২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অভিবাসন রুটে অন্তত চার হাজার ৪১৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ইউরোপের ক্ষেত্রে বেলারুশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সীমান্তে নিহত অভিবাসীদের মধ্যে শিশুদের অনুপাত সবচেয়ে বেশি। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) এক পরিসংখ্যানে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অভিবাসন পথে অন্তত ৪ হাজার ৪১৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সংস্থাটির নিখোঁজ অভিবাসীবিষয়ক তথ্যভান্ডারে ওই সময়ে নথিভুক্ত ৮১ হাজার মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনার মধ্যে ৫.৫ শতাংশ শিশু।
তবে আইওএমের দেওয়া এসব তথ্য সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া উচিৎ। কারণ, অভিবাসন পথে নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা এবং বিশেষ করে তাদের বয়স নির্ধারণের তথ্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ফলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
আরও পড়ুন
মৃত অভিবাসীদের মধ্যে শিশুদের অনুপাত সবচেয়ে বেশি বেলারুশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যবর্তী সীমান্তে। সেখানে নিহত অভিবাসীদের ২৮ শতাংশ শিশু, যা মোট নিহতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
এরপর রয়েছে সিরিয়া ও তুরস্কের মধ্যবর্তী পথ, যেখানে নিহতদের ২৩ শতাংশ শিশু। পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথে এই হার ২১ শতাংশ এবং ইংলিশ চ্যানেলে ১৪ শতাংশ।
বুধবার প্রকাশিত এ বিষয়ে এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে আইওএম। আইওএমের মহাপরিচালক অ্যামি পোপ বলেন, শিশুরা কোনো অভিভাবক বা আইনি অভিভাবকের সুরক্ষা ছাড়াই কঠিন ও বিপজ্জনক যাত্রা করে। নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ সীমিত থাকায় এবং মানবপাচারকারীদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হওয়ায় তারা সহিংসতা ও শোষণের ঝুঁকিতে পড়ে। কোনো শিশুরই একা এসব ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া উচিত নয়।
• প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি
অভিবাসন পথে নিহত শিশুদের বিষয়ে এসব তথ্য সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, নথিভুক্ত মৃত্যুর সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় কম। আইওএমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিবাসীদের সামগ্রিক মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও অভিবাসন চলাকালে নিহত শিশুদের অনেকের মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয় না এবং সেগুলো ব্যাপকভাবে আড়ালেই থেকে যায়।
এর একটি কারণ, অভিবাসনের কিছু অত্যন্ত প্রাণঘাতী পথে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা নথিভুক্ত সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে ইতালি ও মাল্টায় পৌঁছানো অভিবাসীদের ১৯ শতাংশ ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক। অথচ মধ্য ভূমধ্যসাগরে নথিভুক্ত ডুবে মৃত্যুর ঘটনাগুলোর মাত্র ২ শতাংশ ছিল অপ্রাপ্তবয়স্কদের।
আইওএম বলেছে, বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ভয়, অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতা এবং মরদেহ উদ্ধারের ক্ষেত্রে নানা জটিলতাসহ বিশেষ করে সমুদ্রে অসংখ্য মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত না হওয়ার কারণ।
• নৌকাডুবিতে আটকে পড়ে শিশুরা
মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা কম নথিভুক্ত হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সি কিশোরদের অনেক সময় শিশু হিসেবে শনাক্ত করা হয় না। ফরেনসিক চিকিৎসকের বিস্তারিত পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত তাদের মরদেহকে শিশু হিসেবে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
আইওএমের ‘মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্ট’র তথ্যভান্ডারে নথিভুক্ত ৪৪ হাজারের বেশি অভিবাসীর মৃত্যুর ঘটনায় অর্ধেকেরও বেশি ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির বয়সসংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই।
বয়স অজানা এমন মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছে পানিতে ডুবে। এ সংখ্যা ৩৬ হাজার ৬২৬। তবে নৌকাডুবির ঘটনায় নথিভুক্ত না হওয়া শিশুদের মৃত্যুর আশঙ্কা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে আইওএম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় নৌযানগুলোতে যাত্রার সময় শিশুদের প্রায়ই ডেকের নিচে আটকে রাখা হয় বলে বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে উঠে এসেছে। এর ফলে বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে আসার মতো বিপদের ঝুঁকি বাড়ে। নৌকাডুবির ঘটনা ঘটলে তারা আটকে পড়ে পালাতে না পারার আশঙ্কাও বেশি থাকে।
• ‘মৃত্যু সনদে অভিবাসী পরিচয় উল্লেখ থাকে’
কর্তৃপক্ষের শনাক্ত করতে না পারা মরদেহের সংখ্যা নিয়েও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন কবরস্থানে এসব মরদেহ নামহীন অবস্থায় এবং আনুমানিক বয়স উল্লেখ করে দাফন করা হতে পারে। কিন্তু তাদের অভিবাসী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয় না।
আইওএম বলেছে, বর্তমানে বিশ্বের খুব কম মৃত্যু সনদেই মৃত ব্যক্তিকে অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এসব মৃত্যুর ঘটনা আরও ভালোভাবে নথিভুক্ত করার জন্য কয়েকটি গবেষণা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্পেনের সীমান্ত নিয়ে আমস্টারডামের ভ্রিজে ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণা। এ কাজের ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি ‘কাউন্টিং দ্য ডেড’ বা ‘মৃতদের গণনা’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে অভিবাসন পথে নিহত হিসেবে আইওএমের নথিভুক্ত ৪ হাজার ৪১৪ শিশুর মধ্যে মাত্র ৮২০ জনের মৃত্যুর তথ্য এসেছে সরকারি সূত্র থেকে। অর্থাৎ, এসব শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে প্রকৃত সরকারি মৃত্যু সনদ রয়েছে।
অভিবাসন পথে নিহত শিশুদের সঠিক সংখ্যা নথিভুক্ত করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে আইওএম। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ফরেনসিক চিকিৎসক ও বেসরকারি সংস্থা। পাশাপাশি, বিদ্যমান মৃত্যুর নথিপত্র পর্যালোচনা করে মৃত ব্যক্তিদের অভিবাসন-সংক্রান্ত পরিচয়ের ভিত্তিতে শ্রেণিবদ্ধ করারও সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। ইনফোমাইগ্রেন্টস।
এসএস
