জালালাবাদ রিপোর্ট: মধ্যপ্রাচ্যের গত এক দশকের ইতিহাস কেবল কয়েকটি যুদ্ধের ধারাবিবরণী নয়। এটি রাষ্ট্রের ভাঙন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজন, বিদেশি হস্তক্ষেপ, জ্বালানি রাজনীতি এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের সম্মিলিত ইতিহাস। একদিকে সিরিয়া, ইয়েমেন ও ইরাকে গৃহযুদ্ধ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান; অন্যদিকে ইরান, সৌদি আরব, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার স্বার্থের সংঘাত- সব মিলিয়ে অঞ্চলটি এমন এক নিরাপত্তাসংকটে পড়েছে, যার অভিঘাত মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও ছড়িয়েছে। গত এক বছরে কখনও যুদ্ধের তীব্রতা কমেছে, কখনও কূটনীতির নতুন জানালা খুলেছে; আবার পুরনো সংঘাত নতুন রূপে ফিরে এসেছে। কোনো কোনো দেশে সরকার বদলেছে, কোথাও সশস্ত্র গোষ্ঠীর শক্তি বেড়েছে, কোথাও সাময়িক যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট, রাশিয়ার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক সামরিক নীতি- এসবের পারস্পরিক ক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ২০২৬ সালের শেষে এসে এই সংকটের একটি নতুন মাত্রা স্পষ্ট : যুদ্ধ আর শুধু কোনো একটি দেশের সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে হুমকি, জ্বালানি অবকাঠামোর ঝুঁকি এবং একাধিক দেশে একই সময়ে সামরিক উত্তেজনা- সব মিলিয়ে আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এক দশক ধরে এত যুদ্ধ ও রক্তপাতের পরও মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এত কঠিন কেন? উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে সেই সংকটগুলোর দিকে, যেগুলো ২০১৬ সালেই গভীরভাবে প্রোথিত ছিল।
২০১১ সালে শুরু হওয়া সিরিয়ার সরকারবিরোধী আন্দোলন কয়েক বছরের মধ্যে বহুপক্ষীয় যুদ্ধে রূপ নেয়। সিরিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০২৪ সালের শেষভাগে। ২৭ নভেম্বর শুরু হওয়া বিদ্রোহী জোটের দ্রুত অগ্রযাত্রার পর ৮ ডিসেম্বর বাশার আল-আসাদের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার পতন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সম্ভাবনা তৈরি করে; কিন্তু একই সঙ্গে নিরাপত্তা, সংখ্যালঘুদের অধিকার, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ এবং বিদেশি বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে আসে।
ইয়েমে হুথি আন্দোলনের উত্থান, কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতা, সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর উত্তরাধিকার, দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী আকাক্সক্ষা এবং সৌদি আরব-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা- সব মিলিয়ে দেশটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
মধ্যপ্রাচ্যের গত দশকের অস্থিতিশীলতা ব্যাখ্যা করতে গেলে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ১৯৬৭ সাল থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা, ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, বসতি সম্প্রসারণ, অবরোধ, বন্দি বিনিময় এবং জেরুজালেমের মর্যাদা- এসব প্রশ্ন দশকের পর দশক ধরে সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বারবার উচ্চারিত হলেও কার্যকর রাজনৈতিক অগ্রগতি সীমিত থেকেছে।
হরমুজ প্রণালি: ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর হরমুজ প্রণালি সংঘাতের একটি প্রধান কৌশলগত ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল সীমিত করার চেষ্টা করে এবং নিজেদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালিটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উন্মুক্ত করা হবে না বলে জানায়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, তেল পরিবহন এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
আগামীর মধ্যপ্রাচ্য: মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। তবে গত দশকের অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, সামরিক বিজয় রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে ইরান, সৌদি আরব, ইসরায়েল, তুরস্ক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর নিরাপত্তা সংলাপ প্রয়োজন। তৃতীয়ত, ফিলিস্তিন সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠনে ধারাবাহিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। যুদ্ধের সময় ত্রাণ দেওয়া জরুরি, কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজে মানুষের জীবন পুনর্গঠনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অপরিহার্য।
সবশেষে, মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কেবল বৃহৎ শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হবে না। অঞ্চলটির সাধারণ মানুষ, তরুণ প্রজন্ম, নারী, নাগরিক সমাজ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যদি মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে অস্ত্রের নীরবতা দীর্ঘস্থায়ী শান্তিতে রূপ নেওয়া কঠিন।
