শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে প্রায় তিন দশক আগে হবিগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) শিল্পনগরী। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং কার্যকর উদ্যোগের অভাবে এখন এটি নানামুখী সংকটে জর্জরিত। গ্যাস, পানি, ড্রেনেজ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতিতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
এছাড়া বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াতের সুযোগে প্রায়ই চুরি-ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও নিরাপত্তা জোরদারে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে উদ্যোক্তারা যেমন বিপাকে পড়েছেন, তেমনি সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
১৯৯৮ সালে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ধুলিয়াখালে ১৫ একর জমির উপর গড়ে তোলা হয় বিসিক শিল্পনগরী। উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করতে স্বল্পমূল্যে ৬০টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৫০টিতে কারখানা গড়ে উঠলেও একটি প্লট মামলা-জটিলতায় আটকে আছে। বাকি ৯টি প্লট বরাদ্দের পরও আজ পর্যন্ত অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। দীর্ঘ সময়েও এসব প্লট নিয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে শিল্পমালিকদের মধ্যে।
সবচেয়ে বড় ভোগান্তি গ্যাস ও পানির সংকট। গ্যাস সংযোগ না পেয়ে অনেক উদ্যোক্তা বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার গ্যাসে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠার সময় নির্মিত বড় আকারের পানির ট্যাংকও আজ পর্যন্ত চালু হয়নি। ফলে প্রতিদিনই পানির সংকটে ভুগতে হচ্ছে কারখানাগুলোকে। এর সঙ্গে অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে পণ্য পরিবহনেও নিয়মিত সমস্যা হচ্ছে।
মালিকদের অভিযোগ, অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতাও এখন বড় উদ্বেগের কারণ। বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশে প্রায়ই চুরির ঘটনা ঘটছে। প্রায় ১ হাজার ২০০ শ্রমিক কর্মরত থাকলেও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের আগ্রহ দেখিয়েও অনেক উদ্যোক্তা শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ থেকে সরে যাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কাশফুল, খাজা ফ্লাওয়ার মিলস, তাওকাল ইন্ডাস্ট্রিজ, প্রাইম ফুড, খাজা কেমিক্যাল, শহীদ কেমিক্যাল, জেমস ফুড, হার্টস বাংলাদেশ, মবিল ফ্যাক্টরি, আসাদ ফুড, তুলা ফ্যাক্টরি ও মুড়ি-চিড়ার কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সেখানে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকটিতে জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এতে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
হবিগঞ্জ বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সহ-সভাপতি মীর জমিলুন্নবী ফয়সাল বলেন, এখানে সমস্যার শেষ নেই। একাধিক বরাদ্দপ্রাপ্ত প্লটে আজও কোনো কারখানা হয়নি, কিন্তু বিসিক কর্তৃপক্ষ বরাদ্দ বাতিলও করেনি। পানি ও গ্যাসের সংকট তীব্র। ড্রেনেজ ব্যবস্থা নাজুক। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় আগুন নেভানোর জন্য পাইপলাইনের পানি কিংবা কোনো জলাধার নেই। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল। মালিক সমিতির সঙ্গে বিসিক কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সমিতির মেয়াদ তিন বছর আগে শেষ হলেও নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এখানে এখনো কোনো বর্জ্য শোধনাগার গড়ে ওঠেনি।
অভিযোগের বিষয়ে বিসিক কর্তৃপক্ষ জানায়, গ্যাস সংযোগের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। পানির সংকটের বিষয়টিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদারে কারখানাগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে হবিগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীর সহকারী মহাব্যবস্থাপক বিল্লাল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যা নিরসনে কাজ শুরু হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ শ্রমিক নিয়মিত কর্মরত আছেন। গ্যাস সংযোগের কারণে তিন থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে পারছে। পানির সংকটও দ্রুত কেটে যাবে বলে আশা করছি।
তিনি আরো জানান, বিসিক কার্যালয় নিজেই জনবল সংকটে ভুগছে। কর্মকর্তাদের পাঁচটি পদের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র দুজন। এছাড়া অফিস স্টাফের চারটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও সেবাদান কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
