ছবির ক্যাপশন: .
>> আরেফিন লিমন, গলাচিপা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
বাংলার আনাচে-কানাচে একসময় হাতে ভাজা মুড়ির সুবাস ছড়িয়ে পড়ত। মাটির চুলায় গরম বালুর মধ্যে ভাজা মুড়ির স্বাদ ও মচমচে ভাব ছিল অনন্য। কিন্তু কালের বিবর্তনে এই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন বাজার দখল করে নিয়েছে মেশিনে তৈরি মুড়ি, যা অপেক্ষাকৃত সস্তা ও সহজলভ্য। ফলে হাতে ভাজা মুড়ির কারিগররা একের পর এক পেশা বদলে নিচ্ছেন, আর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে এই শিল্প।
পটুয়াখালীর গলাচিপা পৌর শহরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের শাহা বাড়ি একসময় হাতে ভাজা মুড়ির জন্য বিখ্যাত ছিল। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এই এলাকার মানুষ মুড়ি ভাজাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিল। রমজান মাস এলেই এই মুড়ির চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যেত।
শাহা বাড়ির কারিগরদের রাত-দিন পরিশ্রমের ফল ছিল মচমচে, সুগন্ধি, হাতে ভাজা মুড়ি, যা দূর-দূরান্তের পাইকাররা কিনে নিয়ে যেতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্য বদলে গেছে।
একসময় এই এলাকায় ২০-৩০টি পরিবার মুড়ি ভাজার কাজ করত। কিন্তু এখন এই সংখ্যাটা কমে মাত্র ৫-৬টি পরিবারে এসে ঠেকেছে। বাকিরা কৃষিকাজ, রিকশাচালনা বা ছোটখাট ব্যবসায় নেমে পড়েছেন।
প্রবীণ মুড়ি কারিগর নিতাই শাহা বলেন,
"আগে মুড়ির এত চাহিদা ছিল যে সারারাত জেগেও বানিয়ে শেষ করা যেত না। কিন্তু এখন পাইকাররা কম দামে মেশিনের মুড়ি কিনে নেয়। ফলে হাতে ভাজা মুড়ির বাজার প্রায় শেষ হয়ে গেছে।"
এখনো যারা এই শিল্প আঁকড়ে ধরে আছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চায়না সাহা ও সন্ধ্যা রানী। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
চায়না সাহা বলেন, "আগে দিনে ১০-১৫ মণ মুড়ি ভাজা হতো, এখন সেটা নেমে এসেছে ২-৩ মণে। মেশিনের মুড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
সন্ধ্যা রানী বলেন, "হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদ আলাদা, কিন্তু দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতারা মেশিনের মুড়ির দিকেই ঝুঁকছেন। সরকার যদি কিছু সহায়তা দিত, বাজার তৈরি করে দিলে তাহলে হয়তো এই পেশা টিকিয়ে রাখা যেত।"
স্থানীয় মুড়ি ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান জানান,
"আমরা হাতে ভাজা মুড়ি বিক্রি করতে চাই, কারণ এর স্বাদ ও গুণগত মান মেশিনের মুড়ির চেয়ে ভালো। কিন্তু ক্রেতারা দাম কম হওয়ার কারণে মেশিনের মুড়ির দিকেই বেশি ঝুঁকছেন। ফলে হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে।"
গলাচিপা মহিলা ডিগ্রি কলেজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মো. হারুন অর রশীদ বলেন, "হাতে ভাজা মুড়ি সুস্বাদু খাবার, এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ। সঠিক বাজারব্যবস্থা ও সরকারি সহায়তা পেলে এই শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব।"
সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদ ও গুণগত মান মেশিনের মুড়ির চেয়ে অনেক ভালো। তবে এটি সংরক্ষণ ও বিপণনের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন কিংবা সমবায় সমিতির মাধ্যমে যদি এই শিল্পকে সহায়তা দেওয়া হয়, তাহলে এটি টিকে থাকতে পারে।
হাতে ভাজা মুড়ি শুধু একটি খাদ্য নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতির অংশ। যদি সময়মতো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে হাতে ভাজা মুড়ি কেবল স্মৃতির পাতায় ঠাঁই পাবে।
