দেশে নতুন ব্যবসা শুরু করতে ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব ও বিভিন্ন অনুমোদন নেওয়ার পর আমদানি নিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করে যন্ত্রপাতির ঋণপত্র খুলতে গড়ে ৩৫৫ দিন লাগে। এই দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে ২০২৭ সালের মধ্যে ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এজন্য একক অনলাইন পোর্টালে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া, বিভিন্ন সংস্থার পরিদর্শন সমন্বিত করা এবং লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সোমবার এক সেমিনারে এসব কথা বলেন। ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) ও বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) যৌথভাবে ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফটিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোস্তফা আবিদ খান।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা শুরু করতে দীর্ঘ সময় লাগলে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন। এ পরিস্থিতি বদলাতে অনলাইনভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা ও ফি পরিশোধ করে দেশ-বিদেশের যেকোনো স্থান থেকে একক অনলাইন পোর্টালে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া যাবে। সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে লাইসেন্সের ফি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছে যাবে।
এছাড়া যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) সেবা পুরোপুরি অনলাইনে আনা এবং বিভিন্ন লাইসেন্সের মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার আলাদা পরিদর্শনের পরিবর্তে সমন্বিত পরিদর্শন চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী।
তার প্রত্যাশা, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে লাইসেন্স ও অনুমতি পেতে উদ্যোক্তাদের দীর্ঘ সময় ব্যয়ের পরিস্থিতি থেকে বের করা সম্ভব হবে।
বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসা সহজ করার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছ আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
তিনি বলেন, দেশে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং রপ্তানির জন্য বিদেশি বাজারে প্রবেশাধিকার—দুটিই নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জ্বালানি সংকটকে নতুন বিনিয়োগের বড় বাধা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে নতুন ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাসকূপ খননে কাজ চলছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এলএনজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত ব্যবস্থা না থাকায় আন্তর্জাতিক সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বাংলাদেশ চাপে পড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৌশলগত মজুত ও সংরক্ষণসক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবার প্রবেশাধিকার বাড়াতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে আট থেকে দশটি দেশের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) বা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে এফটিএ আলোচনার জন্য প্রধান আলোচক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফার কারিগরি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি চলছে, তবে দিনক্ষণ এখনো নির্ধারিত হয়নি। বাংলাদেশের উত্তরণের আগেই আলোচনা শেষ করতে চান বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে ইইউর বাজারে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।
এছাড়া আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসেপ) চুক্তিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া এগোচ্ছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।
তার ভাষ্য, এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন পাওয়া গেছে, এখন প্রক্রিয়াগত কাজ চলছে।
সেমিনারে ইআরএফের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এসএসএম মঈনুল হক অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।
