যশোরের ঝিকরগাছায় চিহ্নিত তিন সন্ত্রাসী চাঁদাবাজের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের দোশতিনা গ্রামের ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষ। এ ব্যাপারে প্রতিকার দাবি করে গত ১১ অক্টোবর যশোরের পুলিশ সুপার বরাবর গণস্বাক্ষরকৃত লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে ভুক্তভোগী পরিবারসহ এলাকাবাসী।
লিখিত ওই অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, দোশতিনা ও জামালপুর ০২নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আইজ উদ্দিন এর দুই ছেলে আব্দুল মজিদ ওরফে টাক মজিদ ও মিজানুর রহমান মিজা, একই গ্রামের কিনু ঢালির ছেলে শামসুর ঢালী ৫ আগস্টের পর থেকে এলাকায় চরম অরাজক ও ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। তারা পরস্পরের যোগসাজশে এলাকার নিরীহ সাধারণ মানুষকে মিথ্যা মামলা, শারীরিক নির্যাতন ও প্রাণনাশের ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
এছাড়া ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দোশতিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি মেহগনি গাছসহ সরকারি সম্পত্তি চুরি করে বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। লিখিত ওই অভিযোগপত্রে চাঁদাবাজের শিকার ভুক্তভোগী ২৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে যার স্বপক্ষে ১শত ২৮জন গণস্বাক্ষর করেছেন।
অভিযোগ পত্র অনুযায়ী, মৃত আজাহার আলীর প্রবাসী ছেলে শহিদুল ইসলামের নিকট থেকে দেড়লাখ টাকা, জামালপুর গ্রামের আব্দুল জলিলের কাছ থেকে ২০হাজার টাকা, মাঠপাড়া এলাকার মৃত শের আলীর ছেলে মকবুল হোসেনের কাছ থেকে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা, মৃত আব্দুল কাদেরের ছেলে শাহিনের কাছ থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা, মৃত ইউসুফ নায়েবের ছেলে মিলনের কাছ থেকে ১ লাখ টাকা, ইমরান চৌকিদারের কাছ থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা, শওকত আলীর কাছ থেকে ৪১ হাজার টাকা, বজলুর ছেলে তুহিন এর কাছ থেকে ৪৫ হাজার টাকা, রাশেদ আলীর কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকাসহ মুস্তাক, রফিক, জসিম, মিলন খা, আলিম, এনায়েত, নুর ইসলাম, জলিল, আবু খায়ের, মকবুল ও লাল্টুর থেকে জনপ্রতি সর্বনিম্ন ১০হাজার থেকে ৪০হাজার টাকা জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী দোশতিনা গ্রামের মৃত কাদেরের ছেলে শাহিন জানান, আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন আমার পিতার রবিউল নামে এক ব্যক্তির নিকট জমি বিক্রি করেছিলে বলে হঠাৎ জানতে পেরেছি। সেই জমির দখল নিয়ে সমস্যা হওয়ায় আব্দুল মজিদ, মিজানুর রহমান মিজাসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ শালিস করে আমার কাছ থেকে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা আদায় করে। সেই টাকা রবিউলকে তারা না দিয়ে আত্মসাত করেছে। বর্তমানে তারা সরকার দলীয় হওয়ায় আমরা কোন প্রতিকার পাচ্ছি না।
আরেক ভুক্তভোগী জসিম উদ্দিন জানান, ৫ আগষ্টের পর মজিদবাহিনী আমাকে সর্বশান্ত করে দিয়েছে। আমার কাছ থেকে নগদ ৩লক্ষ টাকাসহ ৫বিঘা ড্রাগন ফলের বাগান জোর পূর্বক দখল করে নিয়েছে। আমার ক্ষেতে যারা কাজ করে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন পরিমাণে চাঁদা আদায় করেছে। বর্তমানে আমি সর্বশান্ত, আমি এর ন্যায় বিচার চাই।
স্থানীয়রা আরও ভুক্তভোগীরা জানান, মজিদ বাহিনীর অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ। তারা চাঁদা নিতে বাড়িতে আসে না, রাতের আধারে তাদের বাড়িতে দিয়ে আসতে হয়। ৫ আগষ্ট পরবর্তী আমাদেরকে বিভিন্ন পরিমাণে চাঁদা দিতে হয়েছে। চাঁদাবাজির ঘটনায় ঝিকরগাছা থানায় একাধিকবার সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, কোন প্রতিকার হয়নি। সরকার দলীয় হওয়ায় তারা সবসময় ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। প্রশাসনও তাদের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন। দোশতিনা-জামালপুর ২নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুল মজিদের নিকট মুঠোফোনে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এলাকায় কোন চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেনি। বিগত সময়ে বিভিন্ন মানুষের কিছু পাওনা টাকা সালিশ বিচারের মাধ্যমে আদায় করা হয়েছে। যা ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও থানার ওসির অনুমতি নিয়ে করা হয়েছে। এটি নিয়ে বিরোধীপক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
