ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠতে যাচ্ছে দেশের ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে। প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। গত ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে মায়ের আগমনী বার্তা ও দেবীপক্ষ সূচনা হয়েছে। এরপর থেকেই ভক্তরা দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। এখন চলছে উৎসবের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, হিন্দুদের সব থেকে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতে থাকে নানা আয়োজন। প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও দর্শনার্থীদের চলাচলের ব্যবস্থা, সবকিছু নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করেন আয়োজকরা। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। এবার দেবীর আগমন ঘোটকে এবং গমন করবেন নৌকায়। পূজার দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রস্তুতির গতি।
ইতোমধ্যে দেশের অধিকাংশ পূজামণ্ডপে প্রস্তুতির কাজ শেষ হয়েছে। কোথাও চলছে আলোকসজ্জার কাজ, কোথাও প্রতিমা ও মণ্ডপের সৌন্দর্যবর্ধন। পূজাকে ঘিরে বাজারগুলোতেও বেড়েছে মানুষের আনাগোনা। নতুন পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও শিশুদের পছন্দের জিনিসপত্র কিনতে ব্যস্ত বিভিন্ন বয়সী মানুষ। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে উৎসবে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনাও করছেন অনেকে। সব মিলিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আমেজ।
মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হওয়ার পর থেকেই ভক্তদের অপেক্ষা ছিল মহাষষ্ঠীর। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। আজ মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। সকালে ষষ্টীপূজা ও সন্ধ্যায় মায়ের বোধন হবে। বোধন শব্দের অর্থ জাগরণ বা চৈতন্যপ্রাপ্ত। শরৎকালের দুর্গাপূজায় এ বোধন করার বিধান রয়েছে। বিভিন্ন পুরাণ অনুসারে ভগবান রামচন্দ্র শরৎকালে রাক্ষসরাজ রাবণকে বধের উদ্দেশ্যে দুর্গাপূজা করেন। তিনি অকালে এ বোধন করেন বলেই এটি অকালবোধন নামে খ্যাত। তবে বসন্তকালে চৈত্র মাসে যে দুর্গাপূজা বা বাসন্তীপূজা অনুষ্ঠিত হয়, তাতে বোধনের প্রয়োজন হয় না।
গতকাল বৃহস্পতিবার শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী মন্দির মিলনাতয়ে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি যৌথ আয়োজিত শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ এর সভাপতি বাসুদেব ধর, সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ। সভায় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস (সাধন)।
সারাদেশে পূজার সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ এর সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা বলেন, পূজার পাঁচদিনের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবলে হবে না, বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ গড়তে চাইলে ৩৬৫ দিনের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হবে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটাতে হবে। দুর্বৃত্তদের বিচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে উৎসব শুরুর আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৪টি পূজামণ্ডপে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে উৎসবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এরমধ্যে প্রতিমা ভাঙচুরসহ বিভিন্ন অপ্রীতিকর ১১টি ঘটনায় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এদিকে পঞ্জিকানুযায়ী, এবার মহাসপ্তমী পূজায় ব্যতিক্রম ঘটছে। তিথি অনুযায়ী এবার আগামীকাল শনিবার ও রবিবার, দুই দিন মহাসপ্তমী পূজা হবে। এরপর সোমবার মহাষ্টমী ও মঙ্গলবার মহানবমী পূজা হবে। পরদিন বুধবার বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে পূজার মূল আয়োজন। পূজার প্রতিটি দিনেই মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীদর্শন, অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, আরুতিসহ নানা ধর্মীয় আচার পালন করবেন ভক্তরা। পাশাপাশি থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক আয়োজন।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর জানান, এবার সারাদেশে প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছর সারাদেশে ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মণ্ডপে পূজা হয়েছিল। সে হিসাবে এবার মণ্ডপ বেড়েছে ৪৯৬টি। তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকার আসার পর জনমনে আস্থা বেড়েছে। তাই পূজা মণ্ডপের সংখ্যাও বেড়েছে। এবার দীর্ঘ ছুটিতে মানুষের অংশগ্রহণও বাড়বে। তাই দর্শনার্থীর চাপ সামলানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। নিরাপত্তার স্বার্থে মণ্ডপে সিসিটিভি, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পূজাকে ঘিরে শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই নয়, বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেও উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি দুর্গোৎসব হয়ে ওঠে মিলন, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উদ্যাপনের উপলক্ষ। ইতোমধ্যে পূজা উপলক্ষে তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এরমধ্য দিয়ে পূজায় টানা ৫ দিনের ছুটি থাকছে।
এদিকে দুর্গোৎসব সামনে রেখে পোশাক ও অন্যান্য সামগ্রী কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মানুষ। রাজধানীর বিপণিবিতান, শপিংমল ও স্থানীয় বাজারগুলোতে উৎসবের কেনাকাটা ঘিরে বাড়ছে ক্রেতাদের উপস্থিতি। শিশু-কিশোরদের জন্য নতুন পোশাক, পরিবারের সদস্যদের উপহার এবং পূজার দিনগুলোতে পরার জন্য পছন্দের পোশাক কিনছেন অনেকে।
জানা যায়, পূজার দিনগুলোতে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে দেখার পরিকল্পনাও করছেন তরুণ-তরুণীরা। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর আলোকসজ্জায় সজ্জিত মণ্ডপগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়বে বলে আশা করছেন আয়োজকরা। তবে কেনাকাটার ব্যস্ততার পাশাপাশি যানজট, জনসমাগম ও নিরাপদে চলাচলের বিষয়েও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।
দুর্গোৎসব নির্বিঘ্নে উদ্যাপনে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পূজামণ্ডপ, মন্দির ও জনসমাগমস্থলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, দর্শনার্থীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় সংশ্লিষ্টদের প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পূজার আয়োজকদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে উৎসবের পরিবেশ নিরাপদ রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে মণ্ডপের শৃঙ্খলা, দর্শনার্থীদের চলাচল, স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব পালন এবং জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিআলো/অর্নব