনিবেশিক প্রশাসন ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৮৬০ সালের ১৭ আগস্ট এমএইচ কোর্টের নেতৃত্বে প্রথম পুলিশ কমিশন গঠন করেন লর্ড ক্যানিং। ১৮৬১ সালের ২২ মার্চ ব্রিটিশ ভারতের ঔপনিবেশিক সরকার ‘দ্য পুলিশ অ্যাক্ট, ১৮৬১’ প্রণয়ন করে। আইনটির প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা এবং বিদ্রোহ বা জনঅসন্তোষ দমনে সক্ষম সংগঠিত বাহিনী গড়ে তোলা।
ফলে এ আইনের মাধ্যমে যে পুলিশি কাঠামো তৈরি হয়, তা মূলত ঔপনিবেশিক সরকারের কর্তৃত্ব ও শাসন ব্যবস্থা রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এ ব্যবস্থায় পুলিশের জবাবদিহি জনগণের কাছে নয়, বরং নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কাছে কেন্দ্রীভূত ছিল। স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যাশিত নাগরিককেন্দ্রিক, সেবামুখী ও জবাবদিহিমূলক পুলিশিংয়ের ধারণার সঙ্গে এ কাঠামোর মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ‘পুলিশ রেগুলেশনস, বেঙ্গল, ১৯৪৩’ প্রণয়ন করা হয়। এতে থানার কার্যক্রম, তদন্ত, গ্রেফতার, রেকর্ড সংরক্ষণ, শৃঙ্খলা, দায়িত্ব বণ্টন এবং দৈনন্দিন পুলিশি কাজের বিস্তারিত পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। ফলে ১৮৬১ সালের আইনে প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর প্রশাসনিক ও কার্যগত দিকগুলো আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন এবং ঔপনিবেশিক আমলের বিভিন্ন বিধিবিধান বহাল থাকে। ফলে রাষ্ট্র বদলালেও পুলিশ ও নির্বাহী কর্তৃপক্ষের সম্পর্কের মৌলিক কাঠামো একই রকম থেকে যায়। যে কারণে ঔপনিবেশিক কাঠামোর উত্তরাধিকারও পুরোপুরি কাটানো সম্ভব হয়নি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ঔপনিবেশিক কাঠামো বহাল রেখে পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা একেবারেই সম্ভব নয় বলে মনে করেন সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০০৬ সাল থেকেই পুলিশ সংস্কারের প্রস্তাব প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ সংস্কার প্রস্তাব পুলিশ নিজেরাই তৈরি করেছিল। সে সময় ইউএনডিপির একটি সংস্কার প্রকল্পের আওতায় আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। মঈনুদ্দীন-ফখরুদ্দীন সরকারের সময় ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের পরিবর্তে ২০০৮ সালের পুলিশ সংস্কার আইনের একটি খসড়া তৈরি করা হয়। এতে মানবাধিকার সুরক্ষা, পুলিশ কমপ্লেইন কমিশন গঠনসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব ছিল। পুলিশের কার্যক্রমে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের জন্য শাস্তির প্রস্তাবও রাখা হয়েছিল। পুলিশকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখার বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। আইনটির বিষয়ে মতামত নিতে সেটি জেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়। সে সময় ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ আইনটি বাস্তবায়নের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কার্যত হিমাগারে চলে যায়।’ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় পুলিশ সংস্কারের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত গুরুত্ব পায়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সংস্কারের বিষয় গুরুত্ব পেলেও পুলিশ সংস্কারের বিষয়টি একেবারেই গুরুত্বহীন থেকে যায়।’
স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে পুলিশের আইন সংস্কারের প্রস্তাব, কমিশন গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৯৭৮ সালে একটি পুলিশ কমিশন গঠন করা হয়। এরপর ১৯৮৬ সালে তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক তৈয়ব উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে আরেকটি কমিশন এবং ১৯৮৮ সালে বিচারপতি আমিনুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশ কমিশন গঠন করা হয়। বিচারপতি আমিনুর রহমানের কমিশন ৩২৮ পৃষ্ঠার দুই খণ্ডের প্রতিবেদন দেয় এবং প্রায় ২০০টি সুপারিশ করে। কমিশন পুলিশ সদর দপ্তরকে চারটি অধিদপ্তরে পুনর্গঠন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পৃথক ‘পুলিশ বিভাগ’ প্রতিষ্ঠা, নতুন থানা স্থাপন, বিশেষায়িত ইউনিট গঠন এবং পুলিশ স্টাফ কলেজ প্রতিষ্ঠারও সুপারিশ করে।
পুলিশ সংস্কারে আরেকটি উদ্যোগ আসে ২০০৭ সালে। নতুন পুলিশ অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করা হয়। এতে পুলিশের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ কমানো, নিয়োগ-পদায়ন ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, স্বাধীন পুলিশ কমিশন এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে পৃথক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু খসড়াটি আইনে পরিণত হয়নি। ২০১৩ সালে পতিত আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের আমলেও পুলিশ অধ্যাদেশের খসড়া নিয়ে আবার কাজ করা হয়। সেটিও শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি।
পুলিশ সংস্কারে বড় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ছিল ইউএনডিপি ও যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগের সহায়তায় পরিচালিত পুলিশ সংস্কার কর্মসূচি। ২০০৫ সালের শেষ দিকে এর প্রথম পর্যায় শুরু হয়ে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে, পরে দ্বিতীয় পর্যায় ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এসব উদ্যোগ পুলিশের কিছু ক্ষেত্রে উন্নয়ন আনলেও আইন ও বিধিমালা সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, সক্ষমতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি দমন, কমিউনিটি পুলিশিংসহ কয়েকটি মৌলিক ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকেই যায়।
পুলিশে সর্বশেষ বড় সংস্কারের উদ্যোগ আসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন গণ-আন্দোলনে রূপ নিলে তা দমনে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক বলপ্রয়োগ করে। এছাড়া নির্বিচার গ্রেফতার, আটক ও নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে।
আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের প্রায় ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে সমালোচক ও রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার গ্রেফতার, নজরদারি ও নির্যাতনের মতো কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর স্বাধীন নজরদারি ও জবাবদিহির প্রতিষ্ঠানগুলোও দুর্বল হয়েছে। আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান ভরকেন্দ্র ছিল পুলিশ। এ প্রেক্ষাপটেই ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিগত অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন এবং ঔপনিবেশিক আমলের বিধিবিধানের বড় অংশ বহাল থাকায় পুলিশ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জনমুখী ও স্বাধীনভাবে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেনি। সাবেক পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে সুপারিশও করেছি। একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের পক্ষে চেষ্টা করেছি। স্বাধীন কমিশন না হলে পুলিশকে কখনই পুরোপুরি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা সম্ভব হবে না। এজন্য সংবিধানেও সংশোধন আনতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব চাইলে এ সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব। সংবিধানসহ রাষ্ট্রের সামগ্রিক কাঠামোর সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের সম্পর্ক রয়েছে। তাই পুলিশকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করতে হলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।’
সাবেক পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে ঔপনিবেশিক আমলের আইনি কাঠামোর সংস্কারকে পুলিশ সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশকে জনবান্ধব ও জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে এ আইনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা পরিমার্জন করতে হবে; প্রয়োজনে সম্পূর্ণ নতুন আইনও প্রণয়ন করা যেতে পারে। একইভাবে ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গলের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিধান পরিবর্তন, পরিমার্জন বা নতুন বিধিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশন ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধিরও প্রয়োজনীয় সংশোধনের কথা বলেছে, বিশেষ করে বলপ্রয়োগ ও মানবাধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে।
প্রতিবেদনে পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগ, গ্রেফতার, তল্লাশি, জিজ্ঞাসাবাদ, মানবাধিকার সুরক্ষা, জবাবদিহি, নিয়োগ-পদায়ন, তদন্ত, জনবান্ধব পুলিশিংসহ বিস্তৃত ক্ষেত্রে সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। বিশেষ করে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ও ১৬৭ ধারা সংস্কার, গ্রেফতার ও রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা কার্যকর এবং আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় স্বচ্ছ কাচের ঘেরাটোপসংবলিত পৃথক কক্ষ রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পাঁচ ধাপে বলপ্রয়োগের নীতিমালা এবং বিচার প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে কাউকে গণমাধ্যমের সামনে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন না করার সুপারিশও রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সরাসরি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষমতা দেয়ার জোর সুপারিশ করেছে কমিশন।
এছাড়া পুলিশের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়াতে পৃথক পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য পোষণ করে সংস্কার কমিশন। নিয়োগ, পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, পুলিশ ভেরিফিকেশনে রাজনৈতিক মতাদর্শ যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা বাতিল, নারী পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি, কমিউনিটি পুলিশিং শক্তিশালী করা এবং পুলিশ সদস্যদের কর্মপরিবেশ, আবাসন, ছুটি ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও সংস্কারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। কমিশনের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণেও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহার এবং রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বাহিনীর অপব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুলিশের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে এখনো ঔপনিবেশিক আমলের আইন ও বিধিবিধানের প্রভাব রয়ে গেছে। পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গল (পিআরবি) এবং ফৌজদারি কার্যবিধিও (সিআরপিসি) ঔপনিবেশিক শাসনামলের উত্তরাধিকার বহন করছে। মানুষের প্রত্যাশা ছিল, পুলিশ সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে এ কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আসবে। কমিশন অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশও করেছে। কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন না হওয়ায় পুরনো কাঠামোই বহাল রয়েছে। ফলে পুলিশকে এখনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। একটি স্বাধীন ও পেশাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশ দাঁড়াতে পারছে না।’
পুলিশ সংস্কার কমিশনের সব সুপারিশ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলেও জরুরি ভিত্তিতে স্বাধীন তদারকি কমিটি গঠন করা প্রয়োজন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ কমিটি পুলিশের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে, পুলিশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অনুসন্ধান করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন দেবে। এর মাধ্যমে পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার পথ তৈরি হতে পারে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের কারণে যখন যে দল রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তার হয়েই কাজ করে পুলিশ। নিয়োগ, পদায়ন, বদলি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বহাল থাকায় ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে বাহিনীকে পুরোপুরি মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে পুলিশও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে জনমুখী হয়ে উঠতে পারছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঔপনিবেশিক শাসনামলে সরকারের ইচ্ছা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে পুলিশকে কাঠামোগতভাবে ব্যবহার করা হতো। স্বাধীনতার পরও সে প্রভাব থেকে পুলিশকে বের করে আনা হয়নি। ফলে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই জনগণের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অতীতে কোনো কোনো সরকার নতুন পুলিশ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আমাদের প্রত্যাশা, বর্তমান সরকার পুলিশের জন্য নতুন ও সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন করবে। সরকারের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক হতে হবে সমন্বয় ও আইনি দায়িত্বের ভিত্তিতে, কেবল আদেশ পালনের ভিত্তিতে নয়। পুলিশকে স্বাধীনভাবে ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে।’
