অনাথ ও অসহায় শিশুকে আশ্রয় দেওয়া, পরম স্নেহে লালন-পালন করা এবং তার ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়া ইসলামে অত্যন্ত সওয়াব ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দরদ ও ভালোবাসার পাশাপাশি শরিয়তের সুনির্দিষ্ট হেদায়েত মেনে চলা জরুরি। অনেক সময় না জানার কারণে দত্তক নেওয়া সন্তানকে নিজের ঔরসজাত সন্তান হিসেবে পরিচয় দেওয়া বা বংশপরিচয় গোপন করার মতো ভুল ঘটে যায়। ইসলামে একদিকে যেমন এতিমের প্রতি দয়া ও সার্বিক দায়িত্ব নেওয়ার জোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে তার বংশপরিচয়, মাহরাম বা পর্দা এবং মিরাস সংক্রান্ত বিধিবিধান অপরিবর্তিত রাখার স্পষ্ট সীমাও এঁকে দেওয়া হয়েছে।
১. এতিমের লালন-পালনের ফজিলত
ইসলাম অসহায় শিশুকে আশ্রয়দান ও স্নেহে বড় করার প্রতি সর্বোচ্চ উৎসাহ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) জান্নাতে এতিমের অভিভাবকের নৈকট্য বোঝাতে এক অনবদ্য উপমা দিয়েছেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবি হজরত সাহল ইবনে সা’দ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন—
أَنَا وَكَافِلُ الْيَتِيمِ فِي الْجَنَّةِ هَكَذَا وَأَشَارَ بِالسَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى، وَفَرَّجَ بَيْنَهُمَا شَيْئًا
‘আমি ও এতিমের তত্ত্বাবধানকারী জান্নাতে এভাবে একসাথে থাকব। এ কথা বলে তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল মিলিয়ে একটু ফাঁক করে ইশারা করেন।’ (বুখারি ৬০০৫)
২. প্রকৃত বংশপরিচয় রক্ষা ও কুরআনের নির্দেশনা
দত্তক নেওয়ার কারণে কোনো শিশু পালক বাবা-মায়ের ঔরসজাত সন্তান হয়ে যায় না। শিশুকে ভালোবাসা, শিক্ষা ও আর্থিক নিরাপত্তা দিয়ে বড় করার নির্দেশ দিলেও ইসলাম তার আসল বংশপরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখা বাধ্যতামূলক করেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন—
وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَكُمْ أَبْنَاءَكُمْ ۚ ذَٰلِكُمْ قَوْلُكُم بِأَفْوَاهِكُمْ ۖ وَاللَّهُ يَقُولُ الْحَقَّ وَهُوَ يَهْدِي السَّبِيلَ
‘আর আল্লাহ তোমাদের পোষ্যপুত্রদের তোমাদের প্রকৃত পুত্র করেননি। এগুলো তো কেবল তোমাদের মুখের কথা মাত্র। আর আল্লাহ সত্য কথা বলেন এবং তিনিই সরল পথ নির্দেশ করেন।’ (সুরা আল-আহজাব: আয়াত ৪)
এর পরবর্তী আয়াতেই প্রকৃত পিতৃপরিচয়ে ডাকার কড়া নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন—
ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ ۚ فَإِن لَّمْ تَعْلَمُوا آبَاءَهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَمَوَالِيكُمْ
‘তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাক; আল্লাহর কাছে এটাই অধিক ন্যায়সংগত। আর যদি তোমরা তাদের পিতৃপরিচয় না জানো, তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই ও বন্ধু।’ (সুরা আল-আহজাব: আয়াত ৫)
এই নির্দেশনার আলোকেই জন্মসনদ, দাপ্তরিক নথিপত্র এবং রাষ্ট্রীয় আইনে পালক সন্তানের আসল পিতৃপরিচয় প্রকাশ রাখতে হবে। আর যদি শিশুটির পিতা-মাতার পরিচয় সম্পূর্ণ অজানা থাকে, তবে মিথ্যা কোনো বংশপরিচয় জুড়ে না দিয়ে তাকে যথাযথ পদ্ধতিতে পরিচয় করাতে হবে।
৩. বালেগ হওয়ার পর পর্দার বিধান
শরিয়তসম্মত কোনো কারণে রক্তীয় বা দুধসম্পর্কের মাহরাম তৈরি না হলে, কেবল পালক নেওয়ার সম্পর্কের ভিত্তিতে মাহরাম তৈরি হয় না।
- পালক মা ও পালক পুত্র: যদি রক্তীয় বা দুধসম্পর্কের মাহরাম তৈরি না হয় তবে শিশুটি বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তার সঙ্গে পালক মায়ের শরয়ি পর্দা বজায় রাখা আবশ্যক।
