২৫ মিনিট আগে
সর্বশেষ আপডেট: ২৫ মিনিট আগে
স্টার অনলাইন ডেস্ক
জন এফ কেনেডি ও নিকিতা ক্রুশ্চেভ। ফাইল ছবি: রয়টার্স
১৯৬২ সালের ১৪ থেকে ২৮ অক্টোবর। পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ও তার ভাই রবার্ট কেনেডির বিচক্ষণতায় শেষ পর্যন্ত সেই ভয়াবহ সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়।
সংকটের সময় হোয়াইট হাউসের ভেতরে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে পরে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা।
১৯৬২ সালের ২৯ অক্টোবর বিবিসির প্যানোরামা অনুষ্ঠানের এক উপস্থাপক বলেছিলেন, ‘মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সপ্তাহ ছিল এটি।’
এর শুরু ১৪ অক্টোবর। সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিমানের তোলা ছবিতে দেখা যায়, দেশটির উপকূল থেকে মাত্র ৯০ মাইল বা প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে কিউবায় গোপনে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বসাচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন।
পরবর্তী দুই সপ্তাহে বিশ্বের দুই পরাশক্তির মধ্যে উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়। শেষপর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিতে রাজি হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ও তার ভাই রবার্ট কেনেডির কূটনৈতিক দক্ষতা এই সংকট সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এর পাশাপাশি ওয়াশিংটনের একটি পানশালায় শোনা কথোপকথনও সোভিয়েত নেতাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল।
যেভাবে সংকটের শুরু
১৯৬২ সালের গ্রীষ্মে পর্যটক ও কৃষি বিশেষজ্ঞ পরিচয়ে ৪০ হাজারের বেশি সোভিয়েত সেনা, প্রকৌশলী ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ কিউবার রাজধানী হাভানায় যান। তাদের ভ্রমণের আড়ালেই দ্বীপটিতে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বসানোর কাজ চলছিল।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা বিমান ক্ষেপণাস্ত্রের অবস্থান শনাক্ত করে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ছবি বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান ছিলেন আর্থার লুন্ডাল। ১৯৯২ সালে বিবিসির টাইমওয়াচ অনুষ্ঠানে তিনি সেই মুহূর্তের তথ্য তুলে ধরেন।
লুন্ডাল বলেন, ছবিগুলো দেখার পর তিনি সহকর্মীদের বলেছিলেন, ‘আমি জানি, আপনারা কী ভাবছেন। আমিও একই কথা ভাবছি। আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের অবস্থান দেখছি, তাই তো?’
তবে কিউবায় সোভিয়েত তৎপরতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ আরও আগে থেকেই ছিল।
তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট ম্যাকনামারা বিবিসিকে বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র বসানোর খবর পেয়ে সামরিক বাহিনী প্রায় পাঁচ হাজার তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। কিন্তু সেগুলোর বেশিরভাগই ভুল বলে মনে করা হয়েছিল।
তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ভাবতেই পারেননি যে সোভিয়েত নেতারা কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র বসিয়ে এত বড় ঝুঁকি নেবেন। কারণ, এতে সোভিয়েত ইউনিয়নের লাভের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কা ছিল অনেক বেশি।
উত্তেজনার মধ্যেও কেনেডির কৌশল
বিবিসি জানায়, কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্রের অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পরও বিষয়টি প্রকাশ করেননি কেনেডি। ১৮ অক্টোবর তার সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠকে বসেন তৎকালীন সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকো।
