যখন কোনো কমিউনিটি একটি ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট এর শুরু করে, তখন এর পেছনে থাকে একটি সহজ লক্ষ্য, তা হল মানুষের জীবনকে আরও উন্নত করা। কিন্তু এই ধারণাকে বাস্তব ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনে পরিণত করতে শুধু অঙ্গীকারই যথেষ্ট নয়। এজন্য দরকার ভালো প্ল্যানিং, কাজের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া, সবাই মিলে কাজ করা, নিয়মিত কাজের খোঁজ রাখা এবং প্রয়োজন হলে বদলানো। এসব কাজ ঠিকভাবে করতেই ভালো প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট দরকার।
ভালো প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে সঠিক সময়ে সঠিক মানুষের কাছে কাজের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া যায় এবং সময়, অর্থ ও অন্যান্য রিসোর্সের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এর মাধ্যমে কাজের প্রোগ্রেস ট্র্যাক করা যায়, শুরুতেই সমস্যা চিহ্নিত করা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাজের উন্নতি করা যায়। এভাবে কাজ করলে প্রোজেক্ট থেকে আরও বেশি মানুষ উপকৃত হয় এবং ভবিষ্যতে অন্য কমিউনিটিতেও একই ধরনের কাজ করা সহজ হয়।
পিএমআই বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের আয়োজনে বাংলাদেশ প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট সিম্পোসিয়াম অ্যান্ড অ্যাওয়ার্ডস প্রোজেক্ট ও প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে যুক্ত পেশাজীবীদের কাজের স্বীকৃতি দেয়। পাশাপাশি যারা প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, নতুন আইডিয়া, প্রোজেক্ট বাস্তবায়ন এবং মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখছেন, তাদের কাজ অন্যদের জন্য উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে।
এ বছর জনপ্রিয় শক্তি+ ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ডানোন ফুডস লিমিটেড বাংলাদেশ প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাওয়ার্ডস-এ দুটি চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড জিতেছে। আইডিই বাংলাদেশের সঙ্গে পার্টনারশিপে সিলেটে পরিচালিত ‘ট্রান্সফর্মিং লাইভস থ্রু নিউট্রিশন’ (টিএলটিএন) প্রোজেক্টটি ‘চ্যাম্পিয়ন প্রোজেক্ট অব দ্য ইয়ার’ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। একইসঙ্গে সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট ক্যাটাগরিতে ‘চ্যাম্পিয়ন প্রোজেক্ট ম্যানেজার অব দ্য ইয়ার’ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন পূর্বা চৌধুরী জয়া।
গ্রামীণ ডানোন ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুরাইয়া সিদ্দিকা বলেছেন, “আমাদের কাছে সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট এর অর্থ হলো কমিউনিটির প্রয়োজন বোঝা এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনে কার্যকর হতে পারে এমন সমাধান তৈরি করা। ভালো প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট এই বোঝাপড়াকে বাস্তবে রূপ দিতে সাহায্য করে এবং এর মাধ্যমে মানুষ, সম্পদ ও কার্যক্রমকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোন কাজ কার্যকর হচ্ছে তা বোঝা এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে এমন মডেল তৈরি করা, যা আরও বেশি কমিউনিটিতে প্রয়োগ করা যায়।”
আইডিই বাংলাদেশ বাস্তবায়িত টিএলটিএন প্রোজেক্টের মূল লক্ষ্য ছিল পুষ্টি সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো, ফর্টিফায়েড খাবার সহজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে আরও ভালো ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম গড়ে তোলা। এই প্রজেক্টের বিশেষ দিক হলো, এখানে শুধু একটি কাজের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে শিক্ষা, কমিউনিটির অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় মানুষের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়গুলোকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রোজেক্টটির মাধ্যমে স্কুল ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি কমিউনিটি আলোচনায় মায়েদেরও যুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষামূলক ভিডিও, ইন্টার্যাকটিভ সেশন ও কুইজের মাধ্যমে শিশুদের পুষ্টি সম্পর্কে শেখানো হয়েছে। এতে শিশুরা পুষ্টির বিষয়গুলো আরও সহজে বুঝতে পেরেছে এবং শুধু শুনে শেখার বদলে বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটিতে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
