আজ তাঁর প্রয়াণের এই ক্ষণে ঘুরে আসি সেই বইগুলোর পাতা থেকে, যেখানে অমর হয়ে আছেন এই শিল্পী।

৬ বইছবি : সংগৃহীত।
আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার ক্যানভাসে যাঁর জাদুকরি ছোঁয়া আজও আলোড়ন তোলে, সেই প্রবাদপ্রতিম চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী আর নেই। দীর্ঘ ১৪ মাস ধরে ব্লাড ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে, সমস্ত চিকিৎসাকে পিছিয়ে রেখে তিনি পাড়ি দিয়েছেন এক অনন্ত নীরবতার দেশে। কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে আজ সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। উৎসবের আনন্দ ছাপিয়ে আজ বাংলার শিল্পাঙ্গনে নেমে এসেছে এক গভীর বিষাদের ছায়া। অথচ তাঁর তুলি তো থেমে থাকার ছিল না। ১৯৩৯ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ফরিদপুরে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি দেশভাগের যন্ত্রণা কুড়িয়ে নিয়েছিলেন বুকে। তার পরে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট থেকে শুরু করে সুদূর প্যারিসের একোল দে বোজ-আর্ট — তাঁর তুলির আঁচড় বদলে দিয়েছিল শিল্পের সংজ্ঞা। তাঁর সেই বিখ্যাত ক্রস-হ্যাচিং (cross-hatching) বা আড়াআড়ি রেখার টান, যা মানুষের শরীরের ভিতরের মনস্তত্ত্ব, আনন্দ, ভয় আর নিঃসঙ্গতাকে ফুটিয়ে তুলত, তা আজও শিল্পপ্রেমীদের হৃদয়ে গেঁথে রয়েছে। যোগেনের এই শিল্পময় জীবন আর তাঁর সৃষ্টির জগৎকে ধরে রাখার জন্যই তো রচিত হয়েছে একের পর এক অসাধারণ গ্রন্থ। চলুন, আজ তাঁর প্রয়াণের এই ক্ষণে ঘুরে আসি সেই বইগুলোর পাতা থেকে, যেখানে অমর হয়ে আছেন এই শিল্পী।
দ্য আফটারলাইফ অফ সাইলেন্স: স্টিল লাইফস অফ যোগেন চৌধুরীছবি : সংগৃহীত।
কখনও ভেবেছেন কি, ফেলে দেওয়া বা অবহেলা করা দৈনন্দিন জিনিসপত্রগুলোর মধ্যেও প্রাণ থাকতে পারে? এই বইটি ঠিক সেই জায়গাতেই আলো ফেলে। এটি যোগেন চৌধুরীর স্টিল লাইফ নিয়ে প্রথম কোনও সম্পূর্ণ বই। লেখক খুব সুন্দর করে দেখিয়েছেন, কী ভাবে ইউরোপীয় ধারার বাইরে গিয়ে আমাদের নিজেদের শিকড়ের মাটি থেকে উঠে আসা সাধারণ আসবাব, ঘরের কোণ বা ব্যবহার্য জিনিসগুলোকে তিনি অদ্ভুত এক জীবনের আলোয় ভরিয়ে তুলতেন। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানের যে সূক্ষ্ম স্থবিরতা, তা এই বইটির প্রায় ৮০টি ছবির পাতার মধ্যে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
রেভারি অ্যান্ড রিয়্যালিটিছবি : সংগৃহীত।
এমামি আর্টে হওয়া যোগেন চৌধুরীর সেই বিশাল রেট্রোস্পেক্টিভ বা একক প্রদর্শনীটির কথা মনে আছে? প্রায় ১৫০টির বেশি শিল্পকর্ম নিয়ে সাজানো সেই আয়োজনের সারবস্তু ধরে রেখেছে এই ভারী, চমৎকার হার্ডকভার ক্যাটালগটি। বইটির পাতা উল্টালেই দেখা মিলবে শিল্পীর নিজের হাতে তৈরি স্কেচবুকের পাতার, যেখানে তিনি মনের অজান্তে লিখে রাখতেন তাঁর গভীর সব ভাবনা। রঞ্জিৎ হোসকোলের লেখার পাশাপাশি পুরোনো আর্কাইভের ছবি আর শিল্পীর দুর্লভ সাক্ষাৎকার এই বইটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।
