নিজস্ব ছবি এই সময়
Published on
:
3 min read
গৌতম রায়
‘পুজো’ মানেই এক সময়ে শুধু দুর্গাপুজোই ছিল না— ‘পুজো’ মানে ছিল বাড়ি ফেরা। বাংলা তখনও দু’ভগে ভাগ হয়নি। ঘটি- বাঙালের আকচা-আকচিতে ছিল স্রেফ মজা। ছিল না কোনও বিদ্বেষ। কলকাতায় কর্মরত মানুষদের কাছে শরতের কয়েকটি দিন যেন সারা বছরের অপেক্ষার শেষ প্রান্ত। অবিভক্ত বাংলার সেই সময়ে কলকাতা ছিল কাজের শহর, আর ‘দেশ’ ছিল মানুষের শিকড়ের ঠিকানা। কেউ নদিয়ার গ্রামে, কেউ যশোরে, কেউ ফরিদপুরে, কেউ বরিশালে, কেউ খুলনা বা ময়মনসিংহে রেখে আসা সংসারের কাছে ফিরতেন পুজোর ছুটিতে। আর সেই ঘরে ফিরে যাওয়ার সবচেয়ে বড় সাক্ষী ছিল শিয়ালদা স্টেশন।
পুজোর কয়েক দিন আগে থেকেই শিয়ালদা যেন আর নিছক একটি রেলস্টেশন থাকত না। সে হয়ে উঠত এক বিশাল সামাজিক মিলনক্ষেত্র। মাথার উপর ঝোলানো লণ্ঠন, কুলিদের হাঁক, চায়ের ভাঁড়ের ধোঁয়া, ট্রেনের হুইসেল আর মানুষের কোলাহলের মধ্যে দেখা হয়ে যেত কত পরিচিত মুখের সঙ্গে। অফিসের সহকর্মী, পাড়ার পরিচিত, দূরসম্পর্কের আত্মীয়, গ্রামের প্রতিবেশী— কে যে কখন কার সঙ্গে একই কামরায় উঠে পড়তেন, তার ঠিক ছিল না। সঙ্গে থাকত বড় বড় লোহার ট্রাঙ্ক, কাপড়ের বস্তা, বাঁশের ঝুড়ি, বিছানার পোঁটলা। কলকাতায় থাকা মানুষটি শুধু নিজে বাড়ি ফিরতেন না, সঙ্গে নিয়ে যেতেন শহরের নানা সামগ্রী। কারও জন্য শাড়ি, কারও জন্য জামা, ছোটদের জন্য খেলনা, বাড়ির মায়ের জন্য মিষ্টি, বাবার জন্য ওষুধ, আর পাড়ার ছেলেদের জন্য কলকাতার গল্প। সেই সব জিনিসের মধ্যে দিয়ে কলকাতা পৌঁছে যেত গ্রামের উঠোনেও। শিয়ালদার প্ল্যাটফর্মে তখন বিদায়ের দৃশ্যও ছিল বড় আবেগের। কেউ শেষ মুহূর্তে জানালা দিয়ে হাত নাড়ছে, কেউ বারবার বলে যাচ্ছে, ‘চিঠি দিও’, কেউ আবার বলছে, ‘পৌঁছে খবর দিও’। ট্রেন ছেড়ে দিলে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যেত, আর ট্রেনের কামরায় বসা মানুষটির চোখে ভেসে উঠত বাড়ির উঠোন, পুকুর, তালগাছ, মাটির রাস্তা, পরিচিত মুখ।
এই যাতায়াতের একটা গভীর সামাজিক নিহিতার্থও ছিল। কলকাতা তখন ক্রমশ কর্মসংস্থানের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠছিল। কিন্তু শহরে কাজ করলেই মানুষ তার গ্রামকে ভুলে যেত না। বরং পুজো ছিল সেই সম্পর্ককে প্রতি বছর নতুন করে জাগিয়ে তোলার সময়। শহর ও গ্রামের মধ্যে শুধু মানুষের নয়— অর্থ, খবর, সংস্কৃতি এবং আবেগেরও যাতায়াত ঘটত। কলকাতার উপার্জন গ্রামের সংসারে পৌঁছত, আর গ্রামের চাল, ডাল, গুড়, শাকসবজি কিংবা ঘরের তৈরি খাবারও শহুরে আত্মীয়ের কাছে আসত। আরও একটি সুন্দর বিষয় ছিল— এই বাড়ি ফেরার মধ্যে ধর্মের বিভাজন খুব স্পষ্ট ছিল না। হিন্দু কর্মচারী যেমন পুজোর ছুটিতে দেশে ফিরতেন, তেমনই মুসলমান সহকর্মী বা প্রতিবেশীরাও ঈদ কিংবা অন্য পারিবারিক উপলক্ষে নিজেদের গ্রামে ফিরতেন। একই পাড়ায় থাকা মানুষ একে অপরের যাত্রার খবর রাখতেন, প্রয়োজনে টিকিট জোগাড়ে সাহায্য করতেন, স্টেশনে পৌঁছে দিতেন। উৎসব আলাদা হতে পারে, কিন্তু বাড়ি ফেরার আকুলতা ছিল একই। তার পর এল ১৯৪৭। মানচিত্র বদলে গেল। যে ‘দেশ’ এত দিন ছিল অবিভক্ত বাংলার একটি স্বাভাবিক ভূগোল, তারই এক অংশ হয়ে গেল অন্য রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল, ঢাকা, ময়মনসিংহ— অসংখ্য মানুষের কাছে পরিচিত সেই নামগুলি হঠাৎই হয়ে উঠল সীমান্তের ও পারের ঠিকানা। মানুষের কাছে ‘দেশে যাওয়া’ আর আগের মতো সহজ রইল না।
