অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনের উত্তরে চেকপোস্টে বন্দুকযুদ্ধের পর ঘটনাস্থলে ইসরায়েলি সেনারা। ছবি: সংগৃহীত
অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন শহরের কাছে বন্দুকযুদ্ধের পর পুরো পশ্চিম তীরে পূর্ণ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গতকাল শুক্রবার সকালে এ ঘটনায় দুই ফিলিস্তিনি নিহত এবং অন্তত পাঁচ ইসরায়েলি আহত হন। আহতদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
আগামী মঙ্গলবার ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এ ঘটনা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হেবরনের কাছে একটি সামরিক চেকপোস্টের আশপাশে বন্দুকধারীদের হামলার পর সেনারা পাল্টা গুলি চালান। এতে দুই ফিলিস্তিনি নিহত হন। সেনাবাহিনীর দাবি, তারা ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে সম্ভাব্য বড় ধরনের হামলার চেষ্টা নস্যাৎ করেছে। নিহত দুই ফিলিস্তিনি হেবরনের বাসিন্দা ছিলেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত দুজনের কাছে একটি এম১৬ রাইফেল ও একটি পিস্তল ছিল। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি তারা। এ ঘটনায় আহত ব্যক্তিরা সেনাসদস্য নাকি বেসামরিক নাগরিক, তাৎক্ষণিকভাবে সেটিও স্পষ্ট করা হয়নি।
ইসরায়েলের জরুরি চিকিৎসাসেবা সংস্থা ম্যাগেন ডেভিড আদম জানিয়েছে, বন্দুকযুদ্ধে অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। আহতদের ইসরায়েলের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, হেবরনের কাছে একটি চেকপোস্টে দুই সশস্ত্র ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে গোলাগুলি হয়। ঘটনাস্থলে দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপত্তা অভিযান চলে।
হেবরন ঘিরে ফেলার নির্দেশ
ঘটনার পর নেতানিয়াহু নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। এরপর তিনি হেবরন শহর অবিলম্বে ঘিরে ফেলা এবং পুরো পশ্চিম তীরে পূর্ণ অবরোধ কার্যকরের নির্দেশ দেন।
নেতানিয়াহু বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী একটি বড় ধরনের হামলা প্রতিহত করেছে। হামলার পরিকল্পনার জন্য হামাসকে দায়ী করলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রমাণ প্রকাশ করেননি তিনি।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানায়, গতকাল থেকেই পশ্চিম তীরে পূর্ণ অবরোধের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে পুরো ভূখণ্ডে কী ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর হবে এবং তা কতদিন স্থায়ী হবে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ঘটনার পর আশপাশের এলাকায় তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আটক এবং সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক বন্ধ ও চেকপোস্টে কড়াকড়ি আরোপ করা হলে ফিলিস্তিনিদের কর্মস্থল, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজারে যাতায়াত ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতীতেও ইসরায়েলি বাহিনীর এ ধরনের বিধিনিষেধের কারণে ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামের মধ্যে যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়েছে।
পশ্চিম তীরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এ ঘটনার পর পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের চলাচলে আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ভেঙে দেওয়া ও নিরস্ত্রীকরণের দাবি জানান।
বেন-গভিরের বক্তব্য অনুযায়ী পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী, সেনা ও পুলিশের নিরাপত্তাকে ফিলিস্তিনিদের অবাধ চলাচলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তবে শুক্রবারের হামলার সঙ্গে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। হামাস হামলার প্রশংসা করলেও সংগঠনটি এর দায় স্বীকার করেনি বলে এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বিরোধের বিষয়। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশের মতে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি। ইসরায়েল এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়ে থাকে।
নির্বাচনের আগে উত্তেজনা বৃদ্ধি
আগামী মঙ্গলবার ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন। এর আগে হেবরনের বন্দুকযুদ্ধের পর নেতানিয়াহু কয়েকটি নির্বাচনি কর্মসূচি বাতিল করেন। এদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর হামলা, জমিতে প্রবেশে বাধা ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে।
ফিলিস্তিনের উপনিবেশায়ন ও দেয়াল প্রতিরোধ কমিশনের দাবি–বৃহস্পতিবার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীরা ১৭টি হামলা চালিয়েছে। বুধবার কৃষকদের জলপাই সংগ্রহে সহায়তা করার সময় যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস প্রার্থী ব্র্যাড ল্যান্ডারকেও অল্প সময়ের জন্য আটক করে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। হেবরনের ঘটনার পর পশ্চিম তীরে পূর্ণ অবরোধ কার্যকর হলে ফিলিস্তিনিদের চলাচলে আরও বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
