সংবাদ · সাধারণ
ইলিশ সংরক্ষণে জেলেদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত হোক
২৪/১০/২০২৬

ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের বিপুলসংখ্যক মৎস্যজীবীর জীবিকা, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা এবং জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে ইলিশের উৎপাদন ও সরবরাহ নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই ইলিশের প্রজনন, বংশবৃদ্ধি ও উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে প্রশ্ন হলো, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রচলিত পদ্ধতি কতটা কার্যকর এবং এর সুফল কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে?ইলিশ সংরক্ষণে শুধু নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা, নদীতে অভিযান পরিচালনা, জাল জব্দ বা ধ্বংস করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে অংশগ্রহণমূলক, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। অর্থাৎ জেলেদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, ইলিশ সংরক্ষণের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।ব্যয় ও কার্যকারিতার মূল্যায়ন জরুরিইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী ও পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও বাহিনীকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। নদীতে অভিযান, নৌযান ব্যবহার, জনবল নিয়োগ, জাল জব্দ ও পাহারার মতো কার্যক্রমে অর্থ ও শ্রম ব্যয় হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগের বিপরীতে নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হচ্ছে, কতজন জেলে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকছেন এবং ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদনে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, তা নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।নদীতে অভিযান পরিচালনা করলেই নিষেধাজ্ঞা শতভাগ কার্যকর হয় না। একইভাবে, বিপুলসংখ্যক জাল জব্দ করাও সংরক্ষণ কার্যক্রমের সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে অবৈধ মাছ ধরা কমানো, ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি সুরক্ষিত রাখা, জেলেদের আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা উন্নত করার ওপর। তাই সরকারি অর্থ ও জনবল ব্যবহারের কার্যকারিতা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।জেলেদের সম্পৃক্ততা কেন প্রয়োজনইলিশ সংরক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন মৎস্যজীবীরা। নদীর গতিপ্রকৃতি, মাছের বিচরণক্ষেত্র ও স্থানীয় পরিবেশ সম্পর্কে তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে তাদের প্রধানত নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। নদী ও খালের বিস্তীর্ণ এলাকায় সার্বক্ষণিক সরকারি নজরদারি ব্যয়সাপেক্ষ। স্থানীয় জেলেদের অংশগ্রহণ এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরতে না পারলে জেলেদের পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে সংকট দেখা দিতে পারে। বিকল্প জীবিকা ও পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষার অভাবে কেউ কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে বাধ্য হতে পারেন। তাই জেলেদের জীবিকা ও ইলিশ সংরক্ষণকে পরস্পরবিরোধী না ভেবে একই ব্যবস্থাপনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখতে হবে। ইলিশ সংরক্ষণে কয়েকটি প্রস্তাব:সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনস্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এতে মৎস্যজীবীদের প্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, মৎস্য অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। কমিটির দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি ও জবাবদিহি সুস্পষ্ট হতে হবে। প্রকৃত জেলেদের অংশগ্রহণ এবং তাদের পরিবারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে। এতে স্থানীয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়বে।বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণইলিশের প্রজননচক্র, মৎস্য গবেষণা ও নদীর পরিবেশগত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ করতে হবে। স্থানীয় কমিটি জেলে ও জনগোষ্ঠীর মতামত নিয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তুলে ধরতে পারে। তবে আইনগতভাবে নির্ধারিত নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবর্তনের ক্ষমতা যথাযথ কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সরকার, জেলে প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব স্পষ্ট করা প্রয়োজন।জাল ও মাছ ধরার সরঞ্জাম নিরাপদে সংরক্ষণনিষেধাজ্ঞার সময় প্রকৃত জেলেদের মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম স্থানীয় কমিটির তত্ত্বাবধানে নিরাপদে সংরক্ষণের ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। এ জন্য জালের মালিকের পরিচয়, নিবন্ধন নম্বর, ধরন ও সংখ্যা উল্লেখ করে তালিকা তৈরি করতে হবে। জাল জমা ও ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে লিখিত রসিদ এবং স্বচ্ছ হিসাব রাখতে হবে। এ ব্যবস্থা চালুর আগে জেলেদের মতামত, নিরাপত্তা ও ব্যয় যাচাই করা জরুরি। কোনোভাবেই জেলেদের বৈধ সম্পত্তির অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না।নৌকা ও ঘাট ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় নজরদারিনিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরার নৌকাগুলো উপযুক্ত ও নিরাপদ ঘাটে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে নৌযান চলাচল, জোয়ার-ভাটা, বন্যা ও জরুরি চলাচলের বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক ঘাট নির্ধারণ করা যেতে পারে। নৌকার তালিকা তৈরি, ঘাটের নিরাপত্তা ও নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে বণ্টন করা সম্ভব। তবে এ ব্যবস্থা যেন নৌপথের স্বাভাবিক চলাচল ও নিরাপত্তায় বিঘ্ন না ঘটায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।