শিমুলিয়া ডিগ্রি কলেজের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান মিজার নিকট এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমাদের দলীয় দুটি গ্রুপ রয়েছে। আমরা সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য সাবিরা নাজমুল মুন্নী সমর্থিত গ্রুপ। আমাদের বিপক্ষ গ্রুপ আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। এলাকায় কোন চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেনি। আমরা সবাই শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছি।
দোশতিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গাছ বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমি শিমুলিয়া ডিগ্রি কলেজের সাবেক সভাপতি। দোশতিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে আমার কোন সম্পৃক্ততা নেই। গাছ বিক্রি হয়েছে কি-না আমি কিছুই জানি না। আমাদের বিরুদ্ধে বিপক্ষ গ্রুপ অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই।
বিদ্যালয়ের গাছ কেটে বিক্রি ও সরকারি সম্পত্তি চুরির বিষয়ে দোশতিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামানের নিকট জানতে চাইলে তিনি জানান, বিদ্যালয়ের প্রাচীর নির্মাণকালে সীমানায় থাকা দুটি গাছ পাশের জমির মালিক তাদের বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু গাছ দুটি বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের লাগানো ছিল। আমি সরকারদলীয় স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে সমন্বয় করে বিক্রি করে দিয়েছিলাম। গাছ বিক্রির টাকা দুই-তৃতীয়াংশ টাকা স্কুল ফান্ডে জমা করা হয় এবং একাংশ তারা নিয়ে নেন। এছাড়া ছুটির সময় বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবন ভাঙ্গা হলে কিছু মাটি ও অন্যান্য মালামাল কে বা কারা চুরি করে নিয়ে যায়, তবে কারা নিয়েছে তা সঠিক করে বলতে পারবো না।
টেন্ডার ছাড়া সরকারী গাছ বিক্রি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি জানান, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় গাছ কাটতে হলে অনেক নিয়মের মধ্যে যেতে হতো বিধায় তৎকালীন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে মৌখিকভাবে জানিয়ে গাছ কর্তন করেছিলাম। গাছ বিক্রির টাকা হতে বিদ্যালয়ের সাইকেল স্ট্যান্ড নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করেছি। এ বিষয়ে জানতে ঝিকরগাছা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দপ্তরে গেলে তাকে না পাওয়ায় তার বক্তব্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তবে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাজমুল হাসান’র নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, দোশতিনা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আমার আওতাভুক্ত। গাছ কাটার বিষয়ে আমি অবগত নই। বিষয়টি আমি খোজ নিচ্ছি। যদি কোন অনিয়ম হয় তাহলে আমি আমার উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
এ বিষয়ে জানতে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ও ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাবিরা নাজমুল মুন্নী’র মুঠোফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান সামাদ নিপুনের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে কল দিয়ে বন্ধ পাওয়ায় তার বক্তব্যও গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। ঝিকরগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ গোলাম কিবরিয়া’র নিকট মুঠোফোনে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, পুলিশ সুপার কার্যালয়ে অভিযোগ হয়েছে কি-না আমি জানি না। তবে আমার কাছে ফরোয়ার্ডিং আসলে আমি আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। তবে এবিষয়ে পুলিশ সুপার যশোরের কোন আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চাঁদাবাজির শিকার ভুক্তভোগীরাসহ গ্রামবাসীর গণস্বাক্ষরিত অভিযোগপত্র পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এতে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধার ও চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীদের হাত থেকে এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দাবী করা হয়েছে এলাকাবাসী।
The post প্রতিকার চেয়ে পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ ঝিকরগাছায় চাঁদাবাজদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ গ্রামবাসী appeared first on ভোরের চেতনা.
