ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের লাগাতার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রহানায় চরম নিরাপত্তা-সঙ্কটের মুখে পড়েছে সৌদি আরব। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে ৪১ বছর বয়সি সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনকে কড়া নিরাপত্তায় একাধিক বাঙ্কার-সুবিধাযুক্ত রাজপ্রাসাদে দফায় দফায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক প্রতিবেদনে এই দাবি করা হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচির পর থেকে যুবরাজকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত একটি বাহিনী তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে।
অন্য দিকে, শনিবার পর্যন্ত রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রাখার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির জেরে আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদির সমস্ত উড়ান বাতিল করেছে ভারতের শীর্ষ বিমানসংস্থা ‘ইন্ডিগো’, ‘এয়ার ইন্ডিয়া’, ‘এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস’ এবং ‘আকাশ এয়ার’।
ভারতীয় বিমান বাতিল
ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং নিরাপত্তা-ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে ভারতের বৃহত্তম বিমানসংস্থা ইন্ডিগো জানিয়েছে, আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদ, জেদ্দা, দাম্মাম ও মদিনাগামী সমস্ত উড়ান বাতিল থাকবে। যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। একই ভাবে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদ ও জেদ্দার সমস্ত উড়ান স্থগিত করেছে আকাশ এয়ার। ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের টিকিটের টাকা সম্পূর্ণ ফেরত বা বিনামূল্যে যাত্রার তারিখ বদলের সুযোগ দিচ্ছে তারা। এয়ার ইন্ডিয়াও জানিয়েছে রিয়াদ, দাম্মাম ও জেদ্দাগামী সমস্ত উড়ান ওই তারিখ পর্যন্ত বাতিল থাকবে।
বিমানবন্দরে দফায় দফায় হামলা
গত এক দশকের মধ্যে সৌদিতে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি ঘটে গত শনিবার। বিমানবন্দরে হুথিদের ওই হামলায় ভারতীয় নাগরিক ইউসুফ আলি ছাড়াও চার জন সৌদি নাগরিক, দুই বাংলাদেশি, এক জন মার্কিন, এক প্যালেস্টাইনি এবং মিশর, জর্ডন, সিরিয়া ও সুদানের এক জন করে নাগরিক-সহ অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি আহত হন। হামলার জেরে টার্মিনাল-৪-এ বিধ্বংসী আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এর পর রবিবারেও একটি পৃথক হামলায় এক জনের মৃত্যু হয় ও ১১ জন আহত হন।
গত পাঁচ দিনে চার বার এই বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে হুথিরা। হুথিদের এক মুখপাত্র দায় স্বীকার করে স্পষ্ট জানিয়েছেন, সৌদির বিমানবন্দরগুলিতে হামলা জারি থাকবে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে শনিবার পর্যন্ত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি অসামরিক বিমান পরিবহণ কর্তৃপক্ষ। উড়ান গবেষণাসংস্থা ‘সিরিয়াম’-এর তথ্য অনুযায়ী, অচলাবস্থার জেরে রিয়াদের প্রায় ৬০ শতাংশ নির্ধারিত উড়ান বাতিল করতে হয়েছে। মার্কিন সংস্থা ‘ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান নিরাপত্তাসংস্থা ‘ইএএসএ’ সৌদির আকাশপথ ব্যবহারে চূড়ান্ত সতর্কতা জারি করেছে।
ভারতও এই হামলার তীব্র নিন্দা করে জানিয়েছে, সাধারণ নাগরিক ও পরিকাঠামোর উপর এই ধরনের হামলা কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সৌদিতে থাকা ভারতীয়দের সতর্ক থাকার ও প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না-বেরোনোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ
হুথিদের এই আক্রমণের জবাবে সৌদির জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আব্দুল আজ়িজ় বিন সলমন হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, হামলার ভয়াবহতা অনুযায়ী সৌদির প্রতিক্রিয়াও সমপর্যায়ের হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদির বিমানহামলায় সরাসরি যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে আমেরিকা।
তবে রিয়াদের আধিকারিকেরা গোপনে স্বীকার করছেন, মুহুর্মুহু হামলা রুখতে গিয়ে তাঁদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের (ইন্টারসেপ্টর) মজুত কার্যত ফুরিয়ে আসছে। ঘাটতি মেটাতে ফ্রান্স, ব্রিটেন, পাকিস্তান ও মিশরের কাছে জরুরি সামরিক সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে স্বয়ং আমেরিকার নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডারেও টান পড়েছে।
সংঘাতের নেপথ্যে
২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরব সরাসরি হস্তক্ষেপ করার পর থেকেই মূলত হুথিদের সঙ্গে এই লড়াইয়ের সূচনা। দীর্ঘদিন পর ২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। কিন্তু গত জুলাইয়ে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হতেই সেই শান্তি ভেস্তে যায়। ইয়েমেনের সানা বিমানবন্দর থেকে হুথি প্রতিনিধিদের নিয়ে তেহরানগামী এক ইরানি বিমানে সৌদি বাহিনী গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠার পর থেকেই পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে।
সংঘাত কমাতে রবিবার রাতে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও সৌদির বিদেশমন্ত্রীর মধ্যে ফোনে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। সামরিক আগ্রাসন এড়িয়ে রিয়াদকে রাজনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটার বার্তা দিয়েছে তেহরান। পাশাপাশি ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এই লড়াইয়ের ফলে আরব উপদ্বীপে অস্থিরতা বাড়ছে এবং এতে লাভবান হচ্ছে একমাত্র ইজ়রায়েল।
ভারতীয় দূতাবাসের নির্দেশিকা
সাম্প্রতিক পরিস্থিতির জেরে রিয়াদে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের জারি করা নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, হামলায় নিহত মহম্মদ ইউসুফ আলির শেষকৃত্য পরিবারের ইচ্ছানুযায়ী গতকাল রিয়াদেই সম্পন্ন হয়েছে। আহত ভারতীয়দের মধ্যে বর্তমানে ৪ জন আইসিইউ-তে এবং ৪ জন সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, এবং ৩ জনকে ইতিমধ্যেই হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে তাঁদের খোঁজখবর নিয়েছেন দূতাবাসের আধিকারিকেরা। উড়ান বাতিলের জেরে আটকে পড়া ভারতীয়দের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও দেশে ফেরা না পর্যন্ত কোনও জরিমানা দিতে হবে না বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত এয়ার ইন্ডিয়া, এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস, আকাশ এয়ার এবং ইন্ডিগোর উড়ান বাতিল থাকার কথা উল্লেখ করে প্রবাসী ভারতীয়দের জরুরি সহায়তার জন্য দূতাবাসের তরফে একটি ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। টেলিফোন নম্বর +৯৬৬-১১-৪৮৮৪৬৯ এবং টোল-ফ্রি নম্বর ৮০০২৪৭১২৩৪ (শুধুমাত্র সৌদির ভিতর থেকে কল করার জন্য)। এ ছাড়া, +৯৬৬-৫৩৬২১৬০৮২ নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপ (শুধুমাত্র মেসেজ) এবং cw.riyadh@mea.gov.in ইমেল আইডিতেও যোগাযোগ করতে পারবেন আটকে পড়া ভারতীয়রা।