প্রকৃত জেলে শনাক্তকরণ ও সামাজিক সুরক্ষানিবন্ধিত জেলেদের তালিকা নিয়মিত যাচাই করে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের শনাক্ত করতে হবে। মৎস্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, উপজেলা প্রশাসন ও জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এ কাজ করা যেতে পারে। তালিকা তৈরিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রকৃত জেলেরা বাদ না পড়েন এবং অযোগ্য কেউ সুবিধা নিতে না পারেন। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা, চিকিৎসা ও শিশুদের শিক্ষার বিষয় বিবেচনায় পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি সহায়তা যথাসময়ে ও সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছালে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার সক্ষমতা বাড়বে।বিকল্প আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিনিষেধাজ্ঞার সময় আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প আয় ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। জেলেদের আগ্রহ, দক্ষতা ও স্থানীয় বাজারের চাহিদা বিবেচনায় হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, সবজি চাষ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, জাল মেরামত এবং নৌযান মেরামতের মতো কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। প্রশিক্ষণের সঙ্গে আয়মূলক কাজ, প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা ও বাজারসংযোগের সুযোগও তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী ভাতা ও খাদ্যসহায়তা সময়মতো বিতরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে নিষেধাজ্ঞার সময়েও জেলেরা পরিবারের ব্যয় নির্বাহের সুযোগ পাবেন।সামাজিক প্রতিরোধ ও আইন প্রয়োগে সহযোগিতানিষেধাজ্ঞাকালে অবৈধ মাছ ধরা প্রতিরোধে স্থানীয় কমিটি সচেতনতা সৃষ্টি, তথ্য আদান-প্রদান ও সামাজিক উদ্যোগ নিতে পারে। নদীতে সন্দেহজনক কার্যক্রমের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করা হবে কমিটির অন্যতম দায়িত্ব। তবে প্রচলিত আইনে ক্ষমতা অর্পিত না থাকলে কমিটি কাউকে আটক, শাস্তি প্রদান কিংবা জাল ও নৌকা বাজেয়াপ্ত করতে পারবে না। আইন প্রয়োগের দায়িত্ব যথাযথ কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নজরদারি ও সরকারি বাহিনীর পেশাগত সক্ষমতার সমন্বয় হলে অবৈধ মাছ ধরা প্রতিরোধ আরও কার্যকর হতে পারে।পরীক্ষামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে কার্যকারিতা যাচাইসহ-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে সব দায়িত্ব শুধু সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। তবে এ ব্যবস্থার জন্যও প্রশিক্ষণ, সমন্বয়, সরঞ্জাম সংরক্ষণ ও সামাজিক সুরক্ষায় অর্থের প্রয়োজন হবে। তাই একে ব্যয়হীন ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা না করে বিদ্যমান পদ্ধতির সঙ্গে এর ব্যয় ও কার্যকারিতার তুলনা করতে হবে।এ জন্য কয়েকটি উপযুক্ত নদী বা এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে সহ-ব্যবস্থাপনা চালু করা যেতে পারে। নিষেধাজ্ঞা পালনের হার, অবৈধ মাছ ধরার ঘটনা, ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য, জেলেদের আয় এবং সরকারি ব্যয়ের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সন্তুষ্টিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। স্বাধীন মূল্যায়নে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য এলাকায় এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।ইলিশ রক্ষায় চাই রাষ্ট্র ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগইলিশ সংরক্ষণ শুধু মৎস্য অধিদপ্তর বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একক দায়িত্ব নয়। এটি রাষ্ট্র, মৎস্যজীবী, স্থানীয় সরকার, গবেষক, নাগরিক সমাজ ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত দায়িত্ব। শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই এ দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার উপযোগী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশও গড়ে তুলতে হবে।একজন জেলে নদীতে মাছ ধরে নিজের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি দেশের খাদ্য সরবরাহ ও অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। তাই তার জীবিকা সুরক্ষিত রেখে ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। জেলেরা যদি নিষেধাজ্ঞাকে কেবল জীবিকার ওপর বাধা হিসেবে না দেখে ইলিশের ভবিষ্যৎ রক্ষার যৌথ উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে সংরক্ষণ কার্যক্রমের স্থায়িত্ব বাড়বে।অতএব, প্রচলিত ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে জেলেকেন্দ্রিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক সহ-ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নিষেধাজ্ঞা ও আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জেলেদের অংশীদারত্ব, বিকল্প জীবিকা, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জবাবদিহিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ সমন্বিত উদ্যোগই ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন সুরক্ষা এবং মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় টেকসই ভূমিকা রাখতে পারে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক প্রকল্প সমন্বয়কারী, ইকোফিশ বাংলাদেশ]
মূল প্রতিবেদনে যান ↗