দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে যাঁরা নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন এবং গভীর দেশপ্রেম ও মানুষের কল্যাণে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে মেহনতি মানুষের নেতা হিসেবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করেছেন, চৌধুরী হারুনর রশিদ তাঁদের অন্যতম। তিনি ১৯২৬ সালে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার মনসা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আহমেদুর রহমান এবং মাতার নাম জামিলা খাতুন। হাবিলাসদ্বীপ উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে ১৯৪৬ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
ছাত্রজীবনেই চৌধুরী হারুনর রশিদের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ১৯৪১ সালে মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে তিনি ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৯৪৩ সালে চট্টগ্রামে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে শহর ও গ্রামে ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নেন। মানুষের দুঃখ–দুর্দশার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক চেতনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে আরও গভীর করে তোলে। ১৯৪৪ সালে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন।
বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও প্রগতিশীল চিন্তাধারাকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামে ‘সাংস্কৃতিক বৈঠক’ নামে একটি সংগঠন এবং ‘সীমান্ত’ নামে একটি সাহিত্যপত্র আত্মপ্রকাশ করে। চৌধুরী হারুনর রশিদ এসব উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি সাংস্কৃতিক বৈঠকের অন্যতম কর্মকর্তা নির্বাচিত হন এবং সীমান্ত পত্রিকার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি সাহিত্য–সংস্কৃতির বিকাশে তাঁর এই সম্পৃক্ততা প্রগতিশীল সমাজচিন্তার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের পরিচয় বহন করে।
এ সময় তিনি রেলওয়েতে চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৪৯ সাল থেকে মেহনতি শ্রমিকদের সংগঠিত করা এবং তাঁদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন। রেলশ্রমিকদের রাজনৈতিক ও শ্রমিক আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাংগঠনিক দক্ষতা, সাহস ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতি আন্তরিকতার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন আস্থাভাজন শ্রমিকনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। শ্রমিকদের রাজনৈতিক চেতনা বিকাশের লক্ষ্যে তিনি ‘সাপ্তাহিক আওয়াজ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন।
১৯৫০ সালে রেলওয়ে অ্যাকাউন্টস এমপ্লয়িজ লীগের নির্বাচনে তৎকালীন সভাপতি চেরাগ খানকে পরাজিত করে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। একই বছর তিনি পূর্ব বাংলা ব্যাংক কর্মচারী ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। শ্রমিক ও কর্মচারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর এই সাংগঠনিক ভূমিকা তাঁকে বৃহত্তর শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
১৯৫০ সালে পূর্ব বাংলায় সামপ্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে চট্টগ্রামে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি রক্ষায় তিনি সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। দাঙ্গার বিস্তার রোধে প্রচার–প্রচারণা ও আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং একটি সর্বদলীয় সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি কমিটি গঠনে ভূমিকা রাখেন। তিনি ওই কমিটির যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তী বছর হরিখোলার মাঠে তিন দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক সম্মেলন আয়োজনেও তিনি সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে চৌধুরী হারুনর রশিদের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক এবং পরবর্তী সময়ে ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের মিছিলে গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে আয়োজিত বিশাল জনসভায় তিনি জ্বালাময়ী বক্তব্য দেন। ওই সভায় কবি মাহবুব উল আলমের লেখা ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ শিরোনামের একুশের ঐতিহাসিক কবিতাটিও তিনি আবৃত্তি করেন।
ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এবং লালদিঘির জনসভায় বক্তব্য ও কবিতা পাঠের কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ চার বছর বিনা বিচারে কারাভোগের পর ১৯৫৬ সালে তিনি মুক্তি পান। ১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর চৌধুরী হারুনর রশিদ আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলটি ত্যাগ করেন। ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনের পর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হলে তিনি এই দলে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে ন্যাপের পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিটির সদস্য এবং চট্টগ্রাম জেলা কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৬৮–৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থানেও তিনি নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। এ সময় ন্যাপ ও পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে চট্টগ্রামে গণ–আন্দোলন সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। দমন–পীড়ন, গ্রেপ্তারের আশঙ্কা ও দীর্ঘ আত্মগোপনের জীবন তাঁকে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়ে গঠিত গেরিলা কমান্ডের যুগ্ম কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অধীনে প্রায় ১৯ হাজার গেরিলা দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন।
তিনি বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বাংলাদেশ রেল শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশের শ্রমিকদের সংগঠিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের পরিচিতি তুলে ধরতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৭৩–৭৪ সালে জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। এ সময় তিনি বিশ্ব ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সাধারণ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন বলে উল্লেখ রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনে তাঁর সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের দাবি ও অধিকারকে বিশ্বপরিসরে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করে।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ওই হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চৌধুরী হারুনর রশিদের বিরুদ্ধে আবারও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ফলে তাঁকে পুনরায় আত্মগোপনে যেতে হয়।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি হলে তিনি ১৯৭৯ সালে ন্যাপের (হারুন) সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালে প্যালেস্টাইন মুক্তি সংস্থা ও সিরিয়ার শ্রমিক ফেডারেশনের আমন্ত্রণে তিনি আরব বিশ্ব সফর করেন। আশির দশকে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতেও তিনি ভূমিকা পালন করেন। শ্রমিক–কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) গঠনের মধ্য দিয়ে শ্রমিক ও কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সংগঠিত করার উদ্যোগে তিনি যুক্ত হন।
১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫–দলীয় জোট গঠিত হলে তিনি এই জোটে যোগ দেন। জোটের প্রার্থী হিসেবে পটিয়া সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হয়।
১৯৮৮ সালে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে তিনি অনেকটাই কর্মক্ষমতা হারান। কিন্তু অসুস্থতা সত্ত্বেও রাজনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখেন। ১৯৮৯ সালে তিনি গণতান্ত্রিক দলে যোগ দেন এবং দলটির কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নির্বাচিত হন।
দেশের সংকটময় মুহূর্তে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর জীবনযাপন, রাজনৈতিক অবস্থান এবং শ্রমজীবী মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে সমসাময়িক অনেক রাজনীতিকের তুলনায় স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। বর্তমান রাজনীতিতে যখন সততা, নীতিনিষ্ঠা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জনকল্যাণের প্রশ্ন বারবার সামনে আসে, তখন চৌধুরী হারুনর রশিদের জীবন ও কর্ম নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
দীর্ঘ রোগভোগ ও শয্যাশায়ী জীবন শেষে ২০০০ সালের ১৯ অক্টোবর তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের প্রগতিশীল রাজনীতি ও শ্রমিক আন্দোলন হারায় একজন অভিজ্ঞ সংগঠক, ত্যাগী নেতা ও নিবেদিতপ্রাণ দেশব্রতীকে।
চৌধুরী হারুনর রশিদ কেবল চট্টগ্রামের একজন কৃতী সন্তান ছিলেন না; তিনি ছিলেন দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির সংগ্রামের এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় রাজনীতির প্রকৃত শক্তি ক্ষমতায় নয়, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায়; নেতৃত্বের সার্থকতা ব্যক্তিগত অর্জনে নয়, জনকল্যাণে। তাঁর ত্যাগ, আদর্শ ও সংগ্রামী জীবন নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম, ন্যায়নিষ্ঠা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে অনুপ্রাণিত করবে এটাই প্রত্যাশা। লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদক–শিল্পশৈলী।