তবু ইতিহাসের বড় আঘাতের পরেও অভ্যাস সহজে মরে না। দেশভাগের পর কয়েক বছর শিয়ালদায় পুজোর ভিড়ের মধ্যে সেই পুরোনো দৃশ্যের কিছুটা থেকে গিয়েছিল। মানুষ সীমান্ত পার হয়ে, নানা কাগজপত্রের ঝামেলা পেরিয়ে, কখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে, তবু এক বার বাড়ি যেতে চাইতেন। কারণ বাড়ি তখন আর কেবল একটি বাড়ি ছিল না— তা ছিল হারিয়ে যেতে বসা অতীতের সঙ্গে শেষ সংযোগ। ক্রমে সেই যাতায়াতও বদলে গেল। উদ্বাস্তু জীবন, স্থায়ী পুনর্বাসন, নতুন কর্মজীবন, নতুন শহর ও নতুন প্রজন্ম মানুষকে কলকাতার সঙ্গেই স্থায়ী ভাবে বেঁধে ফেলল। ‘দেশ’ শব্দটির অর্থও বদলে গেল। কারও কাছে দেশ রয়ে গেল ও পারের গ্রাম, কারও কাছে শিয়ালদা থেকে পৌঁছে যাওয়া নতুন শহরতলি, কারও কাছে বাবা-মায়ের মুখে শোনা একটি হারিয়ে যাওয়া ভূগোল। শিয়ালদা এখনও ব্যস্ত। প্রতি দিন অসংখ্য মানুষ সেখানে আসেন, যান। কিন্তু সেই পুজোর সময়কার বাড়ি ফেরার আবেগ আর আগের মতো নেই। এখন যাতায়াত দ্রুত, যোগাযোগ সহজ, দূরত্ব ছোট। অথচ আশ্চর্য ভাবে, সেই পুরোনো সময়ের মানুষের কাছে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের পথই ছিল এক গভীর আবেগের যাত্রা।
শিয়ালদার সেই পুজোর ভিড় তাই কেবল নস্টালজিয়ার বিষয় নয়। তার মধ্যে ধরা আছে এক সময়ের বাংলার সামাজিক ইতিহাস—শহর ও গ্রামের সম্পর্ক, কর্মজীবী মানুষের শিকড়ের টান, উৎসবের সামাজিক ভূমিকা এবং দেশভাগের অভিঘাতে একটি পরিচিত ভূগোলের ভেঙে যাওয়ার ইতিহাস। আজও শরতের আকাশে কাশফুল দোলে, ঢাক বাজে, ট্রেন ছুটে যায়। হয়তো কোনও বৃদ্ধ মানুষের স্মৃতিতে তখনও ভেসে ওঠে সেই শিয়ালদা— কাঁধে ব্যাগ, হাতে ট্রাঙ্ক, চার দিকে পরিচিত মুখ, আর সামনে বাড়ি ফেরার আনন্দ। যে বাড়ির অনেকটাই হয়তো আর নেই, যে পথের মাঝখানে আজ একটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত, কিন্তু স্মৃতির মধ্যে যার দরজা এখনও খোলা।
আর সেই কারণেই শিয়ালদা শুধু একটি স্টেশন নয়। এক সময়ে তা ছিল বাংলার মানুষের বাড়ি ফেরার দরজা— একটি দরজা, যার এক পারে ছিল কলকাতার কর্মব্যস্ত জীবন, আর অন্য পারে ছিল শৈশব, পরিবার, মাটি এবং ‘দেশ’। একটি শিশু শৈশবকালে ভাবে কখন বাবার মতো বড় হব। আর একজন প্রৌঢ়, প্রৌঢ়ত্বে এসে হাতড়াতে থাকেন ফেলে আসা শৈশবকে। ভাবেন, যদি পারতাম ছেলেবেলায় ফিরে যেতে। নেট-দুনিয়ায় মেতে থাকা বাঙালি হয়তো পুজো এলেই জ্ঞাতসারে হোক বা অবচেতনে স্মরণ করে শঙ্খ ঘোষের পঙক্তি— ‘তোমায় আমি বুকের ভিতর নিইনি কেন রাত্রি বেলা!’
লেখক প্রাবন্ধিক
