রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মেঘ ঘিরে ধরেছে দেশের বিনিয়োগ খাতকে। বিশেষ করে আসন্ন ডিসেম্বর মাসকে সামনে রেখে রাজপথের সম্ভাব্য শোডাউন, প্রধান দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থান এবং নানামুখী সমীকরণে রাজনৈতিক অঙ্গনে থমথমে ভাব বিরাজ করছে। আর এই উত্তেজনার ঢেউ এসে লেগেছে সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে।
অনিশ্চয়তার এই ঘনঘটায় স্থবির হয়ে পড়েছে দেশি-বিদেশি বড় অঙ্কের নতুন বিনিয়োগ এবং কারখানা সম্প্রসারণের চাকা। কোনো ঝুঁকি না নিয়ে ব্যবসায়ীরা এখন হাঁটছেন ‘ধীরে চলো’ নীতিতে। রাজনীতির গতিপথ কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখেই অনেকে ঠিক করবেন ব্যবসার পরবর্তী ভবিষ্যৎ। সংশ্লিষ্ট বলছেন, কোনো দেশে বিনিয়োগ বাড়ার প্রথম ও প্রধান পূর্বশর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা। কিন্তু ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সবাই পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় রয়েছেন।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি ও সংস্কারের আশা জেগেছিল। তবে দীর্ঘ দেড় বছর ক্ষমতা আকড়ে থাকলেও সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নেয়নি। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেয় নতুন রাজনৈতিক সরকার। এর ফলে অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হলেও গত আট মাসে কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখাতে পারেনি।
এদিকে, আগামী ডিসেম্বরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং দলটির সম্ভাব্য পুনরুজ্জীবন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ডিসেম্বর যত এগিয়ে আসছে, দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম জোরদার করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে হোটেল-রেস্তোরাঁয় বৈঠক, ঝটিকা মিছিল-সমাবেশের চেষ্টা এবং পেশাজীবী সংগঠনের ব্যানারে নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ায় সর্বসাধারণের মনে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে, বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ চাঁদাবাজি, অপহরণ ও মাদকের বিস্তার রোধে সাফল্য দেখাতে পারেনি। এর ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে এবং তারা বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বর্তমানে তারা মূলত একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ও স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অপেক্ষায় রয়েছেন।
আজ শনিবার দুপুরে ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনী জনসভায় বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, বিএনপি আট মাসে লেজেগোবরে মাখিয়ে ফেলেছে। আট মাস যায়নি, তাতেই চারজন এমপি-মন্ত্রীর পদত্যাগ করা হয়ে গেছে। তাদের সকালে এক কথা, বিকেলে আরেক কথা। এমপিরা পিস্তল নিয়ে নামে মাদক থামাবে বলে। অথচ সরকারের একজন বড় মন্ত্রীর বাড়ির পাশ দিয়েই সব মাদক আসে।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, যারা কৃষকের সার মেরে খায়, বিদ্যুৎ দিতে পারে না, গ্যাস দিতে পারে না, ছয় মাসে তিন থেকে চারবার জ্বালানির দাম বাড়ায়, তাদের কাছে কি দেশের অর্থনীতি, জানমাল নিরাপদ থাকতে পারে?
এ বিষয়ে বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি এবং বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, নতুন বিনিয়োগের মতো পরিবেশ দেশে একদমই নেই। নতুন বিনিয়োগ তো দূরের কথা, অনেকের জন্য এখন চলমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি, একের পর এক সমস্যা লেগেই আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় এবং সুদের হার অনেক বেশি থাকায় সামগ্রিকভাবে এখনো বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ফিরে আসেনি। সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা হতাশ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বিনিয়োগকারীরা সব সময় টেকসই ও নিরাপদ পরিবেশের খোঁজ করেন। রাজনীতি যদি সংঘাতের দিকে ধাবিত হয়, তবে সেটির নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি শিল্প-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের ওপর গিয়ে পড়ে।
এদিকে দেশে সার্বিক পণ্য আমদানি বাড়লেও মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের অন্যান্য মূলধনী পণ্যের আমদানি কমছে। নতুন কারখানা স্থাপন, বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণ কিংবা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনায় ব্যবসায়ীদের এই অনীহা শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগের গতি নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) দেশে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ। এ সময়ে আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫০৬ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭৫০ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার। অথচ একই সময়ে দেশের সার্বিক পণ্য আমদানি ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আমদানির এই বিপরীতমুখী চিত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে নতুন শিল্পায়নে বিনিয়োগের গতি স্থবির হয়ে পড়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উচ্চ সুদহার, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও অপ্রত্যাাখিত/অনির্দিষ্ট ব্যয়ের কারণে ব্যবসার খরচ বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাত সংস্কারসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন ছিল ধীরগতির। তবে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা উল্লেখযোগ্য দিক হলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের স্থবিরতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা জানান, ডিসেম্বর কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচি ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে তাদের পরবর্তী ব্যবসায়িক কৌশল। তারা রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক ও স্থিতিশীল পরিবেশ প্রত্যাশা করছেন, যাতে বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা পূর্ণ আস্থার সাথে নতুন নতুন প্রকল্প বা উদ্যোগে মূলধন বিনিয়োগ করতে পারেন।
