ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্য সমর্থিত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য দেলাওয়ার হোসেন বলেছেন, “মসজিদ যেভাবে পাহারা দিতে হয় না, আমি নির্বাচিত হলে মন্দিরও পাহারা দিতে হবে না।”
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, “যারা হিন্দুদের সংখ্যালঘু আখ্যায়িত করেছে, ব্যালটের মাধ্যমে তাদের বয়কট করতে হবে।” জামায়াতে ইসলামী এ দেশে জাতিগত বিভাজনে বিশ্বাস করে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমাজের প্রতিটি মানুষ রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে এক ও অভিন্ন। ইসলামী নেতৃত্বে সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নাগরিকদের বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
শনিবার সকালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বেগুনবাড়ি ইউনিয়নের কালীতলায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় আগামী ২৯ অক্টোবর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে নিজেদের নাগরিক মর্যাদা ও অধিকার বুঝে নেওয়ার জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
দেলাওয়ার হোসেন বলেন, “দাঁড়িপাল্লা বিজয়ী হলে ঠাকুরগাঁওয়ের জনগণের বিজয় হবে, জনগণের মুক্তি আসবে।” জনগণ আজ পরিবারতন্ত্রের শিকলে বন্দি উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতে যারা ঠাকুরগাঁওয়ের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জনগণকে শোষণ করেছেন এবং দুর্নীতি, অনিয়ম, দলীয়করণ, আত্মীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি করেছেন, তাঁদের কিংবা তাঁদের পরিবারকে আর সুযোগ দেওয়া যায় না।
তিনি আরো বলেন, তাঁরা সুযোগ পেলেই দুর্নীতি, অনিয়ম, দলীয়করণ, আত্মীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে জনগণের সম্পদ নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেবেন।
দেশে সার সংকটের চিত্র তুলে ধরে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, “সার সংকটের একমাত্র কারণ হচ্ছে, সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এমপিদের আত্মীয়-স্বজনকে। কোথাও কোথাও এমপির স্ত্রী, ছেলে, ভাই এবং পুত্রবধূকে সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই দলীয়করণ ও দুর্নীতির কারণে দেশে সারের সংকট সৃষ্টি হয়েছে।”
তিনি বলেন, এর ফলে কৃষক সার পাচ্ছেন না এবং কৃষি উৎপাদনে ধস নামতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা ক্রমেই বাড়ছে।
বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র সাত মাসের মাথায় দেশের প্রতিটি সেক্টরে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। যেদিকে হাত দেবেন, কেবল নাই আর নাই! গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, তেল নেই, সার নেই।”
তিনি আরো বলেন, বিএনপির শাসনামলে কৃষকদের সারের জন্য রাজপথে জীবন দিতে হয়েছে। এখনো সারের জন্য কৃষকদের আন্দোলন করতে হচ্ছে। ঠাকুরগাঁওয়ে সরকারদলীয় ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে কৃষকেরা সার ও কীটনাশক পাবেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, দলীয়করণ ও আত্মীয়করণের মাধ্যমে এসব সম্পদ পাচার হয়ে যাবে।
দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী নির্বাচিত হলে ঠাকুরগাঁওয়ে দুর্নীতি, অনিয়ম, আত্মীয়করণ ও দলীয়করণ চলবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। একই সঙ্গে দলমত, ধর্ম-বর্ণ ও জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে আগামী ২৯ অক্টোবর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে জনগণের বিজয় নিশ্চিত করতে স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান জানান।
‘জামায়াতের নির্বাচিত এমপিদের এলাকায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা সমান অধিকার পাচ্ছেন’
সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন।
তিনি বলেন, “সারাদেশে জামায়াতে ইসলামীর ৬৮ জন নির্বাচিত এমপি রয়েছেন। তাঁদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সমান সুযোগ-সুবিধা, নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা লাভ করছেন।”
কাউকে বোরকা পরতে বাধ্য করা হচ্ছে কিংবা জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা হিন্দুদের বাড়িঘর দখল করেছেন—এমন কোনো সংবাদ কেউ শুনেছেন কি না, উপস্থিত লোকজনের কাছে জানতে চান তিনি। এ সময় উপস্থিত শত শত হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ একবাক্যে ‘না’ বলে জবাব দেন বলে সভায় জানানো হয়।
ড. হেলাল উদ্দিন বলেন, “জামায়াতে ইসলামী নয়, বরং যারা হিন্দুদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল এবং জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালিয়েছে, তারাই হিন্দুদের সম্পদ দখল দিয়েছে। বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে, হিন্দুদের ওপর জুলুম করেছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, এসব রাজনৈতিক শক্তি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে মূল্যায়ন করেনি; বরং তাঁদের সংখ্যালঘু হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, যা জাতির জন্য লজ্জার। জামায়াতে ইসলামী জাতিগত বিভাজন ও ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত করায় বিশ্বাসী নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দলটি বিশ্বাস করে, সমাজের প্রতিটি মানুষ রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে এক ও অভিন্ন।
আগামী ২৯ অক্টোবর দলমত, ধর্ম-বর্ণ ও জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ড. হেলাল উদ্দিন বলেন, “শুধু ভোট দিলেই নাগরিকের দায়িত্ব শেষ নয়। নিজের ভোট যাতে লুট হতে না পারে, কেউ যেন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ফলাফল পাল্টে দিতে না পারে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।” এ জন্য তিনি স্থানীয়দের প্রতি অনুরোধ জানান।
মাওলানা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের সভাপতিত্বে এবং বেগুনবাড়ি ইউনিয়ন আমির মাওলানা মিজানুর রহমানের পরিচালনায় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কৃষি সেলের প্রধান ও যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক গোলাম মর্তুজা সেলিম।
এ সময় এনসিপির ঠাকুরগাঁও জেলা আহ্বায়ক খলিলুর রহমানসহ স্থানীয় ১১ দলীয় ঐক্যের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
