মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের পর ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আপাতত তিনি তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে নিজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে।
ঢাকা-৬ এলাকায় মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, স্থানীয় মানুষের সমস্যা সমাধানে সক্রিয় থাকা এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র পদে আবারও প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা।
গত ১৯ অক্টোবর রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক। এ সময় দীর্ঘমেয়াদি মাদকবিরোধী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
দিন পর বুধবার (২১ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ঢাকা-৬ আসনে মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
একই দিনে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও মাদক নিয়ন্ত্রণ, পদত্যাগের কারণ ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন তিনি।
ইশরাকের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মন্ত্রিসভার দায়িত্ব ছাড়লেও রাজনীতি থেকে সরে যাবেন না তিনি। মন্ত্রিসভা থেকে সরে আসাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন তারা। তারা মনে করবন, এতে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদার করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নগর নেতৃত্বে ফেরার সম্ভাবনাও উন্মুক্ত হবে।
কেন পদত্যাগ করলেন ইশরাক
গত ১৭ অক্টোবর রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ইশরাকের হাতে পিস্তল দেখা যাওয়ার পর তার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরে ১৮ অক্টোবর গণমাধ্যমে খবর আসে প্রধানমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন।
এরপর ১৯ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন তিনি। নিজের বক্তব্যে ইশরাক জানান, মাদকবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি সরকারের চলমান কার্যক্রম ও ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এমন বিবেচনা থেকেই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন বলেও জানান তিনি।
তার অভিযোগ, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট তুলে না ধরে অস্ত্রের বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইশরাকের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, তিনি শুধু মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করবেন; সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবেন। অর্থাৎ পদত্যাগের মধ্য দিয়ে তিনি নির্বাহী দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেও নির্বাচনী রাজনীতি ও সংসদীয় দায়িত্বে থাকার পথ খোলা রেখেছেন।
মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধই কী নতুন কৌশল
প্রতিমন্ত্রিত্ব ছাড়ার পর ইশরাকের ঘোষিত প্রথম উদ্যোগ ঢাকা-৬ এলাকায় মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি, যা মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে সহযোগিতা করবে এবং প্রশাসনের সহায়তাও নেবে।
ডয়চে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইশরাক বলেন, পুলিশ এককভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। পুলিশের জনবলসংকট, অতীতের সংঘর্ষে ক্ষয়ক্ষতি এবং বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে তিনি জনগণকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
ইশরাকের বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকা-৬ আসনের আওতাধীন পাঁচটি থানাসংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে পুলিশকে সহযোগিতা করতে স্থানীয় বাসিন্দা ও নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তার মতে, শুধু খুচরা পর্যায়ের মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে স্থায়ী সমাধান আসবে না; মাদকের মূল সরবরাহকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
ইশরাকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম রুবেল রাইজিংবিডিকে বলেন, “ঢাকা-৬ এলাকায় মাদকবিরোধী কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ড ও এলাকায় জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি লিফলেট বিতরণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচার চালানো হবে। সাধারণ মানুষকে মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।”
রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে সাবেক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের সঙ্গে ছিলেন এই ছাত্রদল নেতা। তিনি বলেন, “ইশরাক হোসেনের অস্ত্র তাক করার লক্ষ্য ছিল মাদক কারবারি ও মাদকসেবীরা। ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা ছাদে কয়েকজনকে পাথর ও পিস্তল নিয়ে অবস্থান করতে দেখি। এর আগেও সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানে গেলে মাদক কারবারিদের সাথে গুলাগুলি হয়েছে। এ কারণে অভিযানের শুরুতে ইশরাক হোসেন আত্মরক্ষার্থে নিজের লাইসেন্সকৃত পিস্তল বের করে। তবে ইশরাক হোসেন অস্ত্র তাক করার পর তারা দৌড়াতে শুরু করেন।”
ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক আদর্শের কথা তুলে ধরে ওই নেতা বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে তার সঙ্গে রাজনীতি করছি। মাদকের বিরুদ্ধে ইশরাক হোসেনের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। ঢাকা-৬ আসন, বিশেষ করে নিজের এলাকায় কোনো মাদক কারবারি থাকুক, তা তিনি চান না।”
