সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে প্রাণ হারানোর ঘটনা কিছুতেই থামছে না। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পুকুর, নদী, খাল ও মাছের ঘেরে ডুবে অন্তত ২২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর মধ্যে ১৯ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের অগোচরে খেলতে গিয়ে কিংবা গোসল করার সময় অসাবধানতাবশত এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে।
মাসভিত্তিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, মে থেকে সেপ্টেম্বরের পাশাপাশি অক্টোবরের শুরুতেও পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে-সাঁতার না জানা, পুকুর বা জলাশয়ের ধারে অভিভাবকহীন অবস্থায় খেলাধুলো করা এবং হঠাৎ চোখ সরিয়ে নেওয়াতেই একেকটি তাজা প্রাণ নিভে গেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জানুয়ারিতে ১ জন (অজ্ঞাত), ফেব্রুয়ারিতে ২ জন (১ জন বৃদ্ধ, ১ জন শিশু), মার্চে ৩ জন (৩ জন শিশু), এপ্রিলে ১ জন (১ জন শিশু), মেতে ২ জন (২ জন শিশু), জুনে ৩ জন (৩ জন শিশু), জুলাইয়ে ৪ জন (১ জন নারী, ৩ জন শিশু), আগস্টে ৩ জন (৩ জন শিশু), সেপ্টেম্বরে ৬ জন (১ জন বৃদ্ধা, ৫ জন শিশু) এবং ১ অক্টোবরে ২ জনসহ (২ জন শিশু) সর্বমোট ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জন শিশু, ১ জন বৃদ্ধা, ১ জন বৃদ্ধ ও ১ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি রয়েছেন।
এর মধ্যে গত ১৫ সেপ্টেম্বর একদিনেই জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পৃথক ঘটনায় চার শিশু ও এক কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ওই দিন আশাশুনির বামনডাঙ্গা গ্রামে ১৩ মাস বয়সী শিশু ঈশিতা সানা, কলারোয়ার কেড়াগাছিতে দুই বছরের শিশু ইরফান খাঁ, শ্যামনগরের চন্ডিপুরে কিশোর ফয়সাল হোসেন, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ীতে এক কন্যাশিশু এবং কালিগঞ্জের ইন্দ্রনগরে ১৯ মাস বয়সী লামিসা খাতুন পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের শুরুতে পানিতে ডুবে মৃত্যুর একাধিক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে : ১৮ সেপ্টেম্বর কালিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামে নানাবাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে মারা যায় দুই শিশু সোনাতলার আজগার আলীর ছেলে আব্দুল্লাহ (৮) এবং কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের আমিনুর বিশ্বাসের ছেলে ইকবাল হোসেন (৭)।
২৭ সেপ্টেম্বর তালা উপজেলার মহান্দী গ্রামে পুকুরের পানিতে ডুবে রাফসান হোসেন (৩) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে প্রবাসী শেখ রাশেদ হোসেনের ছেলে। দুপুরে অসাবধানতাবশত বাড়ির পাশের পুকুরে পড়ে সে মারা যায়।
১ অক্টোবর কলারোয়ার জালালাবাদ ইউনিয়নের সিংহলাল গ্রামে পুকুরের পানিতে ডুবে দুই সহোদর শিশুর মৃত্যু হয়। দুপুর ১২টার দিকে পরিবারের সদস্যদের অগোচরে পানিতে পড়ে মারা যায় সিংহলাল গ্রামের মুহাম্মদ ইকবাল হোসেনের কন্যা জান্নাতুল (৩) ও পুত্র সানজাদুল (২)।
ডিজাস্টার ফোরামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পানিতে ডুবে ৫৮২ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী ২৫২ জন এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ১৫১ জন শিশু রয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে পানিতে ডুবে ১ হাজার ৩১১ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল, যার মধ্যে ১ হাজার ১৮৪ জনই ছিল শিশু (প্রায় ৯১ শতাংশ)। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৬৩১ জনের বয়স ছিল ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে। ওই সময়ে পুকুরে ডুবে ৭৬৫ জন, নদীতে ডুবে ১৮৫ জন এবং মাছের ঘের ও ডোবার পানিতে ডুবে ১০৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়।
সাতক্ষীরা জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, শিশু একাডেমি সাতক্ষীরা স্থানীয় এনজিও-এর মাধ্যমে আইসিবিসি নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে দেবহাটা ও শ্যামনগর উপজেলায়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধ করে শিশুর মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটানো, যদিও এটি ২০২৫ সালে শেষ হয়েছে।
খুলনা গেজেট/এনএম
