সংবাদ · সাধারণ
সাজেকে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ইউপিডিএফ-জেএসএস দ্বন্দ্ব
২৪/১০/২০২৬

রাঙামাটির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালির নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক দুই রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) মধ্যে তীব্র সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। এই দ্বন্দ্বের জেরে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে সাজেকের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও পর্যটন খাত। শীতের ভরা মৌসুমে এই সংঘাত ও দফায় দফায় অবরোধের কারণে স্থানীয় অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। চলমান অবরোধ ও সহিংসতার কারণে পর্যটক প্রবেশ বন্ধ থাকায় প্রতিদিন কোটি টাকারও বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ও নেপথ্য কারণস্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে সাজেক ও এর আশপাশের এলাকায় একক আধিপত্য বজায় রেখেছিল ইউপিডিএফ। তবে সম্প্রতি ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের সশস্ত্র কমান্ডার তরুণ চাকমার নেতৃত্বে একটি দল পিসিজেএসএসের (সন্তু গ্রুপ) সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে।গত ২৮ সেপ্টেম্বর মাচালাং বাজার ও বরিছড়ি এলাকা পিসিজেএসএসের দখলে যাওয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এ সময় জেএসএস সাজেকের মাচালাং বাজার ও বরিছড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। ফলে ইউপিডিএফ কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং হারানো নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের মাধ্যমে দফায় দফায় সড়ক অবরোধ ও আন্দোলন শুরু করে।অবরোধ ও তিন দফা দাবিএলাকার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে ইউপিডিএফ-সমর্থিত ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’ ও ‘সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের’ ডাকে সাজেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। অবরোধকারীদের প্রধান তিনটি দাবি হলো - সাজেক থেকে পিসিজেএসএসের ‘সশস্ত্র গোষ্ঠী’কে বিতাড়িত করা, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িতে তল্লাশি বন্ধ করা।গত ২২ অক্টোবর সাজেক থেকে প্রায় তিন হাজার পর্যটককে এস্কর্ট দিয়ে ফিরিয়ে আনার সময় উদয়পুর এলাকায় সড়কে ব্যারিকেড দেওয়া হয়। এ সময় অবরোধকারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার জেরে পরবর্তীতে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় অর্ধদিবস সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দেয় ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ।দৈনিক ১৫-২০ লাখ টাকার লোকসানে পর্যটন ব্যবসানভেম্বর থেকে জানুয়ারি- এই তিন মাস সাজেকের পর্যটনের মূল মৌসুম। কটেজ মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এই মৌসুমে কেবল কটেজ ব্যবসাতেই প্রায় ৩০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। এর সঙ্গে রেস্তোরাঁ, জিপগাড়ি ভাড়া এবং স্থানীয় কৃষিপণ্য (আদা, হলুদ, ফুলঝাড়ু ইত্যাদি) বিক্রির ওপর এলাকাটির অর্থনীতি নির্ভরশীল।চলমান উত্তেজনার কারণে সাজেকের ছোট-বড় প্রায় দেড় শতাধিক কটেজ ও রিসোর্ট এখন পুরোপুরি পর্যটকশূন্য। কটেজ মালিক ও ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, চলমান সংকটে প্রতিদিন কেবল পর্যটন খাতেই ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় গত ২১ অক্টোবর থেকে জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটক ভ্রমণের ওপর অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।সংগঠনগুলোর বক্তব্যপিসিজেএসএসের রাঙামাটি জেলা সভাপতি ড. গঙ্গা মানিক চাকমা এবং কেন্দ্রীয় নেতা সজীব চাকমার দাবি, সাজেকে ইউপিডিএফের নির্যাতন, অপহরণ ও চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয় জনগণই তাদের প্রতিহত করেছে এবং বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তাদের দল সরাসরি জড়িত নয়।অন্যদিকে, ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা দাবি করেছেন, সাজেকবাসীকে রক্ষা ও জেপিএস সন্ত্রাসীদের হটাতে ন্যায্য দাবিতেই এলাকাবাসী শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছে। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পর্যটকদের এস্কর্ট দিয়ে নামিয়ে আনার সময় সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে অবরোধ সৃষ্টি করে হামলা চালানো হয়।প্রশাসনের অবস্থানআইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সাজেক ও আশপাশের এলাকায় যৌথবাহিনীর টহল ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সার্বিক নিরাপত্তায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