সেদিন গ্রোমিকোর দোভাষী ছিলেন ব্রিটিশ শিক্ষায় শিক্ষিত ভিক্টর সুখোদরেভ। ২০০২ সালে বিবিসিকে তিনি বলেন, হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে বৈঠকটি হয়েছিল। কেনেডি তার পরিচিত দোলনা চেয়ারে বসেছিলেন। পরিবেশ ভদ্রচিত ছিল, তবে কোনোভাবেই বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। কেনেডিকে কিছুটা উত্তেজিত মনে হচ্ছিল।
বিবিসির সাবেক মস্কো প্রতিনিধি অ্যালান লিটলের ভাষ্য, দুজনেই জানতেন কিউবায় সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। কিন্তু কেউই নিজের অবস্থান প্রকাশ করেননি। পুরো অঞ্চলের মানুষের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলছিল এক ধরনের কূটনৈতিক চালের খেলা।
কেনেডির কাছে ক্ষেপণাস্ত্রের ছবি ছিল। সেগুলো রাখা ছিল বৈঠকের টেবিলের একটি ড্রয়ারে। কিন্তু তিনি গ্রোমিকোকে ছবিগুলো দেখাননি, এমনকি ক্ষেপণাস্ত্রের কথাও সরাসরি তোলেননি।
সুখোদরেভ বলেন, কেনেডি ড্রয়ারটি একবারও খোলেননি। ছবিগুলো দেখালে গ্রোমিকো কী বলতেন, তা আর কখনো জানা যাবে না। তবে কেনেডি তাকে সরাসরি প্রশ্ন না করায় গ্রোমিকোকে মিথ্যা বলতেও হয়নি।
এর বদলে কেনেডি ৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া নিজের এক বক্তব্যের কথা পুনরায় উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি সতর্ক করেছিলেন, কিউবায় আক্রমণাত্মক অস্ত্র বসানো হলে এর পরিণতি হবে গুরুতর।
অন্যদিকে গ্রোমিকো দাবি করেন, কিউবাকে দেওয়া সহায়তা ছিল সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়।
তবে এরইমধ্যে কেনেডি সংকট মোকাবিলায় নিজের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছিলেন। এর নাম ছিল এক্সকম। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র বসানোর বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন।
কমিটির বৈঠকের গোপন রেকর্ডিংয়ে দেখা যায়, সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের উদ্দেশ্য নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ছিল।
কেনেডি বলেন, বিপদের শুরু ক্রুশ্চেভই করেছেন। তিনিই ঝুঁকি নিয়ে খেলছেন, যুক্তরাষ্ট্র নয়। বৈঠকে এক কর্মকর্তা বলেন, কিউবাকে কেন্দ্র করে ক্রুশ্চেভ যে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি নেবেন, তা তারা কখনো ভাবেননি।
সামরিক হামলার বদলে অবরোধ
কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে চলে আসায় যুক্তরাষ্ট্রের করণীয় নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও হামলার পক্ষে ছিলেন।
তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডিন রাস্ক ১৯৯২ সালে বিবিসিকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, তারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
এরপর কেনেডি এক বৈঠকে কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, ‘ভদ্রমহোদয়রা, আজ আমাদের দায়িত্বের প্রতিদান দেওয়ার দিন।’
বিবিসি জানিয়েছে, কেনেডি প্রথমেই বিমান হামলা চালিয়ে পরে কিউবা আক্রমণের পরিকল্পনা নাকচ করে দেন।
তার আশঙ্কা ছিল, এতে সংঘাত আরও বড় আকার নিতে পারে। এর পরিবর্তে কিউবায় পাঠানো আক্রমণাত্মক সামরিক সরঞ্জামের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করেন তিনি। একইসঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাঁটিগুলো ভেঙে ফেলার দাবি জানান।
ওয়াশিংটনের পানশালায় শোনা কথোপকথন
সোভিয়েত নেতা ক্রুশ্চেভের ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে আরেকটি ঘটনা কাজ করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ঘটনাটি সামনে আসে।
