প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:২৭ পিএম
বান্দরবানের লামার সবুজ পাহাড়ে এখন সোনালি ধানের হাওয়া। অনুকূল আবহাওয়ায় এবার পাহাড়ি ঢালে জুমের বাম্পার ফলন হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে তুলতে আনন্দঘন পরিবেশে ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জুমচাষিরা। আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা, এরপরই পাহাড়ি পল্লিগুলোতে শুরু হবে ঐতিহ্যবাহী নববর্ষের উৎসব।
স্থানীয় জুমচাষিরা জানান, জুম চাষে রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়া। সাধারণত নভেম্বর ও ডিসেম্বরে জুম চাষের উপযোগী পাহাড়ি জমি নির্বাচন করা হয়। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ওই জমিতে জঙ্গল কাটার কাজ চলে। কাটা জঙ্গল রোদে শুকানোর পর মার্চ-এপ্রিলে ফায়ারিং লাইন তৈরি করে সতর্কতার সঙ্গে তা পোড়ানো হয়। এপ্রিলের শেষ দিকে জমি পরিষ্কার করে প্রথম বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকেন চাষিরা। বৃষ্টির দেখা মিললে মাটিতে গর্ত করে ধানের বীজের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের ফসল বপন করা হয়। সবশেষে আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ।
লামা সদর ইউনিয়নের লোলাইশন, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের মিরিঞ্জা ও বদুরঝিরি এবং রূপসীপাড়া ইউনিয়নের নাইক্ষ্যংমুখ ও গজালিয়াসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাহাড়ের বুকজুড়ে সোনালি ধান বাতাসে দোল খাচ্ছে। মাচাংঘরগুলোতে ধান মাড়াইয়ের কাজে দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন নারী-পুরুষ জুমচাষিরা।
মিরিঞ্জা ম্রো পাড়ার জুমচাষি চিনিঅং ম্রো জানান, এবার তিনি প্রায় পাঁচ একর পাহাড়ি জমিতে জুম চাষ করেছেন। প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চাষ করায় ফলনও ভালো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, জুমে ধানের পাশাপাশি বেগুন, বরবটি, মারফা, ভুট্টা, তিল ও মরিচসহ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ ধরনের ফসলের চাষ হয়। এসব ফসল পাহাড়ি পরিবারের সারা বছরের খাদ্যচাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে লামা উপজেলায় এক হাজার ২০৫ হেক্টর জমিতে জুম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ থেকে প্রায় এক হাজার ৬০৩ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন লামা উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা অভিজিৎ বড়ুয়া।
ধানের পাশাপাশি মিষ্টিকুমড়া, ভুট্টা, মারফা ও চিনালের মতো ফসলও জুমচাষিদের ঘরে সমৃদ্ধি আনছে। পাহাড়ের জুমঘর থেকে ধান সংগ্রহ ও শুকানোর পর নতুন চালের ভাত এবং পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী বৈচিত্র্যময় খাবারে মেতে উঠবেন জুমিয়া পল্লির মানুষ।
জুমের এই প্রাচুর্য পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় নতুন আনন্দের আবহ তৈরি করেছে। সোনালি ফসল ঘরে তোলার মধ্য দিয়ে পাহাড়জুড়ে এখন ঐতিহ্যবাহী নববর্ষের উৎসবের অপেক্ষা।
