রকমারি ডেস্ক: ইউরোপ ভ্রমণের পরিকল্পনা এখন আর খুব একটা অচেনা নয়। বাংলাদেশ ও ভারত থেকে বিমানে প্যারিস, লন্ডন, আমস্টারডাম কিংবা রোমে পৌঁছে যাওয়া বেশ সহজ। কিন্তু গাড়ি নিয়ে সড়কপথে ইউরোপ যাওয়ার অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। দীর্ঘ পথ, একের পর এক দেশের সীমান্ত পেরোনো এবং ভিসা-সংক্রান্ত নানা নিয়ম মেনে এগিয়ে চলার এই সফর যেমন চ্যালেঞ্জের, তেমনই রোমাঞ্চকর।
ভারত থেকে লন্ডন পর্যন্ত এই যাত্রার দূরত্ব রুটভেদে প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার হতে পারে। পথে পেরোতে হতে পারে ১৫টিরও বেশি দেশ, কোনও কোনও ভ্রমণসূচিতে দেশের সংখ্যা ২০।
যারা শুধু গন্তব্যে পৌঁছনোর চেয়ে যাত্রাপথের অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেন, তাদের কাছে এমন সফর হয়ে উঠতে পারে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিযান। তবে এই যাত্রার জন্য শুধু গাড়ি চালানোর দক্ষতা থাকলেই হবে না; প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিয়ম, ভিসা, গাড়ির নথিপত্র ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা।
ভারত থেকে ইউরোপে সড়কপথে যাওয়ার একাধিক সম্ভাব্য রুট রয়েছে। একটি বিকল্প পথে নেপাল ও চীন হয়ে মধ্য এশিয়ার কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তান পেরিয়ে রাশিয়া এবং বেলারুশের দিকে এগোনোর পরিকল্পনা করা যায়। সেখান থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ পেরিয়ে ফ্রান্স হয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছনোর কথা ভাবা যেতে পারে।
আরেকটি সম্ভাব্য পথ পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করা। এরপর গ্রিস, বুলগেরিয়া, সার্বিয়া, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো দেশ পেরিয়ে যুক্তরাজ্যের দিকে যাত্রা চালিয়ে যাওয়া যায়। তবে কোনও রুটই সব সময় নির্বিঘ্নে ব্যবহার করা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সীমান্তের বিধিনিষেধ, ভিসা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পরিকল্পিত পথ পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।
দীর্ঘ সড়কযাত্রার একটি উদাহরণ অ্যাডভেঞ্চার্স ওভারল্যান্ডের ২০২৭ সালের প্রস্তাবিত অভিযান। সংস্থাটির ভ্রমণসূচি অনুযায়ী, ৬৯ দিনের এই সফরে ভারত, নেপাল, চিন, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, রাশিয়া, জর্জিয়া, তুরস্ক, বুলগেরিয়া, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া, চেকিয়া, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য—মোট ২০টি দেশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই সফরের বিশেষত্ব হলো, পথে বিভিন্ন দেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি, খাবার ও জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও পাওয়া। তবে এ ধরনের ভ্রমণসূচি নির্দিষ্ট পরিকল্পনার ওপর নির্ভরশীল। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে একই পথে যাত্রা করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রবেশনীতি ও অনুমতি আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।
ভারত থেকে লন্ডন পর্যন্ত সড়কযাত্রায় প্রায় ছয় সপ্তাহ লাগতে পারে। তবে তা নির্ভর করে রুট, সীমান্ত পারাপারে সময় এবং পথে কতগুলি জায়গায় থামা হচ্ছে তার ওপর। যারা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছতে চান, তাদের সঙ্গে যারা প্রতিটি দেশে ঘুরে দেখতে চান, তাদের সফরের সময়ের পার্থক্য স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা হবে।
