কালবেলা · সাধারণ
‘আমি কী নিয়ে বাঁচব রে, আমার তো কেউ রইল না’
২৪/১০/২০২৬

‘আমি কী নিয়ে বাঁচব রে? কে আমাদের দেখবে? আমার তো এই পৃথিবীতে আর কেউ রইল না রে।’- স্বামী ও ছেলেকে হারিয়ে বুক চাপড়ে এভাবেই বিলাপ করছিলেন লক্ষ্মী রানী। কখনো চিৎকার করে কাঁদছেন, কখনো শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছেন। স্বামী-সন্তানের মৃত্যুর খবর যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। চারপাশে স্বজনদের কান্না, আহাজারি আর শোকের মাতম। যে সংসারে স্বামী ও সন্তানকে ঘিরে ছিল তার বেঁচে থাকার স্বপ্ন, সেই সংসারেই এক মুহূর্তে নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার।
গাজীপুরের টঙ্গীতে সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের বাবা ও ছেলের মৃত্যুতে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে পরিবারটি। শনিবার (২৪ অক্টোবর) ভোরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী পূর্ব থানাধীন গাজীপুরা এলাকায় দ্রুতগতির একটি ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারান তপন চন্দ্র দাস (৫০) ও তার ছেলে লিখন চন্দ্র দাস (২০)।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলেই মারা যান ছেলে লিখন। গুরুতর আহত বাবা তপন চন্দ্র দাসকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তারও মৃত্যু হয়।
পূজা শেষ করে জামালপুর থেকে টঙ্গীতে ফিরছিলেন বাবা-ছেলে। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। বাড়িতে তাদের অপেক্ষায় থাকা স্বজনেরা হয়তো ভেবেছিলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবেন পরিবারের প্রিয় দুই মানুষ। অথচ তাদের ঘরে জীবিত অবস্থায় আর ফেরা হলো না। আনন্দ শেষে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা শেষ হলো দুটি প্রাণহানি আর একটি পরিবারের কান্নার মধ্য দিয়ে।
স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে লক্ষ্মী রানীর কান্না থামছেই না। শোকে বারবার চিৎকার করে উঠছেন তিনি। তার বিলাপ শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না আশপাশের স্বজনরাও। জীবনের দীর্ঘ পথ একসঙ্গে পাড়ি দেওয়া স্বামী এবং সন্তান- দুজনকেই হারিয়ে এখন তিনি অসহায়।
লক্ষ্মী রানীর সেই আর্তনাদ, ‘আমি কী নিয়ে বাঁচব রে? কে আমাদের দেখবে? আমার তো এই পৃথিবীতে আর কেউ রইল না রে’- শুধু একজন স্বামীহারা স্ত্রীর কিংবা সন্তানহারা মায়ের কান্না নয়; এটি মুহূর্তে সবকিছু হারিয়ে ফেলা একজন মানুষের অসহায়ত্বের প্রকাশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত তপন চন্দ্র দাস ও তার ছেলে লিখন চন্দ্র দাস হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তাদের গ্রামের বাড়ি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার কৈবর্তপাড়া এলাকায়। তারা গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন গাজীপুরা ২৭ নম্বর চৌরাস্তা এলাকায় বসবাস করতেন।
পরিবারের সদস্য লিখা রানী জানান, পূজা শেষ করে তার বাবা ও ভাই জামালপুর থেকে টঙ্গীতে ফিরছিলেন। শনিবার ভোরে গাজীপুরা এলাকায় পৌঁছে রাস্তা পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির একটি ট্রাক তাদের ধাক্কা দেয়। এতে তার ভাই লিখন চন্দ্র দাস ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুরুতর আহত বাবাকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।
তপন চন্দ্র দাস মস্কো কটন মিলে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির প্রিন্টিং বিভাগে অপারেটর হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। কাজের মাধ্যমে সংসারের দায়িত্ব পালন করতেন। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনের পরিশ্রমে গড়ে তুলেছিলেন পরিবারের জীবনযাত্রা।
টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাকসুদুল আলম জানান, শনিবার ভোর সোয়া ৪টার দিকে গাজীপুরা বিআরটি লেনের পূর্ব পাশে কুটুমবাড়ি হোটেলসংলগ্ন মহাসড়কে একটি গাড়ির ধাক্কায় বাবা ও ছেলে গুরুতর আহত হন।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক ছেলে লিখন চন্দ্র দাসকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত তপন চন্দ্র দাসকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
ওসি আরও জানান, নিহত বাবা ও ছেলের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, নিহত বাবা ও ছেলের মরদেহ জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার কৈবর্তপাড়া গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সেখানে তাদের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হবে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