যোগেন চৌধুরীর ছবিছবি : সংগৃহীত।
ছবি : সংগৃহীত। পরিতোষ সেনের ভাষায় যা ছিল — ‘বাংলাভাষায় শ্রেষ্ঠ শিল্পগ্রন্থ প্রকাশনা।’ প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মানের এই বইটিতে যোগেন বাবুর জীবনের কালানুক্রমিক যাত্রাকে এক সুতোয় বাঁধা হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, তার মাধুর্য, কৌতুক-শ্লেষ থেকে শুরু করে সামাজিক অন্যায় কিংবা ইতিহাসের ক্ষত — কী ভাবে তাঁর তুলিতে জীবন্ত হয়ে উঠত, তার নিখুঁত দলিল এই বই। আড়াইশোরও বেশি রঙিন ও সাদাকালো ছবির প্রতিলিপিতে সমৃদ্ধ এই গ্রন্থটি যেন শিল্পীর সঙ্গে দর্শকের সরাসরি কথা বলিয়ে দেয়।
অ্যান আনফিনিশড পোয়েমছবি : সংগৃহীত।
কলকাতায় আয়োজিত যোগেন চৌধুরীর এক বিশেষ প্রদর্শনী থেকেই এই বইটির জন্ম। শিল্পী নিজেই বিশ্বাস করতেন, ঘরের বিছানা, আলো, হাঁড়ি-কড়াই বা চামচের মতো সাধারণ ব্যবহারের জিনিসগুলোও মানুষের মনে নান্দনিক আনন্দ জাগাতে পারে। দৈনন্দিন ব্যবহারের সেই বস্তুগুলোকেও যে শিল্পের আসনে বসানো যায়, তারই এক অনন্য প্রকাশ দেখা যায় এই বইটির পাতায়।
দ্য কম্পালসিভ অ্যাক্টছবি : সংগৃহীত।
যাঁরা যোগেন চৌধুরীর রেখাচিত্রের জাদুতে মুগ্ধ, তাঁদের জন্য এই বই এক অমূল্য রত্ন। গত ছয় দশক ধরে তিনি যে ভাবে তিলমাত্র ক্লান্তিহীন ভাবে স্কেচ করে গিয়েছেন, তার একটি নিখুঁত প্রতিচ্ছবি এটি। তাঁর রেখাগুলোর মধ্যে যে একটা অদ্ভুত ছটফটানি, স্বকীয়তা এবং প্রকৃতির আদিম সততা লুকিয়ে থাকে, তা এই বইটির পাতা উল্টালে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। এন্ডিউরিং ফর্মস ক্রস-হ্যাচিং বা জালের মতো নিখুঁত রেখার টানে যোগেন চৌধুরীর মুন্সিয়ানা কেমন, তা আর আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। চারপাশের সময় এবং স্পেসকে তিনি যে ভাবে সহজাত ভঙ্গিতে তাঁর ক্যানভাসে প্রশ্ন করতেন, তারই এক চমৎকার দলিল ‘এন্ডিউরিং ফর্মস’। ভারতীয় শিল্পরীতিকে সমকালীন ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার এই অভিনব শৈলী যে কাউকেই ভাবাবে।
এন্ডিউরিং ফর্মসছবি : সংগৃহীত।
ক্রস-হ্যাচিং বা জালের মতো নিখুঁত রেখার টানে যোগেন চৌধুরীর মুন্সিয়ানা কেমন, তা আর আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। চারপাশের সময় এবং স্পেসকে তিনি যে ভাবে সহজাত ভঙ্গিতে তাঁর ক্যানভাসে প্রশ্ন করতেন, তারই এক চমৎকার দলিল ‘এন্ডিউরিং ফর্মস’। ভারতীয় শিল্পরীতিকে সমকালীন ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার এই অভিনব শৈলী যে কাউকেই ভাবাবে।