পথে দর্শনীয় স্থান ঘোরা, স্থানীয় সংস্কৃতি উপভোগ করা কিংবা কয়েক দিন করে বিভিন্ন শহরে থাকা এসব পরিকল্পনায় যুক্ত হলে সফরের মেয়াদ আরও বাড়তে পারে। তাই যাত্রার আগে একটি বাস্তবসম্মত সময়সূচি তৈরি করা জরুরি।
এত দীর্ঘ সড়কযাত্রায় খরচের হিসাব করতে গেলে শুধু পেট্রল বা ডিজেলের দাম নয়, আন্তর্জাতিক ভিসা, থাকা-খাওয়া, বিভিন্ন দেশের টোল, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ এবং সীমান্ত পারাপারের প্রয়োজনীয় অনুমতি সব কিছুর জন্য বাজেট রাখতে হবে। পথে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি, অতিরিক্ত রাত থাকা কিংবা রুট বদলানোর প্রয়োজন হলেও খরচ বাড়তে পারে। তাই সফরের দৈর্ঘ্য, থাকার ধরন, গাড়ির জ্বালানি খরচ এবং দর্শনীয় স্থান ঘোরার পরিকল্পনা অনুযায়ী আগেই বাজেট তৈরি করা উচিত।
আন্তর্জাতিক সড়কযাত্রায় প্রয়োজনীয় নথিপত্রের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সাধারণত যাত্রার সময় বৈধ পাসপোর্ট, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ভিসা ও প্রবেশের অনুমতি, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং গাড়ির নিবন্ধন ও বিমা-সংক্রান্ত কাগজপত্র সঙ্গে রাখতে হয়। বিদেশে গাড়ি চালানোর জন্য আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট প্রয়োজন কি না, সেটিও প্রতিটি দেশের নিয়ম অনুযায়ী যাচাই করা জরুরি।
এ ছাড়া, নির্দিষ্ট দেশে ব্যক্তিগত গাড়ি সাময়িকভাবে প্রবেশ করানোর জন্য ‘কার্নে দ্য প্যাসাজ আঁ দুয়ান’ বা সিপিডি-এর মতো শুল্ক-সংক্রান্ত নথি প্রয়োজন হতে পারে। তবে সব দেশ ও রুটে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। তাই সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি নির্দেশিকা দেখে নথিপত্র প্রস্তুত করাই নিরাপদ।
মানচিত্রে কোনও রুট উপযুক্ত দেখালেই বাস্তবে সেই পথে যাওয়া সম্ভব হবে, এমন নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সীমান্তের নিয়ম, নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধ এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিবর্তন যাত্রার পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত দিয়ে যাওয়ার কথা ভাবলে বর্তমান প্রবেশনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সময় ও ঝামেলার কথা বিবেচনা করলে বিমানে ইউরোপ যাওয়া অনেক সহজ। নিজের গাড়ি নিয়ে একাধিক সীমান্ত পেরোনো, কয়েক সপ্তাহ ধরে গাড়ি চালানো কিংবা জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের বাড়তি খরচ কোনওটিরই প্রয়োজন হয় না। তবু সড়কপথের আকর্ষণ আলাদা।
ভারত থেকে যাত্রা শুরু করে যত সামনে এগোনো যায়, ততই বদলে যেতে থাকে ভূপ্রকৃতি, ভাষা, খাবার, মুদ্রা ও রাস্তার ধরন। একের পর এক দেশ পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছনোর অভিজ্ঞতাই এই সফরকে সাধারণ ছুটির ভ্রমণের চেয়ে আলাদা করে তোলে। ভারত থেকে সড়কপথে ইউরোপে পৌঁছনো সম্ভব হলেও এটি সহজ বা নিশ্চিতভাবে নির্বিঘ্ন কোনও যাত্রা নয়। পর্যাপ্ত সময়, বাস্তবসম্মত বাজেট, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা বদলানোর প্রস্তুতি থাকলেই এই দীর্ঘ অভিযানের কথা ভাবা যায়।