ইশরাক হোসেনের জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে ওই নেতা দাবি করেন, “সাম্প্রতিক ঘটনার পর তার জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ফলে তিনি এখন আরও স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন।”
ইশরাকের ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের মতে, প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ফলে তিনি এখন স্থানীয় রাজনীতিতে আরো বেশি সময় দিতে পারবেন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিম ভূঁইয়া রাইজিংবিডিকে বলেন, “ইশরাক হোসেনের জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে বেড়েছে। ২০২০ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর তিনি যেভাবে ‘জনতার মেয়র’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন, পদত্যাগের পরও মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।”
তিনি বলেন, “বিএনপির সিদ্ধান্তের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। দীর্ঘ ২০ বছর দলের জন্য মামলা, হামলা, গুম ও নির্যাতনের শিকার হওয়া ত্যাগী নেতাকর্মীরা যেন বৈষম্যের শিকার না হন, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।”
সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তা রাইজিংবিডিকে বলেন, “দলের ও সরকারের ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখতেই ইশরাক হোসেন স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি কোনো অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।”
ইশরাক হোসেন। ছবি সংগৃহীত
তিনি বলেন, “মন্ত্রিত্ব ছাড়লেও ইশরাক হোসেন বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন এবং ঢাকা মহানগরের রাজনীতিতে আগের মতোই ভূমিকা রাখবেন। দল ভবিষ্যতে তাকে যে দায়িত্ব দেবে, তিনি তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবেন।”
দলের ভেতরে প্রতিক্রিয়া
ইশরাকের ভূমিকার বিষয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “পুলিশের ওপর গুলিবর্ষণকারী একদল মাদকসেবীকে দমন করতে গিয়েছিলেন ইশরাক। তার কাজটি ভালো হলেও হাতে অস্ত্র নেওয়া ঠিক হয়নি। এটি তার পদমর্যাদার সঙ্গে মানানসই নয়।”
তিনি বলেন, “সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দেহরক্ষী রয়েছে। পুলিশ বাহিনী দুর্বল হলে দলীয় কর্মীরা সহযোগিতায় যেতে পারেন। কিন্তু মন্ত্রী পর্যায়ের একজন নেতার হাতে অস্ত্র, তা বৈধ হোক বা অবৈধ, শোভা পায় না। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে দুর্বৃত্ত দমনে তার উদ্যোগের জন্য সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতে তাকে মূল্যায়ন করবে বলে আশা প্রকাশ করেন স্পিকার।”
মন্ত্রিসভা থেকে মুক্তিযোদ্ধা প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ কোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি নয় বরং বৃহত্তর পথ উন্মোচিত হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। সম্প্রতি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি এ দাবি করেন।
মাহদী আমিন তার ফেসবুকে লেখেন, “ইশরাক হোসেনের এই ঐতিহাসিক, অভূতপূর্ব পদত্যাগ মোটেই কোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়। বরং আত্মোপলব্ধি, সংশোধনী ও গণমানুষের ভালোবাসায় সামনে তার জন্য আরো বৃহত্তর ও গণমুখী রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের পথ উন্মোচিত হতে পারে।”
মেয়র পদে ফেরার প্রস্তুতি
ইশরাকের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, তিনি আবারও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী হবেন কি না।
সম্প্রতি এক পূজা মণ্ডপে পরিদর্শনে গিয়ে ইশরাক জানান, মেয়র পদে নির্বাচনের জন্য তিনি প্রস্তুত। তবে দল যাকে মনোনয়ন দেখে তার জন্যই কাজ করবেন তিনি।
২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন ইশরাক। সেই নির্বাচনের পর থেকেই রাজধানীর নগর রাজনীতিতে তার পরিচিতি ও সক্রিয়তা বাড়ে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে ইশরাক হোসেনের প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তা বলেন, “ইশরাক হোসেন সর্বশেষ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী ছিলেন এবং তিনিই মূল নির্বাচন করেছিলেন। এটিকে কোনো নেহাত ‘গুঞ্জন’ বলা চলে না, কারণ তিনি দলের পক্ষে সর্বশেষে মেয়রের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন সম্পন্ন করেছেন। ইশরাক হোসেন ব্যক্তিগতভাবে মেয়র বা মন্ত্রী হওয়ার চেয়ে দল ও দেশের স্বার্থকে সবসময় বেশি অগ্রাধিকার দেন। দল যাকে নমিনেশন দেবে বা নির্বাচন করাবে, তিনি তার পক্ষেই কাজ করবেন। তবে দল যদি তাকে মনোনয়ন দেয়, তবে তিনি নির্বাচন করার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত আছেন।”
“ইশরাক হোসেনের এই ঐতিহাসিক, অভূতপূর্ব পদত্যাগ মোটেই কোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়। বরং আত্মোপলব্ধি, সংশোধনী ও গণমানুষের ভালোবাসায় সামনে তার জন্য আরো বৃহত্তর ও গণমুখী রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের পথ উন্মোচিত হতে পারে।”-মাহদী আমিন
অন্যদিকে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিম ভূঁইয়াও আশা প্রকাশ করেন, “ইশরাক হোসেনকে আবারও ‘জনতার মেয়র’ হিসেবে দেখতে চাই।”
