কোথাও বেড়াতে যাওয়ার ব্যাপারে সব সময় সবচেয়ে বেশি উৎসাহ থাকে আমার। গন্তব্যস্থলে কীভাবে যাওয়া, কী কী দেখতে পাওয়া যাবে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সবকিছুই জানার চেষ্টা করি আমি। ভ্রমণ সঙ্গী হিসেবে যাকে সঙ্গে নেব তাকে আগের থেকেই গুঁতোতে থাকি, যেন সে গন্তব্যে যাত্রার দিন তৈরি থাকে। তবে একটা বিষয় প্রমাণিত যে, নতুন গন্তব্যে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি যে লাফায় সে-ই শেষ পর্যন্ত যায় না। যাই হোক অনেক দিন ধরে শুধু প্ল্যানই করছি কিন্তু যাওয়া আর হচ্ছে না প্রাচীনকালের সমৃদ্ধ নগর সুবর্ণ গ্রাম। যার বর্তমান নাম সোনারগাঁ।
ঈসা খাঁর আমলের বাংলার রাজধানী ছিল পানাম নগর। বড় নগর, খাস নগর, পানাম নগর-প্রাচীন সোনারগাঁয়ের এই তিন নগরের মধ্যে পানাম ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এখানে কয়েক শতাব্দী পুরোনো অনেক ভবন রয়েছে, যা বাংলার বার ভূঁইয়াদের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঈসা খাঁর যাতায়াত ছিল এই নগরীতে।
সেই সময়টাতেই অর্থাৎ সুলতানি আমলে বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করে। পূর্বে মেঘনা আর পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা নদীপথে বিলেত থেকে আসত বিলাতি থানকাপড়, দেশ থেকে যেত মসলিন। ওই সময়েই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ইউরোপীয় অনুপ্রেরণায় নতুন ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতিতে গড়ে ওঠে পানাম নগরী।
ইংরেজরা এখানে নীলের বাণিজ্যকেন্দ্র খুলে বসে। সেই সঙ্গে মসলিনের বাজার দখল করে নেয় নীল বাণিজ্য। একসময় ধনী হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল এখানে এবং ছিল মুসলিমদের জমজমাট ব্যবসা। প্রাচীন সেই নগরীতে তেমন কিছু আর অবশিষ্ট নেই, আছে শুধু ঘুরে দেখার মতো ঐতিহাসিক বাড়িঘর। শেষ পর্যন্ত অনেক চেষ্টা চরিত্রের পর আমরা রওনা হলাম পানাম নগরের দিকে। আমাদের চার চাকার গাড়ি চলছে তার নিজস্ব ছন্দে আর আমি বারবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছি। ঘণ্টা পার হলো, ঢাকা থেকে সোনার গাঁ যাচ্ছি।
অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হচ্ছে না। আরও কিছুক্ষণ পর অবশেষে মোগড়া পাড়ায় এসে থামলাম। সেখান থেকে স্বল্প সময়ের মধ্যে পৌঁছে গেলাম পানাম সিটিতে। গাড়ি থেকে নেমেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। মনে হলো ভুল কোনো শতাব্দীতে ঢুকে পড়েছি।
শুধু একটা মাত্র দালান হলেও কথা ছিল।
কিন্তু এ যে চোখের সামনে পঞ্চদশ শতকের এক হারানো রাজ্য, ৪০০ বছরের পুরোনো পানাম নগরী। আমি, চিন্টু আর সানন্দা মিলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। পানাম নগরীতে ঢুকার মুখে কথা হলো ওখান কার কর্তব্যরত আনসার গার্ডের সঙ্গে সঙ্গে। তিনি জানান, এই নগরীর পুরোটাই খাল দিয়ে বেষ্টিত যার নাম পঙ্খীরাজ খাল। এই খাল পূর্বদিকে মেনিখালী নদী হয়ে মেঘনা নদীতে এসে মিশেছে। নগরীর পূর্বে মেঘনা আর পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা। এই পথেই বিলেত থেকে আসত বিলাতি থান কাপড় আর দেশ থেকে যেত মসলিন। আর আছে বিশাল সুরক্ষিত গেট, যা সন্ধ্যা হলেই বন্ধ হয়ে যেত।
এখনো সন্ধ্যার আগ পর্যন্তই এটা নগরী দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। আমরা পদব্রজে এগিয়ে যেতে লাগলাম সম্মুখ পানে। পানাম নগরে ঢুকেই চোখে পড়ল একটি সরু রাস্তার ধারে সারি সারি পুরোনো দালান। কোনোটা দোতলা, কোনোটা আবার একতলা। আমরা ভেতরে প্রবেশের একটু পরেই শুরু হলো মুষলধারায় বর্ষণ।