- পালক বাবা ও পালক কন্যা: যদি রক্তীয় বা দুধসম্পর্কের মাহরাম তৈরি না হয় তবে একইভাবে কন্যাসন্তানটি বালেগ হলে পালক বাবার সঙ্গে পর্দার বিধান প্রযোজ্য হবে।
যদিও শৈশবে পূর্ণ পর্দার কঠোর বিধান প্রযোজ্য থাকে না, তবুও বয়স ও বোঝার ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে শালীনতা, দৃষ্টিভঙ্গির হেফাজত ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার শিক্ষা দেওয়া পালক মা-বাবার দায়িত্ব।
৪. দুধসম্পর্ক (রেজাআত) ও মাহরামের বিধান
পালক নেওয়া সন্তানের সঙ্গে রক্তসম্পর্ক না থাকলেও শিশুকালে নির্দিষ্ট শর্তে দুধ পান করালে তা মাহরাম সম্পর্কের রূপ নেয়। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, উম্মুল মুমিনীন আম্মাজান হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন—
يَحْرُمُ مِنَ الرَّضَاعَةِ مَا يَحْرُمُ مِنَ النَّسَبِ
‘বংশগত বা রক্তসম্পর্কের কারণে যেসব সম্পর্ক হারাম (মাহরাম) হয়, দুধপানের সম্পর্কের কারণেও সেসব সম্পর্ক হারাম হয়ে যায়।’ (বুখারি ২৬৪৫, মুসলিম ১৪৪)
পালক সন্তান কখন দুধসন্তান হিসেবে গণ্য হবে?
সাধারণভাবে দুই চন্দ্র বছরের (হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী) মধ্যে শরিয়তের শর্ত পূরণ করে শিশুটিকে পালক মা বা তার নির্দিষ্ট আত্মীয় দুধ পান করালে ছেলেটি বা মেয়েটি দুধসন্তান হিসেবে গণ্য হবে এবং মাহরামের মর্যাদা পাবে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বয়সের হিসাব ও ফিকহি শর্তাবলী বহাল থাকে বিধায় বিজ্ঞ আলেমের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ নেওয়া শ্রেয়।
৫. উত্তরাধিকার ও সম্পদের বিধান
পালক নেওয়ার কারণে পালক পিতা-মাতা ও পালক সন্তানের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো শরিয়তসম্মত উত্তরাধিকার বা মিরাসের অধিকার তৈরি হয় না। তবে শিশুটির ভবিষ্যত সুরক্ষায় ইসলাম দুটি বৈধ বিকল্প পথ রেখেছে—
- জীবদ্দশায় হেবা বা উপহার: পালক মা-বাবা নিজের জীবদ্দশায় স্বেচ্ছায় যে কোনো পরিমাণ সম্পত্তি সেই সন্তানকে উপহার হিসেবে লিখে দিতে পারেন।
- অসিয়ত (উইল): মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার জন্য মোট সম্পদের সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) পর্যন্ত পালক সন্তানের নামে অসিয়ত করতে পারেন। এক-তৃতীয়াংশের বেশি অসিয়ত করতে চাইলে অন্যান্য বৈধ ওয়ারিশদের সম্মতি ও বিশেষ শর্ত সাপেক্ষ আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
৬. দায়িত্ব পালন ও সঠিক পরিচয়ের ভারসাম্য
অনাথ বা কুড়িয়ে পাওয়া শিশুকে ভালোবাসা, বুকে টেনে নেওয়া এবং তার ভরণপোষণ ও শিক্ষার দায়িত্ব বহন করা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ইবাদত। কিন্তু এগুলোর জন্য তাকে নিজের ঔরসজাত সন্তান বলে প্রচার করার প্রয়োজন নেই। মিথ্যা পরিচয় এড়িয়ে দাপ্তরিক ও সামাজিক সত্যতা বজায় রেখেও পূর্ণ স্নেহে শিশুকে মানুষ করা সম্ভব।
অনাথ ও অসহায় শিশুর মুখে হাসি ফোটানো এবং তাকে আশ্রয় দেওয়া জান্নাতে নবীজি (সা.)-এর নৈকট্য লাভের অন্যতম সেরা মাধ্যম। তবে সেই ভালোবাসার আড়ালে যেন দ্বীনের নির্ধারিত সীমানা ও বংশ পরিচয়ের সত্যতা ঢাকা না পড়ে। প্রকৃত পিতৃপরিচয় বহাল রেখে, বালেগ হওয়ার পর পর্দার বিধান মেনে এবং মিরাস ও অসিয়তের নিয়ম ঠিক রেখে পালন করাই হলো প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। শরিয়তের এই প্রজ্ঞাপূর্ণ নীতি অনুসরণ করেই আমরা একই সঙ্গে একটি এতিম শিশুর সুন্দর জীবন নিশ্চিত করতে পারি এবং মহান আল্লাহর দরবারে পূর্ণ প্রতিদান অর্জন করতে পারি।