বরিশালের উজিরপুরে এক হিন্দু পরিবারের বাড়ি ও মন্দিরসংলগ্ন সম্পত্তি দখলের অভিযোগ উঠেছে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান শেখের বিরুদ্ধে। বাড়িসংলগ্ন মন্দিরের পাকা ফটকে ‘খান বাড়ি’ লিখে প্লাস্টার করে দিয়েছেন তিনি।
ভুক্তভোগী বরুণ মিত্র দাবি করেন, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ সদস্য, বিএনপি নেতাসহ থানা পুলিশের দ্বারস্থ হয়েও তিনি প্রতিকার পাননি। আগে সাধারণ ডায়েরি করেও ফল না পাওয়ায় গতকাল রোববার উজিরপুর মডেল থানায় আবার লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
উজিরপুর মডেল থানার ওসি রকিবুল ইসলাম অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে বরুণ মিত্র উজিরপুর কেন্দ্রীয় কীর্তন আঙিনা ও শ্রীগুরু মন্দিরসংলগ্ন ৪ শতক জমি কিনে সেখানে দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন। ভবনের একাংশ ভাড়া দিয়ে অপর অংশ মন্দিরের ব্যবহারের জন্য দান করেন। প্রতি বছরের বার্ষিক কীর্তন উপলক্ষে মন্দির কর্তৃপক্ষ ভবনের ওই অংশ ব্যবহার করে আসছে।
বরুণ মিত্র জানান, ২০২৪ সালের শুরুতে পারিবারিক ও ব্যবসায়িক কারণে তিনি বরিশাল নগরীতে বসবাস শুরু করেন। তার অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নুরুজ্জামান শেখ দলবল নিয়ে তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল লুট করেন। পরে ভাড়াটিয়াদের মারধর করে বের করে দিয়ে বাড়িটি দখলে নেন।
বরুণ মিত্র আরো বলেন, তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে উজিরপুর সার্বজনীন কেন্দ্রীয় কীর্তন আঙিনা ও শ্রীগুরু মন্দিরের সভাপতি। মন্দিরের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও আগত ভক্তদের সুবিধার্থে ভবনের একটি অংশ ব্যবহারের জন্য তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বরাদ্দ করেছিলেন।
তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। উপজেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। বরং অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন।
বরুণ মিত্র আরো বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত আবেদন করা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। জমির দলিল, বিএস পর্চা ও খাজনাসহ সব কাগজপত্র তার নামে থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের ভূমিকা তাকে হতাশ করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান বলেন, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির বৈধ ক্রেতা বরুণ মিত্র। একই খতিয়ানের ৮২ শতক জমি ১২টি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে রয়েছে। ৫ আগস্টের অস্থিরতার সুযোগে নুরুজ্জামান শেখ বাড়িটি দখলে নেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মিজানুর রহমানের দাবি, জবরদখলের পরও প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া উদ্বেগজনক। তার ভাষ্য, নুরুজ্জামান শেখের কর্মকাণ্ডে স্থানীয় মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন।
উজিরপুর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রোকনুজ্জামান টুলু বলেন, বরুণ মিত্রের বাড়ি অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছে। দলের নাম ব্যবহার করে এমন কর্মকাণ্ডে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এতে কিছু নেতার উৎসাহও দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রোকনুজ্জামান টুলু জানান, বাড়ি ও মন্দিরসংলগ্ন জমি দখলের বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
তার অভিযোগ, নুরুজ্জামান শেখ এলাকার চিহ্নিত ভূমিদস্যু। এর আগে উজিরপুর মহিলা কলেজের জমি দখলের চেষ্টা করেছিলেন। এখন মন্দিরসংলগ্ন স্থাপনায় ‘খান বাড়ি’ লিখে রেখেছেন। প্রকৃত মালিকদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি দখলের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে নুরুজ্জামান শেখের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
উজিরপুর মডেল থানার ওসি রকিবুল ইসলাম বলেন, তার জানামতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাড়িটি দখল হয়। জমি নিয়ে আদালতে মামলা থাকায় পুলিশের এখতিয়ার সীমিত।
তিনি আরো বলেন, নতুন অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে সেখানে অভিযোগকারীকে পাওয়া যায়নি বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলী সুজা বলেন, বরুণ মিত্র অনেক আগেই বাড়ি দখলের অভিযোগ করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মধ্যে মতভেদ থাকায় দখলমুক্ত করতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