১৯৬২ সালের ২৫ অক্টোবর বিবিসির অ্যালান লিটল বলেছিলেন, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তিন দিন ধরে মুখোমুখি অবস্থানে থাকার পর শেষ পর্যন্ত পিছু হটেন ক্রুশ্চেভ। কেন তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার পেছনের ঘটনাটি ছিল বিস্ময়কর।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেসময়ে ওয়াশিংটনে সোভিয়েত সংবাদ সংস্থা তাসের প্রতিনিধি পরিচয়ে কাজ করছিলেন কেজিবি এজেন্ট আনাতোলি গোরস্কি। এক রাতে তিনি ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে পানাহার করতে যান। সেখানে বার বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় রুশ বংশোদ্ভূত বারটেন্ডার জনি প্রোকফের সঙ্গে তার কথা হয়।
প্রোকফ তাকে জানান, এর কয়েক ঘণ্টা আগে নিউইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউনের দুই সাংবাদিক ওয়ারেন রজার্স ও রবার্ট ডোনোভানের কথোপকথন তিনি শুনেছেন।
ডোনোভান নাকি সেদিন রাতেই মায়ামি যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। সেখানে কিউবা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত থাকা মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে একদল সাংবাদিকের যোগ দেওয়ার কথা ছিল।
কথাটি শুনে গোরস্কি দ্রুত সোভিয়েত দূতাবাসে ফিরে মস্কোকে জানান, কিউবায় মার্কিন আক্রমণ আসন্ন।
তবে পরে জানা যায়, সাংবাদিকেরা আসলে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা হলে কীভাবে সংবাদ সংগ্রহ করবেন, তা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। হামলার কোনো নিশ্চিত পরিকল্পনার কথা তারা বলেননি। প্রোকফ কথোপকথনটি ভুল শুনেছিলেন।
তিনি কেজিবির এজেন্ট ছিলেন, এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে বিবিসি।
তবু গোরস্কির পাঠানো বার্তা ক্রুশ্চেভের কাছে পৌঁছে যায়। সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ওলেগ ত্রোয়ানভস্কি পরে জানান, বার্তাটি পেয়ে ক্রুশ্চেভ অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তার মনে হয়েছিল, তিনি এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়েছেন, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন।
পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা উপলব্ধি
সংকটের সময় অনেকেই মনে করেছিলেন, কেনেডি ইচ্ছা করেই সময় নিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত তৎকালীন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত লর্ড হারলেক ১৯৬৯ সালে বিবিসিকে বলেন, পরিস্থিতি দক্ষতা ও সতর্কতার সঙ্গে সামাল দেওয়া না গেলে তা পারমাণবিক যুদ্ধে গড়াতে পারত।
হারলেক ছিলেন কেনেডি ও তার ভাই রবার্টের ব্যক্তিগত বন্ধু। তার মতে, ক্রুশ্চেভকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য সময় দেওয়া জরুরি ছিল। কারণ, ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিতে হলে তাকে নিজের দেশের নেতৃত্ব, মিত্রদেশগুলো এবং কিউবার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও সামাল দিতে হতো। কেনেডি ভাইয়েরা বিষয়টি বুঝেছিলেন। তারা ক্রুশ্চেভকে সময় দেওয়ার চেষ্টা করেন।
সংকটের সময় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হ্যারল্ড ম্যাকমিলান। বিবিসিকে তিনি বলেন, কেনেডি ভাইদের মধ্যে একজন দক্ষ রাষ্ট্রনায়কের প্রয়োজনীয় গুণাবলী ছিল।
ম্যাকমিলান বলেন, প্রথমত, একজন রাষ্ট্রনায়ককে প্রতিপক্ষের অবস্থান বুঝতে হয়। তিনি কীভাবে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন এবং কীভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন, তা বিবেচনা করতে হয়। কেনেডি ভাইয়েরা সেই নীতিই অনুসরণ করেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা ও ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা ছিল। তবে সেই ভয় যেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটিও তারা নিশ্চিত করেছিলেন।
ম্যাকমিলান বলেন, প্রতিপক্ষের অবস্থান বোঝার পাশাপাশি নিজেদের অবস্থানেও দৃঢ় থাকতে হয়। কেনেডি ভাইয়েরা এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পেরেছিলেন।
তার ভাষ্য, ‘যারা সংকটটি সামলেছিলেন, তারা ঠিক পথেই এগিয়েছিলেন।’
