গুপ্ত ও পতিত স্বৈরাচারের (জামায়াত ও আওয়ামী লীগ) দেশ অস্থিতিশীল করার তৎপরতা নস্যাৎ করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এ জন্য জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার পাশাপাশি দলীয় সংহতি জোরদার করায় গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি। এরই মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি করে ফ্যাসিবাদের দোসররা যাতে ফায়দা লুটতে না পারে, সে জন্য বিগত স্বৈরাচারবিরোধী সমমনা রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে সংগঠনকে শক্তিশালী রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। দলীয়প্রধানের এমন বার্তা
পেয়ে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য দলকে প্রস্তুত করতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কঠোর নির্দেশনা পাঠিয়েছে দলটি। সেই লক্ষ্যে কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচির পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে নিজ উদ্যোগে ইস্যুভিক্তিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকতে বলা হয়েছে। বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতারা এমনটাই জানিয়েছেন।
বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা বলছেন, বিএনপি যে ‘গুপ্ত ও পরিতত স্বৈরাচার’ এক হওয়ার কথা বলছে, তা রাজনৈতিক মাঠের বিশ্লেষণে কেবল কোনো কাল্পনিক জুজু বা রাজনৈতিক স্টান্টবাজি নয়; এর পেছনে দেশের চলমান পরিস্থিতির আলোকে কিছু অকাট্য বাস্তব দিক রয়েছে। কারণ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বিগত পতিত স্বৈরাচার সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা এখনও বহাল তবিয়তে আছেন। তারা প্রায়শই সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি বা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি পতিত স্বৈরাচার সরকারের প্রধান ও তার দোসরদের একটি বড় অংশ ভারতের মাটিতে আশ্রয় নিয়ে সেখান থেকে বিভিন্ন কূটকৌশল ও অপতৎপরতা চালানোর পাঁয়তারা করছে। ফলে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ অন্যান্য অংশীজনদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে কিছুটা পারস্পরিক অবিশ্বাসও দেখা দিচ্ছে। যে অবিশ্বাস ও দূরত্ব গুপ্ত-স্বৈরাচারদের মধ্যে একত্রিত হওয়ার বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে কৃত্রিমভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করার পেছনেও এই গুপ্ত শক্তির হাত থাকতে পারে। তাই সর্ব অবস্থায় সর্তক থাকতে হবে।
এদিকে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও কিছুদিন বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। প্রকাশ্যে বিরোধিতা করলেও জুলাই সনদেও একসঙ্গে স্বাক্ষর করে তারা। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানেও এক মঞ্চে ওঠেন নেতারা। আলাদাভাবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সাবেক দুই মিত্র দল বিএনপি ও জামায়াত। তবে নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে প্রকাশ্যে একপক্ষ আরেক পক্ষকে নিয়ে বিষোদগারমূলক বক্তব্য দেয়। এ ছাড়া প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও মারামারিতে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায় দুইপক্ষকে। নির্বাচনে বিএনপি দুই শতাধিক আসন পেয়ে সরকার ও জামায়াতসহ তাদের মিত্ররা মিলে বিরোধী আসনে বসে। সরকার গঠন করলেও জামায়াতের ইফতার মাহফিলে অংশ নেন নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এমনকি মন্ত্রিসভার শপথের আগেও জামায়াতের আমিরের বাসায় যান তিনি। এরপর থেকে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে দেখা যাচ্ছে।
১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যদের শপথের দিন জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি বিএনপির সদস্যরা। তারা শুধু সংসদ সদস্যের একটি শপথ নেন। যেখানে জামায়াত ও এনসিপির এমপিরা দুটি শপথ নেন। মূলত সেখান থেকেই দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এরপর ২৩ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে সংসদ উত্তপ্ত হয়। সেদিনই সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা।
এরপর থেকেই সংসদ ও রাজপথ দুই দিকেই মুখোমুখি অবস্থান নেয় বিএনপি জামায়াত। ইতোমধ্যে সরকারের বিপক্ষে রাজপথে মিছিল, সমাবেশ ও লংমার্চ করেছে ১১ দল। তারা সরকারকে এক দফা আন্দোলনের ঘোষণাও দিয়ে রেখেছে। সবশেষ গত রবিবার সরকার দলের সংসদ সদস্যদের বিশেষ সভায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফের গুপ্ত ও পতিত স্বৈরাচার একসঙ্গে মিশে যাওয়ার আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন। এক দিন পর কারও নাম উল্লেখ না করে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সামাজিক মাধ্যমে স্ট্যাটাস দেন ‘চোরের মন পুলিশ পুলিশ’।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ভারতে বসে ঘোষণা দেন যে তিনি সব বাধা ও সাজা উপেক্ষা করে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার এই ফেরা ও রাজনৈতিক পুনরুত্থানের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া ও সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে।
অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশে গ্রহণযোগ্য বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আগে এ ধরনের ঘোষণা নতুন রাজনৈতিক সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। আবার কেউ কেউ বলছেন, এ ঘোষণা মূলত কর্মী ও সমর্থকদের মনোবল চাঙ্গা করার একটি রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে, যা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমাদের সময়কে বলেন, দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট এবং সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করার ষড়যন্ত্র করছে পরাজিত শক্তি ও তাদের মদদদাতারা। তারা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাচ্ছে। তাই যেকোনো নাশকতা ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজপথে সজাগ ও সর্তকতায় প্রস্তুত থাকবে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচার সরকারের প্রকাশ্য পতন ঘটলেও ফ্যাসিবাদের শেকড় পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি, বরং প্রশাসন, বিচার-বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রতিটি করপোরেট সেক্টরে এখনও পতিত সরকারের দোসররা সক্রিয় রয়েছে। এরাই আসন্ন দুর্গাপূজাকে ঘিরে যেকোনো সময় দেশের পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করতে পারে। তবে পরিকল্পিত সন্ত্রাস ও দেশকে অস্থিতিশীল করার যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো রাজপথে সক্রিয় থাকবে। নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে বিএনপি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।
বিএনপির দলীয় সূত্রমতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত রাজপথে নিজেদের সাংগঠনিক সক্রিয়তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। একই সঙ্গে নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে দীর্ঘদিনের মিত্র ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে আবারও পাশে রাখার উদ্যোগ নিচ্ছে দলটি। সেক্ষেত্রে বিএনপির পক্ষ থেকে শিগগির সমমনা দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নেবেন দায়িত্বশীল নেতারা। যেমনভাবে নিকট অতীতে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে ‘যুগপৎ আন্দোলন’ পরিচালনা করা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতেও তেমনিভাবে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐক্য বজায় রাখতে চায় দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি নিয়ে কিছুটা মান-অভিমান থাকলেও রাজনৈতিকভাবে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে আগ্রহী দলটি।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদীন ফারুক আমাদের সময়কে বলেন, পতিত, পরাজিত ও পলাতক স্বৈরাচারী শক্তি ১৫-১৬ বছর ধরে দেশে ফাসিবাদ কায়েম করেছিল। বর্তমানেও তারা এবং কিছু ‘গুপ্ত’ শক্তি এক হয়ে বা তলে তলে মিলে বিএনপির নেতৃত্বে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ঠেকানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অতীতে নব্বই কিংবা ছিয়াশি সালে এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতেও এই গুপ্ত ও পতিত শক্তিগুলো গোপনে আঁতাত করে কাজ করেছে। এখন আবার এরা দেশের স্থিতিশীলতা বাধাগ্রস্ত করতে ষড়যন্ত্র করছে। তাই এ ধরনের গোপন বা পতিত স্বৈরাচার থেকে দেশকে রক্ষা করতে জাতীয়তাবাদী শক্তি ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার বিকল্প দেখছে বিএনপি। তিনি বলেন, বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় আছে। তাই আক্রমণকারী হবে না। তবে আক্রমণ করা হলে রাজপথে ছাড় দেবে না বিএনপি।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শরীফুল আলম আমাদের সময়কে বলেন, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি বিএনপি রাজনীতির মাঠে থাকবে; জনগণের পাশেও থাকবে। ইতোমধ্যে দল ও দলে অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করতে দলের চেয়ারম্যান এবং ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নির্দেশনা দিয়েছেন; আমরা সেভাবে কাজ করে যাচ্ছি।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স আমাদের সময়কে বলেন, আগামী ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পতিত স্বৈরাচার এবং রাজাকারদের মেলবন্ধন অথবা তাদের পুরনো রাখিবন্ধনের পুনরাবৃত্তি ঘটছে কিনা, সেটি আমরা নজরে রাখছি। সারাদেশে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে বলেছি। এমনকি বিরোধী দলের বর্তমান তৎপরতাকে দেশবিরোধী, গণতন্ত্র ও গণ-অভ্যুত্থানবিরোধী ষড়যন্ত্র বলে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সতর্ক আছি।