মা ও কমিউনিটির অন্য সদস্যদের যুক্ত করতে ৫৮টি উঠান বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। এসব বৈঠকে পুষ্টি নিয়ে আলোচনা, প্রশ্ন করা এবং একসঙ্গে শেখার সুযোগ পেয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা। পাশাপাশি সাতটি স্কুল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশু ও তাদের পরিবারের নিজ নিজ কমিউনিটিতে পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করা হয়েছে।
প্রোজেক্টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ৬৪ জন নিউট্রিশন উদ্যোক্তাকে ট্রেনিং দেওয়া। এই ট্রেনিংয়ে তাদের পুষ্টি, প্রোডাক্ট সম্পর্কে ধারণা, হাইজিন, কমিউনিকেশন, সেশন পরিচালনা ও সেলস সম্পর্কে শেখানো হয়েছে। স্থানীয় মানুষদের ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে প্রোজেক্টিটি কমিউনিটির মানুষের কাছে পুষ্টি বিষয়ক প্রোডাক্ট ও তথ্য আরও সহজে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
এসব অ্যাক্টিভিটির মাধ্যমে প্রোজেক্টটি সরাসরি ১ হাজার ৭৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী এবং ১ হাজার ২৫০ জন মায়ের কাছে পৌঁছেছে। এছাড়া পরোক্ষভাবে ৫ হাজারের বেশি কমিউনিটি সদস্য এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এই সংখ্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শুধু একবার খাবার বা তথ্য দিয়ে অপুষ্টির সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, পরিবারের জন্য ভালো খাবার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং কমিউনিটিতে এমন কিছু বিশ্বাসযোগ্য মানুষ গড়ে তোলা দরকার, যারা নিয়মিত পুষ্টি বিষয়ক তথ্য ও জ্ঞান অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন।
বিশ্বের অনেক জায়গায় এখনও অপুষ্টি একটি বড় সমস্যা। তাই টিএলটিএন প্রোজেক্টটি শুধু একটি সফল স্থানীয় উদ্যোগ নয়, বরং অন্যান্য পিছিয়ে থাকা কমিউনিটিতে পুষ্টি নিয়ে কাজ করার জন্যও একটি ভালো মডেল হতে পারে। তবে একটি ভালো উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে শুধু ভালো আইডিয়া থাকলেই হয় না, ভালো প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্টও দরকার। এজন্য প্রয়োজন স্পষ্ট লক্ষ্য, বাস্তবসম্মত প্ল্যানিং, কাজের দায়িত্ব সঠিকভাবে ভাগ করে দেওয়া, ভালো পার্টনারশিপ, নিয়মিত মনিটরিং এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণ। এসব বিষয় ঠিকভাবে মেনে চললে একটি প্রোজেক্ট শুধু একবারের কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এমন একটি মডেল হয়ে ওঠে, যা ভবিষ্যতে অন্য জায়গাতেও ব্যবহার করা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও উন্নত করা যায়।
প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট এর গুরুত্ব তুলে ধরে পূর্বা চৌধুরী জয়া বলেছেন, “ভালো প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট শুধু সময়মতো কার্যক্রম শেষ করার বিষয় নয়। এর সঙ্গে একটি পরিষ্কার লক্ষ্য থাকা, যাদের জন্য কাজ করা হচ্ছে তাদের প্রয়োজন বোঝা এবং সঠিক পার্টনারদের একসঙ্গে নিয়ে আসাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় ঠিকভাবে করা গেলে একটি প্রোজেক্ট আরও গোছানো ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরির সম্ভাবনাও বাড়ে।”
সুতরাং, টিএলটিএন প্রজেক্টের ‘প্রোজেক্ট অব দ্য ইয়ার’ অ্যাওয়ার্ড দেখিয়েছে, একটি প্রোজেক্ট সফল করতে শুধু ভালো মডেল থাকলেই হয় না, সেটি বাস্তবে কাজে লাগানোর জন্য দক্ষ মানুষও দরকার। পাশাপাশি প্রোজেক্টটি দেখিয়েছে, কীভাবে কমিউনিটির মানুষকে সঙ্গে নিয়ে পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং স্থানীয় মানুষের দক্ষতা তৈরি করা যায়। এই অভিজ্ঞতা অন্য কমিউনিটির প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগানো গেলে, একটি সফল প্রোজেক্টের সুফল শুধু একটি এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
- লেখক একজন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কমিউনিকেশনস কনসালট্যান্ট