কোনো উপায়ান্তর না দেখে একটি পুরোনো ভবনের নিচে অবস্থান নিলাম। এদিকে এই ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই ছবি তুলতে লাগল। বৃষ্টিস্নাত ভবনগুলো দেখতে আরও সুন্দর লাগছিল। আমিও বৃষ্টিতে ভিজে ছবি তুললাম। হেঁটে গেলাম সামনের দিকে, বাড়িগুলোর স্থাপত্য নিদর্শন দেখে বোঝা যায় এখানে ধনিক শ্রেণির লোকরা বসবাস করতেন।
বাড়িগুলোতে মুঘল ও গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণ দেখা যায় এবং প্রতিটি বাড়ির কারুকাজ স্বতন্ত্র। কারুকাজ, রঙের ব্যবহার এবং নির্মাণ কৌশলের দিক থেকে নতুন নতুন উদ্ভাবনী কৌশলের প্রমাণ পাওয়া যায় এখানে। প্রায় প্রতিটি বাড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে ঢালাই লোহার তৈরি ব্র্যাকেট। জানালায় ব্যবহার করা হয়েছে লোহার গ্রিল এবং ঘরে বায়ু চলাচলের জন্য ভেন্টিলেটর ব্যবহার করা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো বাড়িগুলোতে কাস্ট আয়রনের নিখুঁত কাজ আছে এবং ইউরোপে ব্যবহৃত কাস্ট আয়রনের কাজের সঙ্গে এই কাজের অনেক মিল লক্ষ করা যায়। এছাড়া মেঝেতে লাল, সাদা ও কালো মোজাইকের কারুকাজ লক্ষণীয়।
নগরীর ভেতরে আবাসিক ভবন ছাড়াও আছে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, মঠ, গোসলখানা, নাচ ঘর, পান্থশালা, চিত্রশালা, খাজাঞ্চিখানা, দরবারকক্ষ, গুপ্তপথ, বিচারালয়, পুরোনো জাদুঘর। এদিকে পথ চলতে চলতে সবারই পেটে লেগেছে।
সেই কখন পেটে দানাপানি পড়েছে কিন্তু কী করা শেষমেশ পানাম নগরীর ভেতরেই একটি দোকান পাওয়া গেল। দোকানে প্রবেশের পর সবার মন খারাপ। চিপস আর কোল্ড ড্রিংক ছাড়া খাবার কিছুই নেই। যা-ও আছে তা আবার চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
নিতান্ত নিরুপায় হয়ে চিপস অধিক দামে কিনে খেতে হলো। চিপস খেয়ে পেটের রাম-রাবণের যুদ্ধ সাময়িক বিরতিতে গেল আমরা সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। পানাম নগরীর বিভিন্ন দালানের নির্মাণশৈলীতে ও ভিন্নতা লক্ষ করা যায়।
ব্যবসায়ী আর জমিদারদের বসবাসের এই নগরীর প্রতিটি দালান অপূর্ব কারুকার্য মণ্ডিত। খুব খেয়াল করে দেখলাম পানাম নগরীকে চিরে দুই ভাগ করে চলে যাওয়া পাঁচ মিটার প্রশস্ত ও ৬০০ মিটার দীর্ঘ একটি সড়কের দুই পাশে একতলা, দোতলা ও তিনতলা মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ৫২টি ভবন।
সড়কের উত্তর পাশে আছে ৩১টি ভবন এবং দক্ষিণ পাশে আছে ২১টি ভবন। ওয়ার্ল্ড মনুমেন্ট ফান্ড ২০০৬ সালে পানাম নগরকে বিশ্বের ধ্বংসপ্রায় ১০০টি ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকায় স্থান দেয়। আমরা পদব্রজে কেবল রাস্তার দুই ধারের বাড়িগুলো দেখেই আমরা সন্তুষ্ট হইনি।
আমরা চেয়েছিলাম সব জায়গা ভালো করে দেখতে। স্থাপত্যগুলোর পেছন দিকে গিয়ে দেখি, চমৎকার বাতাসে জলাশয়ের ওপারে ফুলগাছগুলো এক মোহনীয় রূপে আমাদের মাঝে ধরা দিয়েছে। আবার পরগাছায় ছেয়ে থাকা দেয়াল, সিঁড়িতেও যেন আশ্চর্য সৌন্দর্য ঠিকরে পড়ছিল। প্রাচীনত্ব, এ যেন মায়ারই অন্যরূপ। কেন যেন এরকম জায়গায় এলে মনটা কেমন করে।
বাড়িগুলোর নির্মাণকাজ দেখলে আপনা থেকেই আগেকার কারিগরদের প্রতি শ্রদ্ধা জাগে। এত নিখুঁত এত সুন্দর কারুকাজ সেই সময়ে, কী চমৎকার আর্ট! খুব জানতে ইচ্ছা করে এই প্রাচীন নগরীর মানুষগুলো কীভাবে জীবনযাপন করত।
জানতে ইচ্ছা করে পানাম নগরীর এতগুলো বাড়িতে বসবাসরত মানুষ একসঙ্গে কোথায় চলে গেল? কেন চলে গেল? ব্যবসা পড়ে গেলে সবাই কেন চলে যাবে? কেউ না কেউ তো থেকে যাওয়ার কথা। সেটা হয়তো আর কখনোই জানা যাবে না। আফসোস থেকে যাবে দিনের পর দিন, শতাব্দীর পর শতাব্দী।
কীভাবে যাবেন
ঢাকার গুলিস্তান থেকে বাসে করে যেতে পারেন। দোয়েল, বোরাক আর স্বদেশের বাস ছাড়ে সেখান থেকে। ভাড়া বাসভেদে ২৫-৪৫ টাকা। নামবেন সোনারগাঁয়ের মোগড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড। ওখান থেকে রিকশায় ১৫-২০ টাকা।
/এমটি
